মাঝে মাঝে ব্যস্ততাও আমাদেরকে নিঃসঙ্গ করে দেয়

স্মৃতি সাহা

জেগে থাকা নিউইয়র্ক শহর। কবি লোরকার ভাষায় স্লিপলেস সিটি। সেই শহরে স্বপ্নও যেন নির্ঘুম। এই শহরের দিনরাত্রির রোজনামচা স্মৃতি সাহার কলমে প্রাণের বাংলায় নিউইয়র্ক থেকে ধারাবাহিক ভাবে।

কিছু কিছু দিন আসে ধূসর ধুসরিমায় আচ্ছাদিত হয়ে। গুমোট আকাশও যেন অনুভূতি প্রকাশে কৃপন, বড্ড হিসেবী। অভিমানকে ঝরতে না দিয়ে, জমিয়ে রেখে কেমন যেন শীতল ভাবলেশহীন! এমন আকাশকে খুব দূরের আকাশ মনে হয়। এরচেয়ে বরং কালচে মেঘের জলভরা আকাশটা খুব কাছের। যেন শুধু হাত বাড়ানোর অপেক্ষা!! হাত বাড়ালেই টুপটাপ ছুঁয়ে যায়, জমানো অভিমান যেন জল হয়ে ঝরে পরে, হাতের মুঠোয় ধরা দেয়। হাতের মুঠোয় পাওয়া যায় বলেই মনে হয় এত আপন জলভরা মেঘের সেই আকাশ। আর ধুসর রঙের আকাশটা যখন ঘড়াভর্তি মন খারাপের গল্প নিয়ে হাজির হয় তখন আমি সেই ধুসরে উজ্জ্বল সব রঙে তুলির আঁচর দিতে থাকি ; যত্ন করে, নানান রঙে দিনটা রাঙাতে। কোথায় যেন একবার পড়েছিলাম যারা শীতপ্রধান দেশে সিজনাল ডিপ্রেশনে ভোগে তাদের জন্য বেশ কার্যকারী মহৌষদ নাকি উজ্জ্বল রঙ। শীতপ্রধান দেশগুলোতে এখন প্রায় সব হারিয়ে একলা হয়ে যাওয়া বৃক্ষরাজীর হাহাকার, বিবর্ণ ঘাসের ধূসর রঙা প্রতিধ্বনি আর পলক ফেলার অবকাশে ঝুপ করে শেষ হয়ে যাওয়া দিনের দীর্ঘশ্বাস কেমন যেন অবসাদে জড়িয়ে রাখে সারাক্ষণ। আর এই অবসাদকে কাটানোর জন্যই মনে হয় চারপাশে উজ্জ্বল রঙের ইচ্ছাকৃত এমন ব্যবহার। এমন কি উৎসবগুলোতেও এখানে উজ্জ্বল রঙের প্রাধান্য খুব স্পষ্ট। দু’দিন আগেই হয়ে যাওয়া থ্যাংকসগিভিং এ হলুদ রঙের উচ্ছল ব্যবহার আবার খুব শীঘ্রই আসতে যাওয়া ক্রিসমাসে লাল আর সবুজের অদ্ভুত মেলবন্ধন সব ধুসরিমাকে হারিয়ে দেয় অবলীলায়। নিউইয়র্ক জুড়ে এখন আনন্দের বার্তা নিয়ে উৎসবের মৌসুম। দু’দিন আগেই হয়ে গেল থ্যাংকসগিভিং ডে। এখানে বলে গিভিং ব্যাক থ্যাকস। নিয়ম করে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করার উৎসব। আমার কাছে উৎসবটি খুব ইতিবাচক। আর উৎসবটির ইতিহাস ছোট্ট করে বলার লোভ টা সম্বরণ করতে পারছি না। ইতিহাসটা এমন “ওয়ামপানেয়াঙ ( নেটিভ আমেরিকান) আর পিলগ্রিম এখানে মুখ্য চরিত্র। মে ফ্লাওয়ার নামক জাহাজে চেপে পিলগ্রিমরা আমেরিকায় আসে। নিজেদের দেশে পিলগ্রিমদের অনাহুত ভেবে ওয়ামপানেয়াঙ-রা বৈরি ব্যবহার শুরু করলো। বিভিন্নভাবে পিলগ্রিমদের সমস্যায় ফেলতে লাগলো। কিন্তু পিলগ্রিম, যারা নির্বিঘ্নে ধর্মচর্চা করতে নিজেদের দেশ ছেড়ে আমেরিকায় পাড়ি জমিয়েছিল তারা ওয়েমপানেয়াঙ-দের সাথে বৈরিতা না করে সন্ধিতে আসতে চাইলো। একে অপরকে সাহায্য করবে এমন সন্ধি। পিলগ্রিম রা ওয়েমপানেয়াঙ-দের শেখালো ভুট্টা চাষ। তাদের সহযোগীতা নিয়ে ওয়েমপানেয়াঙ-রা প্রথমবারের মতো প্রচুর ভুট্টা উৎপাদন করলো। ওয়ামপানেয়াঙ-রা এরই কৃতজ্ঞতাস্বরূপ ভুট্টার বিভিন্ন খাবার বানিয়ে রাতের খাবারে পিলগ্রিমদের পরিবেশন করলো। আর ঠিক এখান থেকেই থ্যাংকগিভিং ডে সূচনা।” তাই থ্যাংকস গিভিং ডে তে রাতের খাবারে ভুট্টার ব্যবহার খুব দেখা যায়। আর টার্কির ( বন মুরগী) ব্যবহারের গল্পটা অবশ্য বেশ পরের। সে গল্প না হয় আরেকদিনের জন্য জমিয়ে রাখি। আসলে কৃতজ্ঞতাবোধ যে কোন সম্পর্কের সুন্দর একটি দিক। আর থ্যাংকসগিভিং এর মূল প্রতিপাদ্য এটাই, সে কারণেই উৎসবটি খুব ইতিবাচক আর শিক্ষণীয়। থ্যাংকসগিভিং-এর পরের দিন টা ব্ল্যাক ফ্রাইডে। উৎসবের মৌসুম তাই প্রিয়জনের সাধের উপহারটিকে সাধ্যের মধ্যে এনে দেয় ব্ল্যাক ফ্রাইডে। এই একটি দিন আমেরিকার সকল শপিং মল, চেইন স্টোরগুলোতে অভাবনীয় সুলভ মূল্য নির্ধারণ করে সকল জিনিষপত্রের জন্য। এটা আর কিছুই নয় উৎসবের আনন্দ যেন সবাই সমভাবে পায় তা নিশ্চিত করা। যাই হোক গত কয়েকদিন দিন আমারো গেল উৎসবের মৌসুমকে বরণ করার ব্যস্ততায়। স্কুল-অফিস সব বন্ধ থাকায় সাংসারিক ব্যস্ততা দিনের অনেকটা সময় নিয়ে নিয়েছে। মাঝেমাঝে ব্যস্ততাও আমাদেরকে নিঃসঙ্গ করে দেয়। একান্ত আমার সময়টুকু নিজেকে লুকিয়ে ফেলে, আমাদেরকে ফাঁকি দেয়। জীবন যেন জোনাক পোকা হয়ে ক্রংক্রিটের মায়াজালে আবদ্ধ হয় আর গোধূলী হারাতে থাকে চোখের কার্ণিশ পেরিয়ে। তবুও আমি এর মাঝেও সময় চুরি করে জানালার পাশে দাঁড়ায়, সময়কে বন্দী করি সেই গেরুয়া বৈষ্ণবী ম্যাপল গাছটাতে!!

ছবিঃ গুগল