বুকের ‘বৈরাগী’

চৈতি আহমেদ

ফেইসবুক এর গরম আড্ডা চালাতে পারেন প্রাণের বাংলার পাতায়। আমারা তো চাই আপনারা সকাল সন্ধ্যা তুমুল তর্কে ভরিয়ে তুলুন আমাদের ফেইসবুক বিভাগ । আমারা এই বিভাগে ফেইসবুক এ প্রকাশিত বিভিন্ন আলোচিত পোস্ট শেয়ার করবো । আপানারাও সরাসরি লিখতে পারেন এই বিভাগে। প্রকাশ করতে পারেন আপনাদের তীব্র প্রতিক্রিয়া।
ঘুরে ঘুরে মধ্যরাতের ঢাকা দেখার সাধ আমার অপূর্ণই রয়ে গেছে। সে অবশ্য কয়েকবার গাড়িতে নিয়ে ঘুরে দেখিয়েছে। কিন্তু সেতো গাড়িতে বসে হেঁটে বা রিক্সায় তো নয়। আমাকে সঙ্গে নিয়ে হেঁটে বা রিক্সায় ঢাকা ঘুরে দেখার সাহস বুঝেছি তারও হয়নি। মিছিলে পুলিশের গুলির আগে বুক পেতে দেয়া আর মাঝরাতে ঢাকার রাস্তায় বৌ নিয়ে ঘোরা এক রকমের সাহস নয়। একটা সাহস আর পরেরটা দুঃসাহস। শুটিংয়ে গেলে কালিয়াকৈর বা গাজীপুর থেকে মাঝে মাঝে ফিরতে বেশ রাত হয়ে যেতো তখন ঢাকার ফাঁকা রাস্তা বেশ মোহ জাগাতো। কিন্তু সেটাও ঠিক কেমন গাড়িতে বসে আর সঙ্গে পুরো শুটিং ইউনিট থাকতো।

কখনও মাঝেরাতে কোনো বই পড়ে শেষ করে আর ঘুম হতো না। ইচ্ছে করতো দরজা খুলে বেরিয়ে পড়ি ফাঁকা শহরে আগন্তুকের মতো এলেবেলে হাঁটি। এমিনতেই আমার একটা লক্ষ্য নিয়ে পথ চলতে ভালো লাগে না। ক্লান্ত লাগে! লক্ষ্যহীন আমি হাঁটতে পারি মাইলের পর মাইল।

কাল রাত ছিলো এমনি এক ঘুম না আসা রাত। কেমন বৈরাগ্যে পেয়ে বসলো। বৈরাগী বুকের ভেতরে বরাবর থাকলেও তাকে আমি শাসনে রাখি। বোঝাই- বাচ্চা দুটো আছে না! পাগলামী ছাড়। বৈরাগী আবার বাচ্চা দুটোকে ভালোবাসে খুব, বোঝে, বাচ্চাদের কথায় দমে যায়।

উঠে একটা নোট লিখলাম। 
-বাবু ঘুম ভেঙে গেলে ভয় পেয়ো না। মা হাঁটতে গেলাম। এই রকম নোটের সঙ্গে আমার বাচ্চা পড়তে শেখার পর থেকে পরিচিত। ঘুম থেকে উঠে আমাকে খুঁজে না পেলে কান্নাকাটি না করে আমার পড়ার টেবিলে গিয়ে বসবে, দেখবে সেখানে রাখা আছে নোট- আমি দোকানে গেলাম বা অফিসে গেলাম।

নোটটা লিখে রেখে রাত সাড়ে তিনটায় বেরিয়ে পড়লাম লক্ষ্যহীন। বেরিয়ে দেখলাম এই আলোকিত শহরটিতে আমি একাই নাগরিক। আহা চাঁদ বুকে নিয়ে ঠাণ্ডায় জুবুথুবু একাকী একটা শহর! দুই ঘন্টা এলোমেলো ঘুরে বেড়ালাম। মাঝে মাঝে নিজের ছায়া দেখে ভয়ে চমকে উঠেছি। আবার হাইওয়ে দিয়ে ছুটে যাওয়া গাড়ি দেখে -ধুর বলে আবার নতুন রাস্তায় উঠে অনেকদিন পর হাতে মার্লবরো নিয়ে অপূর্ণ একটা স্বপ্নের বিরান পথে হাঁটতে হাঁটতে নিঃসঙ্গ লেক’টার পাড়ে বেঞ্চে শুয়ে আকাশমুখো হয়ে আমিও শুয়ে পড়ি, চাঁদটাকে একটা চোখ টিপি দেই। কৈশোরের বাড়ির ছাঁদে শুয়ে দেখা আকাশের কথা মনে পড়ে, বলি -কেমন আছো? জানো সেই ছেলে মানুষি সব প্রতিশ্রুতিরা এখনও আমার সঙ্গে আছে, সে ভালো আছেতো? আমি একদিন ফিরবো ঠিক, দেখো নিও তোমাদের কাছে! মানুষগুলো হয়তো থাকবে না, এই আকাশ আর প্রতিশ্রুতিরা থাকবে ঠিক!

হাঁটতে হাঁটতে ফিলিঙ স্টেশনের কাছে এসে দেখলাম কারা যেন গাড়িতে জোরে কি এক অচেনা ভাষার গান বাজাচ্ছে। অজান্তে হাঁটার গতি বাড়িয়ে দিলাম… দরকার ছিলো না যদিও, কিছু সময়ের জন্য ভুলে গিয়েছিলাম এটা মাঝ রাতের ঢাকার রাস্তা নয় যে, কেউ এসে গায়ে ধাক্কা দিয়ে বলবে … এই যাবা নাকি?

ছবি: লেখক