একশ বছরে সোলঝেনিৎসিন

বেঁচে থাকলে গত সপ্তাহে তিনি একশ বছর বয়সে পা দিতেন। ১৯১৮ সালের ১১ ডিসেম্বর ছিলো প্রখ্যাত রুশ লেখক আলেকজান্ডার সোলঝেনিৎসিনের জন্মদিন। ‘গুলাগ আর্কিপেলাগো’ তাঁর বহুল আলোচিত উপন্যাস। স্ট্যালিনের শাসনামলে সোভিয়েত রাশিয়ার বন্দী শিবির ‘গুলাগ’-এর ওপর বিশদ বর্ণনা যে উপন্যাসের প্রতি ছত্রে ছত্রে।বিশ শতকে প্রায় ৬ কোটি মানুষের মৃত্যু এই গুলাগে, সেই তথ্যও সলঝেনিৎসিনের কলমে প্রথম জানলো দুনিয়া। লিখে ক্ষমতার রোষাণলে পড়া এই লেখকের ইচ্ছা ছিলো উপন্যাসটি নিজ বাসভূমে প্রকাশিত হোক। কিন্তু সে ইচ্ছা কি সফল হয়েছিলো? না। পাণ্ডুলিপির মাইক্রোফিল্ম তখন প্যারিস ও নিউ ইর্য়কের প্রকাশকদের কাছে গোপনে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। ইতিমধ্যে বইটি সোভিয়েত ইউনিয়নে ছেপে বেরনোর অপেক্ষা। ঠিক এই সময়েই রুশ গুপ্তচর সংস্থা কেজিবি সলঝেনিৎসিনের সেক্রেটারির কাছ থেকে একটি গোপন কপি বের করে। লেখকের সেক্রেটারিকে টানা জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়, অতঃপর সেক্রেটারির ঝুলন্ত মৃতদেহ আবিষ্কৃত হয়। হত্যা না আত্মহত্যা, তৎকালীন কেজিবি ছাড়া কেউ জানে না। তার পরই লেখক সেই রুশ উপন্যাস প্যারিসে প্রকাশককে ছাপার অনুমতি দেন। হত্যার হুমকি আসে, সরকারি সংবাদপত্র প্রবল গালিগালাজ করে। কিন্তু তারপরেও সলঝেনিৎসিন দেশ ছাড়তে চাননি, স্বদেশে থেকেই নিজেকে প্রকাশ করতে চেয়েছিলেন।

স্ত্রী সঙ্গে সলঝেনিৎসিন

১৯৭০ সালে নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তির পর তাঁর বিরুদ্ধে রুশ সরকারের আচরণ আরো প্রকাশ্যে আসে। সলঝেনিৎসিন পুরস্কার নিতে সুইডেন যাননি। তাঁর আশঙ্কা ছিল, এক বার দেশ ছাড়লে তাঁকে সোভিয়েত ইউনিয়নে আর ঢুকতে দেওয়া হবে না।
পুরস্কার পাওয়ার চার বছর পর তাঁর সেই আশঙ্কাই সত্যি হলো। ১৯৭৪ সালে ফেব্রুয়ারির এক রাতে মস্কোর বাড়ি থেকে সলঝেনিৎসিনকে গ্রেফতার করা হল। পর দিন সকালে জানানো হল, তিনি আর এ দেশের নাগরিক নন। এখনই দেশ ছেড়ে বেরিয়ে যেতে হবে। বার্লিনগামী বিমানে ওঠার আগে সলঝেনিৎসিন সে দিন শুধু দু’টো জিনিস নিজের সঙ্গে নিয়েছিলেন। কাজাখস্তানে বন্দি শিবিরে থাকার সময়কার একটা টুপি ও বিবর্ণ এক উলের কোট। দেশহীন লেখককে সে দিন প্রথম আশ্রয় দিয়েছিলেন জার্মান গল্পকার হাইনরিশ বোল।সলঝেনিৎসিন-এর প্রথম উপন্যাস ‘ওয়ান ডে ইন দ্য লাইফ অব ইভান দেনিসোভিচ’। ১৯৬২ সালে সেই বই রুশ ভাষায় প্রকাশিত হওয়ার পরই বিশ্ব জুড়ে হুলস্থুল। স্তালিনের আমলে সোভিয়েত দেশ জুড়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা এই সব বন্দিশিবির বা ‘গুলাগ’-এর কথা তার আগে মানুষের এ ভাবে জানা ছিল না।

যোসেফ স্তালিন

সলঝেনিৎসিনের বাবা ছিলেন জারের রুশ গোলন্দাজ বাহিনীর অফিসার, মা ইউক্রেনের এক ভূস্বামীর মেয়ে। সলঝেনিৎসিনের ছয় মাস বয়সেই তাঁর বাবা শিকারে গিয়ে দুর্ঘটনায় মারা যান। মা টাইপিং আর স্টেনোগ্রাফির চাকরি নিয়ে কোনও ক্রমে বড় করে তোলেন তাঁকে।
সলঝেনিৎসিন অঙ্কে খুব ভালো ছাত্র ছিলেন। ১৯৪১ সালে, হিটলারের রাশিয়া আক্রমণের কয়েক বছর আগে তিনি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অঙ্ক এবং পদার্থবিজ্ঞানে স্নাতক হন। তার কয়েক মাস আগেই বিয়ে করেছেন রসায়নশাস্ত্রের সহপাঠিনী নাতালিয়া রেস্তোভস্কায়াকে।
বিয়ের পরই সলঝেনিৎসিন চলে গেলেন ফ্রন্টে। নাত্‌সি বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে সোভিয়েত সামরিক পদকেও ভূষিত হয়েছিলেন।
কিন্তু রণাঙ্গনে একটি ব্যাপার এই সৈনিকের চোখ এড়ায়নি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জয়ের পর জার্মানিতে সাধারণ নাগরিকের সম্পদ কেড়ে নেয় লাল ফৌজ। বিজয়গর্বে গর্বিত সেনারা মেয়েদের ধর্ষণ করতেও ছাড়ে না। এক বন্ধুকে সে সব নিয়েই চিঠি লিখেছিলেন সলঝেনিৎসিন। সে ব্যাপারে সোভিয়েত রাষ্ট্রের ‘বস’ এবং ‘গোঁফওয়ালা মানুষটাকেও ঠাট্টা করতেও ছাড়েননি।
যুদ্ধের শেষ দিকেই তাই রুশ গোয়েন্দাবাহিনী সলঝেনিৎসিনকে গ্রেফতার করে বন্দিশিবিরে পাঠিয়ে দেয়। আট বছরের কারাদণ্ড। সেই চিঠিতে তাঁর ঠাট্টার পাত্রটি যে আসলে স্ট্যালিন ছিলেন সে কথা বুঝতে তাদের বাকি ছিল না।
কারাদণ্ডের মেয়াদ শেষ হলো। কিন্তু মুক্তি পেলেন না লেখক। এবার তাঁকে নির্বাসনে পাঠিয়ে দেওয়া হল সুদূর কাজাখস্তানে। স্তালিনের মৃত্যুর পর মুক্তি পেলেন তিনি।
স্তালিনের মৃত্যুর তিন বছর পরই ক্রুশ্চেভ গোপন ভাষণে স্তালিন কী কী অন্যায় করেছেন, পলিটব্যুরো সদস্যদের জানালেন তিনি। সলঝেনিৎসিন এই সময় মস্কোর কাছে এক স্কুলে অঙ্ক ও পদার্থবিজ্ঞানের শিক্ষক। তখন তাঁর কাজ ছিলো সকালে অঙ্ক শেখান, রাতে বন্দিশিবিরের অভিজ্ঞতা নিয়ে গল্প লেখা। সেই স্মৃতি থেকেই লিখে ফেলেন ‘ইভান দেনিসোভিচের জীবনের এক দিন’। কাগজ বাঁচাতে পাতার দু’দিকেই টাইপ করেছিলেন লেখক।
সেন্সরশিপের দেশ, ফলে ’৬২ সালেই সেই লেখা পৌঁছে যায় পলিটব্যুরোতে। তার পর এই লেখা ছাপা উচিত কী অনুচিত, সে নিয়ে চলে তর্ক। ক্রুশ্চেভ ছাপার পক্ষে, দেনিসোভিচ-বিতর্কে তাঁর উক্তি আজও উজ্জ্বল হয়ে আছে, ‘‘আমাদের সবার মধ্যেই এক জন স্তালিন আছেন। আছেন আমার মধ্যেও। এই শয়তানি নিকেশ করার জন্যই লেখাটা ছাপা হওয়া উচিত।’’
বই ছেপে বেরুনোর সঙ্গে সঙ্গে প্রবল সাড়া। সকাল থেকে সূর্যাস্ত, ইভান দেনিসোভিচের এক দিনের মধ্যে ধরা পড়েছে বন্দিশালার সমগ্র জীবন।সলঝেনিৎসিন অবশ্য থেমে থাকেননি। পৃষ্ঠপোষক ক্রুশ্চেভ ক্ষমতা থেকে সরে গিয়েছেন, ক্ষমতায় এসেছেন লিওনিদ ব্রেজনেভ। সোভিয়েত ইউনিয়নে লেখা ছাপা হয় না, গুপ্তচর সংস্থা কেজিবি দরকারে গোপনে পাণ্ডুলিপি হস্তগত করতে পারে, প্রাণসংশয় হতে পারে— কোনও সম্ভাবনাই তাঁকে টলাতে পারেনি। সেই সময়ে প্রকাশিত হয় ‘ফার্স্ট সার্কল’, ‘ক্যানসার ওয়ার্ড’ উপন্যাস। নাভিশ্বাস-ওঠা রাষ্ট্রব্যবস্থায় কী ভাবে অপচয় হয় মেধার, তা নিয়েই অঙ্কের ছাত্র সলঝেনিৎসিনের ‘ফার্স্ট সার্কল’। এই উপন্যাসে অঙ্কবিদ গ্লেবরনঝিন-এর চরিত্র তাঁর নিজের জীবনকে ভিত্তি করেই লেখা।
নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা নিয়েই লেখা ছিলো তাঁর ‘ক্যানসার ওয়ার্ড’। কর্কট রোগ সন্দেহে উপন্যাসের চরিত্রদের মতো লেখককেও যেতে হয়েছিল কাজাখস্তানের হাসপাতালে। উপন্যাসে তো সে রকমই চরিত্রের ভিড়। ‘ফার্স্ট সার্কল’ আর ‘ক্যানসার ওয়ার্ড’, দুই রুশ উপন্যাসই ছেপে বেরিয়েছিল বিদেশে।
সলঝেনিৎসিন ইতিমধ্যে ১৯৫৮ সাল থেকে শুরু করে দিয়েছেন তাঁর ম্যাগনাম ওপাস ‘গুলাগ আর্কিপেলাগো’। স্তালিনের আমলে সারা সোভিয়েত ইউনিয়ন জুড়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা যে বন্দিশিবির আর নির্যাতনের করুণ ইতিহাস। বইটা সোভিয়েত রাশিয়ায় প্রকাশিত হয়নি ঠিকই, কিন্তু এর পরই রুশ প্রচারযন্ত্র লেখককে দেশদ্রোহী, হিটলার-সমর্থক ইত্যাদি নানা অভিধায় ভূষিত করে। লেখক তখন নিজভূমে প্রায় পরবাসী! সোভিয়েত লেখক সঙ্ঘ ইতিমধ্যে সলঝেনিৎসিনকে তাদের সদস্যপদ থেকে বহিষ্কার করেছে। তাঁর অপরাধ, সেন্সরশিপের প্রতিবাদে সঙ্ঘকে একটি চিঠি লিখেছিলেন। কিন্তু জাঁ পল সার্ত্র থেকে হাইনরিশ বোল, আর্থার মিলার, কার্লোস ফুয়েন্তিস… বিশ্বের অনেক লেখক, শিল্পীই তখন লেখকের সমর্থনে দাঁড়িয়েছেন। সলঝেনিৎসিন সে সময় একটা কথা বলেছিলেন, ‘‘সাধারণ মানুষের কাজ মিথ্যায় অংশ না নেওয়া। লেখক, শিল্পীদের, কাজটা আর একটু বড়। মিথ্যেকে পরাস্ত করা।’’

নিকিতা ক্রুশ্চেভ

মিথ্যেকে পরাস্ত করতেই জার্মানি থেকে আমেরিকা চলে যান তিনি। ১৭ বছর সেখানেই থাকলেন, হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় তাকে ‘ডক্টরেট’ সম্মানে ভূষিত করলো। কিন্তু সেখানেও তিনি প্রতিবাদী, নিঃসঙ্গ লেখক। হার্ভাডের বক্তৃতায় বললেন, পণ্যমনস্কতাই আমেরিকার সব, আত্মিক বা ঐশ্বরিক অনুভূতি থেকে সে বঞ্চিত।
১৯৯৪ সালে আবার দেশে ফিরলেন লেখক। তবে সরাসরি মস্কো নয়, প্রথমে সাইবেরিয়ার রাজধানী ভ্লাদিভস্তক। সেখান থেকে ট্রেনে মস্কো। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভাগ হয়ে গেছে বিভিন্ন স্বাধীন দেশে। সলঝেনিৎসিন রেলপথে দেখে নিতে চান সে সব। আমেরিকায় থাকার সময় তৎকালীন রুশ প্রেসিডেন্ট মিখাইল গর্বাচভ তাঁর সঙ্গে এক বার দেখা করতে গিয়েছিলেন, সলঝেনিৎসিন রাজি হননি। পরের বছর, ২০০৮ সালে, ৮৯ বছর বয়সে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে সব সমালোচনা, আলোচনার ঊর্ধ্বে চলে গেলেন এই লেখক। তবে তাঁর দেশ তাকে বন্দীশিবির আর নিপীড়ন ছাড়া আর কোনো পুরস্কারে ভূষিত করতে পারেনি।

প্রাণের বাংলা ডেস্ক
তথ্যসূত্রঃ আনন্দবাজার পত্রিকা
ছবিঃ গুগল