মুক্তি

স্মৃতি সাহা

(নিউইয়র্ক থেকে): আজকের দিনটি আগের দিনগুলোর থেকে আলাদা। রাহেলা চাচী মাষকলাই ডাল আর লাল আউশধানের চাল দিয়ে খিচুড়ি বসিয়েছেন উনুনে। একটু পর পর কয়েকটা শুকনো কাঁঠালপাতা পেয়ে উনুন টা দাউ দাউ করে জ্বলে উঠছে। শিউলি একমাস বয়সী মেয়েটাকে নিয়ে পৌষমাসের সকালের রোদে ওম নিতে উঠোনে একটি কাঠের পিড়িতে বসে আছে। কোলের মেয়েটা হাত-পা নেড়ে কুঁই কুঁই আওয়াজ করে চলেছে অনবরত। কিন্তু শিউলির সেদিকে ভ্রুক্ষেপ নেই। একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে উনুনের আগুনের দিকে। বড়ভাই এসেছে কালরাতে। কিন্তু এসে শিউলির কোলে মেয়েটাকে দেখে কেমন থমকে আছে। আর সকালে উঠেই বড় আব্বার বাড়িতে গেছে ডেকে পাঠিয়েছে বলে। সামনের সময়টা খুব অনিশ্চিত এটা ভেবে শিউলি একটু তটস্থ হয়ে আছে।

রাহেলা চাচী পুরাতন শাড়ী দিয়ে অনেকগুলি কাঁথা বানিয়ে দিয়েছে শিউলির মেয়েকে। এ’কদিনেই চাচীর খুব মায়া পড়ে গেছে বাচ্চাটার প্রতি। কাঁথাগুলি গুছিয়ে রেখে চাচী উনুন থেকে কাঠের টুকরোটা বের করে আঁচ কমায়। চুলোর পাশে বসেই শিউলির থমথমে মুখের দিকে তাকায় রাহেলা চাচী। বুকের ভিতর কেঁপে ওঠে। আগে থেকে রোদে রেখে দেওয়া সরিষার তেলের শিশিটা নিয়ে পা বাড়ায় শিউলির দিকে।

-ও মনি,মেয়েটা কখন থিকি কুঁ কুঁ করছে, খাওয়াতি হবে আমার কাছে দাও দেখি,আমি তেল মাখিয়ে খাইয়ে দেবো নে।

শিউলির খুব একটা হেলদোল না দেখে রাহেলা চাচী কাঁদতে থাকা মেয়েটাকে হাত বাড়িয়ে কোলে নেয়। উঠোনের রোদে পা ছড়িয়ে বসে মেয়েটাকে তেল মাখাতে থাকে আর শিউলিকে আড়চোখে দেখে মাঝেমাঝে

– এত ভাবছ কেন। মিজান সব শুনলি ঠিক বুঝতে পারবি। বাদল বরং মিজানকে খবর দিক। আমি বললি মিজান ঠিক বুঝবি তুমি দেখো।

-চাচী মিজান যদি না বোঝে!শিউলির গলা টা কেঁপে যায়।

এরমধ্যেই বড় ভাই বাড়ির ভিতর ঢোকে।

– বাদল, মিজানকে খবর দাও দেখি, আসতি বল। আমি কথা বলবো।

মা-বাবা মরা বাদল আর শিউলির কাছে এই রাহেলা চাচীই একমাত্র অভিভাবক। মায়ের খালাতো বোনকে মা তার প্রিয় দেবরের সঙ্গে বিয়ে দিয়ে এনেছিলেন। এই তালুকদার বাড়িতে দুইবোন রাজরানী হয়ে থাকতো। বাবা আর ছোট চাচা এই দুই বোনকে সংসারের সব দায়িত্ব দিয়ে নিশ্চিন্তে ব্যবসার প্রসার বাড়াতে ব্যস্ত থাকতো। বাবাদের ছিল পাটের ব্যবসা। দুই ভাই বিভিন্ন জায়গা থেকে নৌকায় করে পাট এনে গুদাম ভরে রাখতো। এরকমই একবার পাট আনতে গেল মাগুরা। তখন আষাঢ় মাস। ভরা পদ্মা। দু’কূল ছাপিয়ে ঢেউ আছড়ে পড়ে। আর আকাশে কালো মেঘ দেখলে তো ঢেউগুলি আকাশ ছোঁয়ার দুঃসাহস করতো। এমনি এক কালো মেঘের দিনে বাবা আর চাচা ফিরছিলো নৌকা ভরে পাট নিয়ে। লোকমুখে শোনা যায় মধ্য পদ্মায় বাতাসের জোর বাড়লে মাঝি বৈঠা ফেলে নদীতে ঝাপিয়ে পড়ে আর সাঁতরে প্রাণ বাঁচায়। কিন্তু বাবা-চাচা পাটগুলো বাঁচানোর শেষ চেষ্টা করেও পারে না। পাটসহ নৌকা যখন ডুবে যায় তখন নাকি দুই ভাই দু’জনকে জড়িয়ে ধরে ছিল। এই ঘটনার পর মা কেমন যেন নিষ্প্রাণ হয়ে যায়। সারাদিন ঘরের কোণায় পড়ে থাকতো। তখন বাদল আর শিউলির বয়স খুব বেশি নয়। বাবাকে হারিয়ে মাও যখন নির্বাক তখন ছেলেমেয়ে দু’টোর প্রায় অনাথ হবার যোগার। ঠিক সেই সময়ে রাহেলা চাচীই এই শিশু দুটির মা-বাবা হয়ে দাঁড়ালো। এরপর এদের মা যখন আক্ষরিক অর্থেই দুনিয়া ছাড়লো তখন রাহেলা চাচীই এদের শেষ আশ্রয় হয়ে রইলো।

তালুকদার বাড়ির তালুক আস্তে আস্তে কমতে লাগলেও রাহেলা বেগম শিশু দু’টিকে বড় করতে লাগলো স্বর্বস্ব দিয়ে। জমি জিরাত বিক্রি করে খুলনা শহরে রেখে বাদল আর শিউলির কলেজ শেষ করালো। বাদলের খুলনার একটি স্কুলে চাকরীও হলো। শিউলির সঙ্গে নিজের ভাইয়ের ছেলে মিজানের বিয়ে ঠিক করলো। মিজান সাতক্ষীরায় একটি কলেজে পড়ায়। শিউলিদের বাড়িতে যাতায়াত ছিল তার রাহেলা ফুফুর জন্য। তখন শিউলিকে দেখে তার ভাল লেগে যায়। আর জীবনের যুদ্ধ একা করে যাওয়া রাহেলা বেগমের অভিজ্ঞ চোখ তা পরখ করে বেশ আশ্বস্ত হয়, শিউলির জন্য। ভাইয়ের সঙ্গে কথা বলে বিয়ের দিন ঠিক করে ফেলে। আর ঠিক তখনই সব উল্টাপাল্টা হয়ে যায়। দেশে এক অদ্ভুত সময় হাজির হয়। জন্মাবধি নিজের জেনে আসা দেশটা পাকিস্তানি সামরিক সরকার অচেনা করে দিতে মরীয়া। নিজের অধিকারে সোচ্চার হয়ে ওঠা মানুষগুলোর উপর সব রোষ দিয়ে অত্যাচার করতে থাকে পাকিস্তানি মিলিটারি। সারাদেশে যেন আগুন জ্বলে ওঠে। দেশের অসংখ্য কিশোর, যুবক দেশকে পাকিস্তানিদের কবল হতে মুক্ত করতে মুক্তিবাহিনীতে যোগ দিতে থাকে। রাহেলা বেগম কিছু ভালমতো বুঝতে না পারলেও খুব বিপদের ভয়ে অস্থির হয়ে ওঠে। শিউলি মিজানের বিয়েটা দিয়ে ফেলতে চায়। কিন্তু মিজান দেশ স্বাধীন করার পণ নিয়ে বসে। রাতের আঁধারে বর্ডার পার হয় ট্রেনিং নেবার জন্য। আর রাহেলা বেগমকে না জানিয়ে সঙ্গে বাদলকেও নিয়ে যায়।

এরপরের সময়গুলো রাহেলা বেগমকে যেন জীবনের প্রকৃত যোদ্ধা করে তোলে। খুলনা শহরের খুব কাছে হওয়ায় যুদ্ধের আঁচ খুব তাড়াতাড়ি রাহেলা বেগমের গ্রামে চলে আসে। আর মুক্তি’র বাড়ি হওয়াতে শান্তিবাহিনীর চোখ সব সময় বাড়িটার দিকে। শিউলিকে নিয়ে তাই একদিন রাতের আঁধারে বর্ডারের খুব কাছাকাছি গ্রামে চলে যায় রাহেলা বেগম।নিমাই মাঝির খেয়াতে করে যখন রাহেলা বেগম আর শিউলি বর্ডার ঘেঁষা গ্রাম জীবনপুরে যাচ্ছিলো তখন অনেক লাশ ভেসে যেতে দেখেছে নদীতে। শিশু থেকে বৃদ্ধ সবার লাশ। নদীর পাশের গ্রামগুলো জ্বলতে দেখেছে। যত দেখেছে তত বিতৃষ্ণায় ভরেছে রাহেলা বেগমের মন। মন থেকে দোয়া করেছে মুক্তিদের জন্য, যেন ছেলেগুলো হানাদারদের উপযুক্ত শিক্ষা দিতে পারে। আর খেয়াতে বসেই সিদ্ধান্ত নেয় যুদ্ধে মুক্তিদেরকে সাহায্য করবে। জীবনপুরে রাহেলা বেগমের দূর সম্পর্কের এক ভাই থাকে। তার কাছেই গিয়ে ওঠে। রাহেলা বেগমকে নামিয়ে দিয়ে যখন নিমাই মাঝি ফিরছিলো তখন হানাদারদের হাতে ধরা পড়ে। ধূতি পড়া নিমাই মাঝিকে নাকি টুপি পড়িয়ে নামাজ পড়তে বলে। ভয়ে থতমত জীবন মাঝি কাঁদতে কাঁদতে যখন হানাদারদের পা ধরে ছেড়ে দিতে বলে তখন এক লাথিতে ছিটকে পড়ে অনেক দূর। এরপর নিমাই মাঝি উঠে দৌড়ে পালাতে গেলে পিছন দিক থেকে গুলিতে ঝাঁঝরা করে দেয় তাকে হানাদারেরা।

জীবনপুর বর্ডারের খুব কাছে হওয়ায় হানাদার আর শান্তিবাহিনী উৎপাত শুরুতে কম ছিল। বরং মুক্তিদের আনাগোনা বেশী ছিল। কতদিন যে মুক্তিদের অন্নের যোগান দিত রাহেলা বেগম তার ইয়ত্তা নেই। আবার অনেক সময় মুক্তিরা অস্ত্র রেখে যেত সেই বাড়ির খড়ের গাদায় লুকিয়ে, রাতের অন্ধকারে সেই অস্ত্র অন্য মুক্তিদের কাছে পৌছে দিত রাহেলা বেগম আর শিউলি। নিত্যনতুন মুক্তিদের মধ্যে রাহেলা বেগম তার বাদল আর মিজানকে খুঁজতো। যদিও সেই মুক্তিদের মাঝে বাদল আর মিজান না থাকলেও, রাহেলা বেগমের কাছে সব মুক্তিই ছিল বাদল আর মিজানের সমতূল্য।

যুদ্ধ শেষে পৌষের এক কুয়াশা মাখা সকালে স্বাধীনতার সূর্য নিয়ে বাদল আর মিজান ফিরে আসে রাহেলা বেগমের কাছে।

দেশ স্বাধীন হবার পর যখন রাহেলা বেগম নিজ গ্রামে ফিরে আসে তখন তাদেরকে নিয়ে খুব কানাঘুষো শুরু হয়ে যায়। সবাই ভেবেছিলো তালুকদার বাড়ির সবাই যুদ্ধে হারিয়ে গেছে। এই বাড়ির দুই মুক্তির সঙ্গে সঙ্গে রাহেলা বেগম আর শিউলিও হয় হানাদারদের হাতে ধরা পড়েছে না হয় নিজেদের বাঁচাতে দেশ ছাড়া হয়েছে। আর কোনোদিন ফিরবে না। তাই বাড়ি লুটপাটের সঙ্গে সঙ্গে দখলও করেছে কেউ কেউ। তারপর যখন রাহেলা বেগমের সঙ্গে শিউলি এক বাচ্চা নিয়ে গ্রামে আসলো তখন অনেকেই খুব বিরক্ত। বিশেষ করে রাহেলা বেগমের চাচাতো ভাশুর,যিনি শিউলি আর বাদলের বড় আব্বা। একে তো প্রায় দখল করে ফেলা তালুকদার বাড়ি ফেরত দিতে হচ্ছে তার উপর যুদ্ধের সময় কোনো সাহায্য না করার জন্য রাহেলা বেগমের দু’টো বাঁকা কথা শুনতে হচ্ছে। তাই অবিবাহিত শিউলির কোলে মেয়ে বাচ্চার উছিলায় সালিশ বসিয়ে এদেরকে অপদস্থ করার সুযোগ টা হাতছাড়া করতে চাইলো না শিউলিদের বড় আব্বা।

আজ সেই সালিশের দিন।

মিজানকে খবর দিয়েছি চাচী। সালিশে আসবি বলেছে- বাদল বলে।

রাহেলা বেগম অবাক হলেও চুপ করে থাকে।

শিউলি আর বাদলকে খিচুড়ি খেয়ে সালিশে যাবার জন্য তৈরী হতে বলে রাহেলা বেগম।

পৌষ মাসের বেলা দুপুর গড়ালেই দিন কেমন যেন দ্রুত সন্ধ্যার দিকে ছোটে। সালিশে যখন রাহেলা বেগম, শিউলি আর বাদল পৌছে তখন বেলা প্রায় পড়ন্ত। মিজান আর বড় আব্বাকে একসঙ্গে বসতে দেখে বাদল বেশ বিরক্তবোধ করে।

বড় আব্বা খুব বিরক্তি নিয়ে প্রশ্ন করে “শিউলি গ্রামের মুরুব্বীরা সব জানতি চাই তোমার কোলের বাচ্চাটা কে?”

শিউলি- ও একজন মুক্তির বাচ্চা বড় আব্বা।

বড় আব্বা- কিন্তু গ্রামের মুরুব্বীরা তা মানতি চায় না। দেশ স্বাধীন হবার আগে অনেকরকম ঘটনাই ঘটিছে। অনেক মেয়েদের ক্যাম্পে হানাদারেরা বন্দী করে রাখিছিল। তোমার সঙ্গে এমন কিছু ঘটি থাকলে বল। আর মিজানও জানতি চায় সবকিছু।

কথাগুলো শুনে ক্রোধে জ্বলে ওঠে রাহেলা বেগম।

রাহেলা বেগম- আপনি এগুলি কি বলছেন ভাইজান! জীবনপুরে আমি আর শিউলি মুক্তিদের সাহায্য করিছি। তাদের জন্য রান্না করি দিতাম, অস্ত্র পৌছি দিতাম। একবার সেই মুক্তিদের দলের এক মুক্তি তার পোয়াতী স্ত্রী’র খবর আনতি বলে। সেই মুক্তির দেওয়া ঠিকানায় গিয়ে দেখি হানাদারেরা সে বাড়ির সবাইকে মেরে ফেলিছে। আর পোয়াতী বউটা পুকুরের কচুরিপানার নিচে পালিয়ে জানে বাঁচিছে। তারপর বৌটাকে আমরা সঙ্গে নিয়ে আসি। বাচ্চা হবার সময়ই বউটা মরি যায়। সেই থেকে বাচ্চাটা শিউলির কোলে। অপেক্ষা করছি সেই মুক্তির জন্য। যদি আসে তাহলে বাচ্চাটা ফিরিয়ে দেবো। আর যদি না আসে তাহলে শিউলিই বড় করবি এই বাচ্চা।

মিজান- ফুপু আমি এই বাচ্চা মানতি পারবো না।

শিউলি বাচ্চা টাকে বুকের সঙ্গে আঁকড়ে ধরে। ঘৃণায় মন ভরে যায় মিজানের জন্য।

রাহেলা বেগম- মিজান তুমি এক মুক্তি হয়ে আরেক মুক্তির সন্তানকে মানতি পারবা না? এরপর আমিও আমার মেয়েকে তোমার কাছে দিতি পারবো না। এই সালিশে দাঁড়িয়েই আমি বলি গেলাম এই বাচ্চাকে আমার শিউলিই বড় করবি নিজের সন্তানের মতো। আজ আমি এই বাচ্চার নাম দিলাম মুক্তি। আর আমার শিউলি মুক্তির মা। আমার জন্যি সালিশ শেষ।

কথাগুলো বলতে বলতে পৌষ মাসের শীতেও দরদর করে ঘামছিলো রাহেলা বেগম।

সালিশ পিছনে ফেলে যখন রাহেলা বেগম যখন শিউলি আর বাদলের হাত ধরে বাড়ি ফিরছিলো তখন চিৎকার করে কেঁদে মুক্তি জানান দিচ্ছিল এই দেশটা ঋণী ওর কাছে, ওর শৈশবের কাছে, ওর বাবা মার কাছে।

ছবিঃ গুগল