বিজয়ের গল্প

জসিম মল্লিক,প্রবাসী, লেখক

সেই রাতে

১.

সবাই যে যেদিকে পারছে পালাচ্ছে। অন্ধকার রাত। শহর খালি হয়ে গেছে। দুপুরের দিকে বরিশাল শহরের উপর পাকিস্তানের যুদ্ধ বিমান বোমাবর্ষন শুরু করে। অন্যান্য দিনের মতো আজকেও কামাল ওদের বাড়ির সামনের খেলার মাঠে মুক্তিযোদ্ধাদের ট্রেনিং দেখছিল। ওর বয়সী কয়েকজন আছে যারা বড়দের ফুট ফরমাস খাটে। হান্নান, নিজাম, মিজানুর, হাসিব। পানি খাওয়ায়। চা টা এনে দেয় বাড়ি থেকে। ট্রেনিং এ জামাল ভাইও ছিল। দুপুর একটার মতো হবে তখন। হঠাৎ যেনো দুনিয়ায়াতে গজব নেমে এলো। কান ফাটানো ঠা ঠা শব্দে সব একাকার হয়ে যেতে লাগলো। ছত্রখান হয়ে গেলো ট্রেনিং। যে যেদিকে পারছে ছুটছে। জামাল ভাই চিৎকার করে কামালকে বললো, কামাল বাড়ি যা। মার কাছে যা। কামাল দৌড়ে বাড়ির ভিতরে চলে এলো। দেখলো কেউ নেই। সবাই বাড়ির পিছনে যে বেড়া তার মধ্যে লুকিয়েছে। কামাল উপুর হয়ে নইল গাছটার নিচে শুয়ে পরলো। কামাল জানে এভাবে শুয়ে পরতে হয়। ট্রেনিংএ অনেক কিছু শেখায়। মনে মনে আল্লহকে ডাকছে আর ভাবছে আজকেই ওর শেষ দিন। এ রকম বোমাবর্ষন হলে আর কেউ বাঁচে না। সবাই মারা যায়। মার কথা খুব মনে পরলো। মা যে কোথায় কে জানে। নিলুইবা কোথায়!
আধা ঘন্টার মধ্যে সব থেমে গেলো। থেমে গেলেও সাবাই ভাবলো আবার বোমাবর্ষণ শুরু হবে। কেউ লুকানো অবস্থা থেকে উঠে আসতে সাহস পাচ্ছে না। কামালও ওভাবেই শুয়ে থাকলো। ও যে এখনও বেঁচে আছে এটা ভেবে আশ্চর্য্য হলো। গায়ে চিমটি কেটে দেখেলো সত্যি সত্যি ব্যথা। এভাবে কিছু সময় পার হওয়ার পর সবাই যে যার অবস্থা থেকে উঠে আসলো। বেড়ার মধ্যে যারা লুকিয়েছিল তাদের অবস্থা হলো ভয়াবহ। কেউ কেউ গু’ তে মাখা মাখি হয়ে গেছে। এই নিয়ে হাসা হাসি হলো এক প্রস্থ। কিন্তু সবার মনের মধ্যে আতঙ্ক। এর পর কি হবে? শহরে মিলিটারি নেমে যাবে। সবাইকে ধরে নিয়ে যাবে। লাইন দিয়ে দাড় করিয়ে নাকি গুলি করে ওরা। অতএব পালাতে হবে।
এর আগের দিন একটা ঘটনা ঘটেছিল। এক লোককে মুক্তিবাহিনীর লোকরা ধরে এনে গুলি করে মেরেছিলো প্রকাশ্যে। লোকটা পাকস্থিাানের গুপ্তচর ছিলো। স্টেডিয়ামের মাঠে লোকাটাকে বেঁধে তারপর গুলি করে মারা হয়। মেরে লোকটার মাংস কেটে টুকরো টুকরো করে বিলানো হয়। কামাল শুনেছে মজনু ভাই নাকি মাংসের টুকরো নিয়ে এসেছিলো। তখনই সন্দেহ হয়েছিলো কিছু একটা ঘটবে শহরে।
আলম ভাইয়রে অফিসের একটা দুই দরজার টয়োটা স্টারলেট গাড়ি আছে। শহরে এ রকম কয়েকটি মাত্র গাড়ি চলে তখন। অফিস টফিস সব বন্ধ হয়ে গেছে আগেই। সাত মার্চ ১৯৭১ সালের বঙ্গবন্ধুর ভাষণরে পরই কার্যত সব বন্ধ। গাড়িটা আলম ভাইয়ের অফিসের ম্যানেজারের। সরকারী ব্যাংকের ম্যানেজার। ম্যানেজার সাহেবের বাড়ি অন্য জেলায়। গাড়িটা কামালদের বাড়িতে থাকে। এই সুযোগে আলম ভাই ওটা দিয়ে ড্রাইভিং ট্রেনিং করে। আলম ভাই চালায় আর পোলাপানরা গড়ির পিছন পিছন দৌড়ায়। একদিন হয়েছে কি আলম ভাই দরগা বাড়ির কাছে গাড়িটা ব্যাক করতে গেছে ওমনি গিয়ে লেগেছে একটা গাছের সঙ্গে ধাক্কা। ব্যস। পিছনের গ্লাস চুর চুর করে ভেঙ্গে চৌচির। ঝুর ঝুর করে কেমন সব ঝরে পড়লো।

২.
কামালরা ঠিক করলো পালাবে। রাকুদিয়া যাবে। বেশী একটা দূর না। দশ বারো মাইল হবে। কি ভাবে যাবে? বাস টাস বন্ধ হয়ে গেছে। ঠিক হলো ব্যাংকের গাড়িতে করেই যাবে। আলম ভাই তখনও ভালোমতো ড্রাইভিং শেখেনি। অগত্যা গাড়ির যে ড্রাইভার তাকে হাতে পায়ে ধরে খবর দিয়ে আনা হলো। সে ছিলো খুব সাহসী লোক। রাতের অন্ধকারে কামালরা রওয়ানা হলো রাকুদিয়া বড় আপার বাড়িতে। দোয়ারিকা ফেরি পার হলেই বড় আপাদের বাড়ি। জাব্বার ভাই তহশিল অফিসে চাকরি করে। আয় ইনকাম ভালো। বদলির চাকরি। এখন অবশ্য বাড়িতেই। সর্বশেষ যশোহরে ছিলো। তার তিন ছেলে মেয়ে। বড়টার বয়স আট। কামালের দুই বছরের ছোট মাত্র। মাসুদ নাম। এর পরেরটা মেয়ে। তারপর আবার ছেলে। ছেটোটার বয়স মাত্র দুই।
বড় আপার বাড়ির অবস্থা বেশ ভালো। জমি জমা আছে। খেজুরের রস, আখের গুড় এসব হয়। আখের রস জাল দিয়ে প্রচুর গুড় হয়। বাজারে সেই গুড় বিক্রি হয়। ফল ফলাদি চাষ করে। বাঙ্গি, তরমুজ, খিরা এসব হয়। নারকেল গাছ আছে অনেক। একবার কামাল নারকেল গাছের মাথায় উঠে গেছে। হঠাৎ দেখে মিলিটারি আসছে। কামাল এমন ভয় পেয়েছে। নিচে ছিল নিজাম, দুলাল , মাসুদ। ওরা সব দৌড়ে পালিয়েছে। কামাল করলো কি ভয়ে হাত ছেড়ে দিয়েছে। ঝর ঝর করে নিচে নেমে এলো। কামালের পায়ের দু ফাকে এমন ছড়ে গিয়েছিল যে সেটা ওকে অনেকদিন ভুগিয়েছে। ঘা হয়ে গিয়েছিলো। পেকে পুঁজ হয়ে যায়। কয়েক মাস লেগেছিলো ভালো হতে। কারণ কামাল কোনো ওষুধ দেয়নি। কাউকে বলেও নি। বললেও ওই সময় কোনো কাজ হতো না। তখন সবাই পালিয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছে। ধাপরকাঠি যাওয়ার পরও সেই ঘা ছিলো। প্রতিদিন সকাল হলে দেখতো পেকে আছে ঘায়ের যায়গাটা। পুঁজ বেড় করে মাঝে মাঝে বরিক পাউডার নারকেল তেলে মাখিয়ে লাগাত। তাতে আরো পেকে যেতো।
তো কামালরা রওয়ানা হয়েছে বড় আপাদের বাড়িতে। মা, নিলু, আলম ভাই ভাবি সহ আরো অনেকে। রাতের অন্ধকার। দেখতে পেলো অনেকেই পালাচ্ছে। কেউ পায়ে হেঁটে, কেউ রিকশায়, কেউ ঠেলা গাড়িতে। মাঝে মাঝে দেখতে পেলো মুখে কাপড় বাধা কারা যেনো লোকজনকে সাহায্য করছে। মনে হয় এরা মুক্তিযোদ্ধা হবে। গাড়িতে কয়েকটা ট্রিপ দিতে হবে। মাঝে মাঝে রাস্তাায় গাছ কেটে বেরিকেড দিয়েছে। মুখ বাধা লোকগুলো গাছ সরিয়ে যাওয়ার পথ করে দিচ্ছে। ভাগ্য ভালো সে রাতে দোয়ারিকার ফেরি চালু ছিল।

৩.
বড় আপাদের বিরাট বড় বাড়ি। কোনো অসুবিধাই হচ্ছে না থাকতে। দু’দিন পর আবার বিমান হামলা। দোয়ারিকার অদুরেই শিকারপুর ফেরিঘাট। সেখানে ফাইটার প্লেন থেকে বোমাবর্ষন করা হলো। ওখানে লষ্ণঘাটে দুটি লষ্ণ বাধা ছিল। সেই লষ্ণ বোমা মেরে উড়িয়ে দেয়া হেলো। দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছে। দুর থেকেই দেখা যায় আগুনের লেলিহান শিখা। এই পথেই ঢাকা থেকে মিলিটারিরা আসবে বরিশাল শহরে। এ জন্য রাস্তা ক্লিয়ার করা হলো বোধহয়। এবং বিকালের দিকেই মিলিটারি এসে গেলো সড়ক পথে।
কামালরা এখানেও নিরাপদ মনে করলো না। আরো গ্রামের দিকে পালিয়ে গেলো সেই রাতে। জব্বার ভাইয়ের কোনো এক আত্মিয়ের বাড়িতে। যাওয়ার সময় দেখতে পেলো রহমতপুরের দিকে দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছে। আর মূর্হুমুহু গুলির আওয়াজ। এমন আওয়াজ যে বুক কেঁপে উঠে। বাতাসে শিষ কেটে যায় রাইফেলের গুলি। মিলিটারিরা যাওয়ার পথে পথে ধ্বংষজজ্ঞ চালিয়ে যায়। আগুন ধরিয়ে দেয় বাড়ি ঘর ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে। কামালরা এখানে বেশ কয়েকদিন পালিয়ে থাকে। এর মধ্যে একরাতে ডাকাত পরলো। বড় আপার সব নিয়ে গেলো। সোনা দানা টাকা পয়সা সব। ডাকাতদের উৎপাতে কামালরা আবার ফিরে এলো রাকুদিয়ায়। বড় আপার বাড়িতে দু’দুবার মিলিটারিরা এসেছিলো। তারা মুক্তিবাহিনীর খোঁজ করে। বড় আপার দেবর মানিক মামা মুক্তিবাহনীতে যোগ দিয়েছে। বাড়ির যুবতী মেয়েদের ড্রামের ভিতর লুকিয়ে রাখা হয় যখনই মিলিটারিরা আসে। এর মধ্যে নিলুও ছিলো।
একদিন দুপুরে মিলিটারিরা এলো। সঙ্গে কয়েকজন বাঙ্গালি লোক। অচেনা। মানিক মামার খোঁজে। বাড়ির সব পুরুষদের ধরে এনে লাইন দেওয়া হলো। গুলি করে মেরে ফেলা হবে। কামাল দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে ভয়ে থর থর করে কাঁপছিলো। একটু আগেই ওরা বাড়রি পিছনে রাইফেল বানানোর খেলা খেলছিলো। বেয়োনেট বানাচ্ছিলো কাঠ দিয়ে। ওরা খুদে মুক্তিযোদ্ধা। এখন ভয়ে সব ফেলে এসেছে। মনে মনে ভাবলো না জানি দেখে ফেলেছে। কামাল দুর থেকেই দেখেছে মিলিটারিরা আসছে। মানিক মামার আম্মা কোরান তেলোয়াত শুরু করে দিয়েছে । বার বার ভুল হচ্ছিল। ভয়ে কী পড়ছে নিজেই জানে না। মেয়েরা কান্না কাটি করছে। রাইফেলেরে খটা খট আওয়াজ হচ্ছে। সবার চোখ বেঁধে ফেলেছে রাজাকাররা। এক শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থা। একটু পরই কতগুলো মানুষ লাশ হয়ে পড়ে থাকবে। কি নির্মম। কি ভয়াবহ। কিন্তু কি মনে করে মিলিটারিরা গুলি করলো না। কয়েকজনকে রাইফেলের বাট দিয়ে বাড়ি মারলো। তারপর চলে গলো। যাওয়ার সময় কি কি সব বলে গেলো উর্দুতে। মৃত্যুর মুখ থেকে বেঁচে এসে সবার সে কি কান্না। কামালরা পরদিনই আবার বরিশাল চলে এলো।

আন্জুমান রোজী
প্রবাসী, লেখক

ছেলেটির নাম বিজয়

মনখারাপ করা এক বিষন্ন দিন আজ। মেঘ-থমথমে আকাশ। ঝিরিঝিরি ঠাণ্ডা বাতাস বইছে! বৃষ্টি হওয়ার পূর্বলক্ষণ। এইসময়ে কেয়া ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে আকাশ দেখছে। মনের সঙ্গে প্রকৃতির কী সাযুজ্য! বুকের ভেতর কান্নার গুমোট ভাবটা আকাশের সঙ্গে মিশে একাকার হয়ে গেলো! কেয়ার মনখারাপের সঙ্গে সঙ্গে প্রকৃতিও আজ মনখারাপ করে আছে। এমনটা ভাবতে-ভাবতে ব্যালকনি থেকে বের হয়ে- কেয়া বিজয়ের ঘরে এলো। তখনও ঘুমোচ্ছে বিজয়। সকাল দশটা বাজে। সারারাত ছেলেটা যে কী করে! একটুও ঘুমোয় না। সকাল হলেই পড়েপড়ে ঘুমোয়। বিছানার কাছে গিয়ে বিজয়ের মাথার পাশে বসলো কেয়া। কেয়ার একমাত্র ছেলে বিজয়। যার জন্য এতো যুদ্ধ; এতো সংগ্রাম। কেয়া একদৃষ্টিতে বিজয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। নাহ, বিজয় কারোর মতো হয়নি। না কেয়ার মতো, না শোভনের মতো। সোনালী গমের মতো গায়ের রঙ। মাথায় ঘনকালো চুল, লম্বাতেও সবাইকে ছাড়িয়ে গেছে। অনেকেই বিজয়কে দেখে মন্তব্য ছুঁড়ে দেয়,”ছেলেটা দেখতে পাঠানদের মতো”! কেয়ার বাবার বাড়িতেও এই ব্যাপারে মৃদু গুঞ্জন চলে। অথচ বিজয় মাসে কেয়ার ছেলের জন্ম হয়েছিল বলে; নানা-নানি, খালা, মামা সবাই তার নাম রেখেছিল বিজয়। কারণ, সবাই জানতো, বিজয় কেয়া আর শোভনের ছেলে।

একাত্তরে যুদ্ধ শুরু হবে হবে করছে। এমনসময় কেয়া আর শোভন পালিয়ে যায়। হঠাৎ করেই কেয়ার বাবা মা অন্যত্র বিয়ের ব্যবস্থা করে ফেলে। আর এদিকে বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের শুরু থেকে কেয়া আর শোভন একে অপরকে জানে, বোঝে; তাও প্রায় এক যুগেরও বেশি। ওরা দুজন প্রতিজ্ঞা করেছে – বাকি জীবন একসঙ্গে পথ চলবে। এমন অবস্থায় কোনো গত্যন্তর না দেখে সবার অজান্তে দুজন পালিয়ে গেলো। রাতের ট্রেনে সোজা চিটাগাং। চিটাগাং আসার পর ছাব্বিশে মার্চের সেই কালো রাতে পাকবাহিনীর বীভৎস্য থাবা সারা বাংলাদেশে ছেয়ে গেলো। কেয়ার কাছ থেকে শোভন ছিটকে গেলো। যুদ্ধের দামামায় শোভন একাকার হলো। তাদের আর একসঙ্গে থাকা হলো না। এরই মধ্যে পাকিস্তানী আর্মি অফিসার কেয়াকে ক্যাম্পে নিয়ে যায়। দীর্ঘ ছয়মাস কেয়ার ওপর চলে উপর্যুপরি ধর্ষণ, নির্যাতন। এভাবে চলার মধ্যে একদিন কেয়া সেখান থেকে পালিয়ে শরণার্থী শিবিরে ওঠে। এক পাদ্রী কেয়াকে পরম যত্নে আশ্রয় দেয়। কেয়া আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসে। কিন্তু ততদিনে কেয়ার শরীরে বিরাট পরিবর্তন চলে আসে। কেয়া বুঝতে পারে এ কার বীজ গর্ভে বহন করে চলেছে। ডিসেম্বরে বিজয় ঘনিয়ে আসার পূর্বমুহূর্তে কেয়া ঢাকায় আবার বাবা মায়ের কাছে ফিরে আসে। বাড়িতে ফিরে আসাতে আনন্দের রোল বয়ে গেলেও কেয়ার শারীরিক অবস্থা দেখে বেশ চিন্তিত হলো সবাই। পরক্ষণেই বুঝে নিতে চেষ্টা করলো যে এই অনাগত ভবিষ্যৎ কার বদৌলতে আসছে। কেয়াকে বিভিন্ন প্রশ্ন করে যা জেনে নিল; তাতে সবাই নিশ্চিন্তে ছিল। কেয়া খুব সন্তর্পণে সবকিছু চেপে গেলো। কিন্তু সমস্যা জোটপাকানো শুরু করলো- যখন বিজয় বড় হতে পাগলো!

বিজয়ের হাঁটাচলা, কথাবার্তায় এমনকি শারীরিক গঠন দেখে সবাই দিনেদিনে অবাক হতে থাকে। বিষয়টা জটিল হওয়ার আগেই, সরকারী স্কুলে শিক্ষকতা করা কেয়া; চিটাগাং-এ বদলির জন্য আবেদন করে। বদলির আবেদন মঞ্জুর হতেই কেয়া আর দেরি না করে বিজয়কে সঙ্গে করে ওখানে চলে যায়। আজ প্রায় বিশবছর ধরে এখনানেই পড়ে আছে। বিজয় ইউনিভার্সিটির গণ্ডি পেরিয়ে এক মাল্টিন্যাশনাল কোম্পনীতে কাজ করে। মা ছেলে মিলে দিব্যি তাদের দিন চলে যায়। তারপরেও, কোথায় যেন এক শূন্যতা। ছেলেটার মুখের দিকে তাকালে বুকের ভেতর মোচড় দিয়ে ওঠে। এ কেমন বিধির বিধান! কার ললাটে বিজয় কেতন এঁটেছে?

ছেলেটির নাম যদি বিজয় না রেখে সোয়ান রাখা হতো; তাহলে কী হতো! কিছুই হতো না, কারণ মাতৃত্বের বন্ধনে সব সন্তানই সমান। যেখানে কেয়ার জন্য কোথাও কেউ নেই, এমনকি মাঝেমাঝে চারদিক নিথর নিস্তদ্ধ মনে হয় সেখানে বিজয় যেন একফালি চাঁদের আলো। তারপরেও বিজয়মাসের এমন নির্মম পরিহাসে কেয়া ন্যুব্জ হতে থাকে। আজ শোভনের স্মৃতি চিহ্ন কোথাও নেই, শুধু আছে এক দীর্ঘ নিঃশ্বাস।

লুৎফুল হোসেন, লেখক

শীত বিকেলে এক প্রত্যুষ

শীত পড়ছি পড়ছি সময়ের বিকেলটা মোহাচ্ছন্ন করে দেবার মতোন ভালো লাগে রুদ্রের। হিমেল আর ঋষির সঙ্গে বন্ধুত্বটা ওর এমনি নোটেশনে যে, পছন্দ অপছন্দের কোনো কিছুতে খুব একটা তফাৎ এই ত্রিরত্নের বলতে গেলে নেই।হিমেলের বাসায় তিন বন্ধু মিলে আজ বসেছে বেশ ক’দিন পর। পেঁয়াজু, পাকোড়া আর সিলন চা। ওদের মঞ্চ হালকা মেঘের চাদরের মতো কুয়াশার হাতছানি দেয়া লেকের পাড়ে তিন তলার ঝুল বারান্দা। কুড়মুড় করে পেঁয়াজুর সঙ্গে কথাগুলোকেও কিঞ্চিৎ চিবুতে চিবুতে ঋষি বলে ওঠে, দোস্ত আজকে নো পলিটিক্যাল আলাপ। আড্ডাটা মাটি করিস না। বাকি দুজন কথার পিঠে পিঠে ঘাড় নেড়ে সঙ্গে সঙ্গেই জানালো অনাপত্তি।প্রথমে কিছুক্ষণ সেই ক্লাস সেভেনের সুরভি প্রসঙ্গ নিয়ে শৈশবের স্মৃতি কচলাকচলি করে আলাপে ঢুকে পড়লো ক্রিকেট। বাংলাদেশ টিমের সাম্প্রতিক বাজে ফর্ম নিয়ে হতাশা, শ্লেষোক্তি। সাকিব, তামিম, মোস্তাফিজ এদের পুরোদমে না পাওয়া। নাসির, রিয়াদ, মুশফিক, মিরাজ হয়ে কথারা ঘূর্ণাবর্তে জট পাকাতে থাকে হাতুড়েসিংহের উপর। মেজাজ খিচড়ে যাবার ভয়ে হিমেল টেনে আনে ফুটবল প্রসঙ্গ। সেই সময়কার গল্প। যখন জমানো খেলা মানেই গ্যালারি উপচে পড়া দর্শক। ফরিদের গ্যালারী পত্রিকার কাটতি। আরামবাগ আইলো, উয়ারি আইলো; মারামারি, দৌড় ঝাঁপ। ফুটবলের সেই প্রাণবন্ত দিন। কোথায় হারিয়ে গেলো গোপন দীর্ঘশ্বাসে ভর করে!এখন! সবাই মেসি চেনে, সিরন চেনে, নেইমার চেনে। ইউরোপ ল্যাটিন কোনো খেলা বাদ নেই। এমনকি একগাদা ছেলেপুলে ইএসপিএন ভার্চুয়াল ফুটবলও খেলে। অথচ এরা কোনোদিন ঢাকার মাঠে একটা ফুটবল খেলাও দেখে নাই। হ দোস্ত। রুদ্রের গলা শোনা যায় ম্যালা পরে। সব এহন ভার্চুয়াল। তার উপরে আছে পেলে না ম্যারাডোনা না মেসি! এই নিয়া যুক্তি তর্কের তুফান। আরে যেই আমলের যে, একখানে আইনা কি কম্পিটিশান করান যাইবো নিকি। নামের ঢঙেই এমন করে কথা বলে ঋষি, বরাবর। হিমেল আপত্তি করতেই তর্ক জমে তাল বেতাল। তেতো হবার ভয়ে রুদ্র অল্প একটু কথা ঘুরায়। বলতো, আমরা কবে বিশ্বকাপ খেলুম? হ হইসে ! এখনো সাঁতার শিখো নাই, ইংলিশ চ্যানেল পার হইবা। মুডটা নষ্ট হবার রিস্ক নিতে নারাজ ঋষি। আরে ভাই গ্যাজাইতে সমস্যা কি! বলতে না বলতেই হিমেলের ভাগ্নেটা এসে যোগ দেয়। ওরা সবে সিগারেট ধরিয়ে আয়েশে টান দিচ্ছিলো সেকেণ্ড রাউণ্ড। রুদ্র হা রে রে রে করে ওকে ঘরে পাঠাতে তৎপর হয়। বাচ্চাটা নাছোড়বান্দা, বলে তাহলে তোমারা একটা কথা বলো। বাংলাদেশের কোন সময়ের টিমটা সেরা। ক্লাস ফোরে পড়লেও ফুটবল পাগল সৌম্যদীপ্ত নানান প্রশ্নে বড়দের জর্জরিত করে হামেশাই।পনেরো মিনিট পর জানাচ্ছি। আমরা আলাপ করে বের করি। এযাবৎকালে বাংলাদেশের কোন টিম সেরা। তারপর তোকে জানাবো। ভাগ্নে ঘরে চলে যেতেই গল্প এই প্রশ্ন ঘিরে আবর্তিত হতে থাকে। সালাহউদ্দিন, অমলেষ, আবুল, মুন্না এইসব নামগুলো ঘুরে ফিরে আসে কথার ভিতরে ভিতরে। ওদের মনে থাকে না সময়ের কথা। পনেরো মিনিট পেরুতে যা দেরী। সৌম্যদীপ্ত ঠিকই চলে আসে সময় মতো। বলে শোনো, বাংলাদেশ যদি কোনোদিন বিশ্বকাপও জেতে আমার কাছে সেরা দল হলো ‘বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা ফুটবল দল’। তিনটা প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ একেবারে নিশ্চুপ বনে যায়। সৌম্যদীপ্ত একাই কথা বলে যেতে থাকে। কবে কোথায় কে কে খেলেছিলো একাত্তরের সেই ফুটবল টিমে। সব ঝকঝকে মুখস্ত ওর। তিন বন্ধুর মাথায় একটা কথাই ঘুরপাক খেতে থাকে। এতো বাখোয়াজি করলাম, এমন নিরেট সত্যটাকে দৃশ্যমান করতে পারলাম না ! নতুন প্রজন্ম বুঝি পারবেই। পারলো তো ! কুয়াশার গন্ধ মাখা হালকা একটা বাতাস ঢেউ খেলে যায় বারান্দার খোলনলচে জুড়ে মিহি আঁচড় বুলিয়ে। মনে হয় কানের ভিতর পত পত শব্দ করে বাড়ি খাচ্ছে বাতাসে উত্তাল একটা উড্ডীন পতাকা।

নোনাজল

অরুণ কুমার বিশ্বাস, লেখক

ক.
অবাক বিস্ময়ে কুসুম তাকিয়ে আছে নদীর কিনারে, কিছু একটা ভেসে যাচ্ছে স্রোতের টানে। কুকুর, শেয়াল, নাকি মানুষের লাশ! সময়টা এখন মোটেও ভাল নয়। জুনের মাঝামাঝি, উনিশ শ’ একাত্তর। সারাদেশে বেজে উঠেছে যুদ্ধের দামামা। এ এক ভয়ানক অসম যুদ্ধ! পেশাদার নিয়মিত সৈন্যের সঙ্গে মুক্তিপাগল বাঙালির সংগ্রাম। এদের হাতে বন্দুক নেই, তবে বুকে আছে দেশাত্মবোধ, শত্রুর কবল থেকে বাংলা মা’কে বাঁচানোর প্রচন্ড তাগিদ। কিন্তু খালি হাতে লড়াই করা কঠিন। দেদারসে মরছে মানুষ, খানসেনাদের হাতে নিয়ত খুন হচ্ছে বাংলার দামাল ছেলেরা। নুন আর খুনের বাজার দর বড্ড কম। সবচে’ বেশি সস্তা বাঙালির লাশ।
খ.
কুসুমের কৌতূহলী চোখ এবার সতর্ক হল। খানিক বাদে ভাসমান বস্তুটা এসে তীরে ঠেকে। পুবের সূর্য এখনও রঙ ছড়াতে শুরু করেনি। কুসুম গতরাতে ভিজিয়ে রাখা বাসন-কোসন মাজতে এসেছে নদীর ঘাটে। আর ঘটনাটা ঘটে ঠিক তখনই। ভাসমান বস্তু যেন নড়ে ওঠে একবার, প্রাণের আবেশ স্পষ্ট হয় ক্রমশ। কুসুম ছুটে গিয়ে আলগোছে কান পাতে। হ্যাঁ, বেঁচে আছে এখনও, বেশ শুনতে পাচ্ছি বুকের ভিতর ধুকপুক শব্দ, প্রাণের স্পন্দন। কতোই বা বয়স- খুব বেশি হলে বিশ কি বাইশ। কে জানে কোন্ মায়ের বুক খালি করে ছুটে এসেছে দেশ মাতৃকার ডাকে! পরনে মোটা সবুজাভ প্যান্ট, গাঢ় লাল জামা। জাতীয় চেতনার প্রতীক, লাল-সবুজ পতাকা।
গ.
দেখে বড্ড মায়া হল কুসুমের। সমবয়সী যুবক, ভাই নয়তো প্রিয়তম বন্ধু। গুলিটা লেগেছে কাঁধের ঠিক বাঁ পাশে। আরেকটু নীচে হলে হয়তো আর বাঁচানো যেত না। পুব আকাশ একটু একটু করে ফর্সা হতে শুরু করেছে। যা করার এক্ষুণি করতে হবে। গাঁয়ের পরিস্থিতি ভাল নয়, যেকোন মুহূর্তে টের পেয়ে যেতে পারে পাক হায়েনাদের গুপ্তচর, রাজাকার রজব আলীর সাঙ্গ পাঙ্গোরা। কুসুম জলদি গিয়ে ডেকে আনে ভাই হিমেলকে।
‘কে রে বুবু, কী হয়েছে ওর?’ হিমেলের চোখে বিপন্ন বিস্ময়।
‘পরে বলবো। তুই শিগগির ধর, দেখিস যেন ব্যথা না পায়! আহা, বেচারা সারারাত পানিতে ভাসছে। কে জানে কোন্ গাঁয়ে তার বাড়ি, কেনই বা গুলি খেয়েছে। দেখে মনে হয় বিচ্ছুবাহিনীর একজন, জীবন বাজি রেখে লড়েছে দেশের জন্য। বীর বাঙালি এমনই, যুদ্ধের ময়দানে লড়তে লড়তে প্রাণ দেবে, তাও ভীরু কাপুরুষরে মতো লেজ গুটিয়ে পালাবে না।’
ঘ.
সারারাত রক্ত চোঁয়াতে চোঁয়াতে বড্ড নেতিয়ে পড়েছে যুবক। নাকের নীচে আঙুল ছুঁইয়ে দেখলো কুসুম- শ্বাস পড়ছে, তবে বড্ড ম্রিয়মাণ।
‘যা তো হিমেল, চুপিচুপি গিয়ে নগেনদাকে ডেকে নিয়ে আয়। আমার নাম করে বলবি, এক্ষুণি যেন ওষুধের Ÿাক্স নিয়ে চলে আসে। তবে খুব সাবধান, কাক-পক্ষীও যে ন টের না পায়!’
বুবুর আদেশ অমান্য করে না হিমেল। অন্য সময় হলে মুখ-ভেংচি কেটে পালিয়ে যেত। কিন্তু এখন সে কুসুমের চোখে দেখেছে এক মুক্তিপাগল তরুণকে সারিয়ে তোলার দৃঢ় প্রত্যয়। হিমেল বেরিয়ে যায় হাতুড়ে নগেনের খোঁজে। কুসুম বিন্দুমাত্র ইতস্তত না করে অচেনা যুবকের মাথাটা কোলে তুলে নেয়। পরম মমতায় হাত বুলিয়ে দেয় ক্ষত জায়গায়। হাঁড়িতে ফুটছে দুধ। দুধুটুকু খাওয়াতে পারলে শরীরে একটু বল পেত। ক্রমশ রাত বাড়ে, সেই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ে কুসুমের উদ্বেগ। হিমেল এখনও আসছে না কেন! তবে কি কোন বিপদ! একাকী কুসুম আগলে বসে আছে যুবকের টলায়মান দেহ। সহসা সে যেন যুবকের মুখের আদলে খুঁজে পায় তার প্রিয়তম বন্ধু সুজনকে। যে তাকে সেদিন বলেছিল, আর ক’টা দিন অপেক্ষা করো কুসুম, দেশকে শত্রুমুক্ত করে তবেই না তোমায় ঘরে তুলে নেব!