হারানো দুপুরের গল্পে কখনো…

ইরাজ আহমেদ

এখন দুপুর মানে লাঞ্চ ব্রেক। এখন দুপুর মানে কাজ আর কাজের মাঝে অফিসের নিচে চায়ের টং দোকানে এক কাপ চা আর একটা সিগারেট অথবা ব্যস্ত বিজনেস মিটিং, যানজট, মেসেঞ্জার অথবা হোয়াটস অ্যাপে ছিটকানো কথার রেশ। ব্যাস, দুপুর ফুরিয়ে বিকেল, বিকেল ফুরিয়ে সন্ধ্যায় সমর্পন।আর শুধু কাজ আর ব্যস্ততার ফিরিস্তি। মাঝে মাঝে মনে হয় বাঙালীর জীবন থেকে দুপুর হারিয়ে গেছে। জীবনানন্দ দাশ তাঁর কবিতায় লিখেছিলেন ‘‘এক একটা দুপুরে এক-একটা পরিপূর্ণ জীবন অতিবাহিত হয়ে যায় যেন’’। সত্যি সত্যি দুপুরে একটা জীবন অতিবাহিত হয় কি না জানি না, তবে এক সময়ে দুপুরের কাছে অনেক গল্প ছিলো, অবসর ছিল। সেই সময় এই শহরে দুপুর আসতো কুলফিওয়ালার হাত ধরে, দুপুর আসতো বইওয়ালার হাত ধরে। গলি পথে ডেকে যেতো লেইস ফিতা, টুং টাং শব্দে বাজতো আইসক্রীমের গাড়ির ঘন্টা। কান্ডজ্ঞানহীন ভাবে আমাদের ব্যস্ত করে তোলা এই শহরের পেটের ভেতরে আজ হারিয়ে গেছে আমাদের সেই দুপুর আর তার আলস্যের রঙ।

প্রায় চল্লিশ বছর আগে দুপুর আমার কাছে আসতো বিরক্তিকর অঙ্কের খাতা হয়ে। তখন স্কুল থেকে বাড়ি ফিরে নিয়ম ধরে আমাদের সবাইকেই পড়াশোনা করতে হতো। তার মধ্যে বেশীরভাগ সময় মূর্তিমান ভয় হয়ে থাকতো অঙ্ক।তখন বার বার শুধু ঘড়ির কাটার দিকে তাকিয়ে থেকে সময় যেতো, কখন বিকেল হবে! তখন তো খেলার মাঠ চুম্বকের মতো টানতো তার অমোঘ আকর্ষণে। এই শহরের যে পাড়ায় আমি বেড়ে উঠেছি সেখানে ‘সবুজ লাইব্রেরী’ নামে একটা বইয়ের দোকান ছিলো। দুপুরবেলা কোনোরকমে বাড়ি থেকে পালাতে পারলে সোজা চলে যেতাম ওই লাইব্রেরীতে। আট আনা পয়সা ভাড়ায় সেখানে আমাদের মাসুদ রানা পড়তে দিতো বিক্রেতা। দোকানের পেছন দিকে বইয়ের আলমারিতে পিঠ লাগিয়ে মেঝেতে বসে পড়তাম কৈশোরের সেই ভীষণ নিষিদ্ধ বই ‘মাসুদ রানা’।গায়ে মাথায় আরেকটু বড় হওয়ার পর শীতের দুপুরে বাড়ির ছাদে রেলিংয়ে পা ঝুলিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা ছিল আরেক চুম্বকের টান। সেখানে অল্প বয়সে পেঁকে ওঠার প্রক্রিয়ার সঙ্গী হিসেবে থাকতো সিগারেট।

আমার কৈশোরে দুপুরবেলা অনেক কাজ থাকতো। ফুটবলে হাওয়া দেয়া, ক্রিকেট ব্যাটের নড়বড়ে হাতল দড়ি দিয়ে বাঁধা, ঘুড়ির সুতায় মাঞ্জা দেয়া, বাড়ি থেকে হাতানো টাকায় মোড়ের কনফেকশনারীতে প্যাটিস খাওয়া। কৈশোর উত্তীর্ণ বয়সে দুপুরে আমাদের বন্ধুদের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ ছিলো গার্লস স্কুলের ছুটির ঘন্টা বাজতেই গলির মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকা, অস্থির দৃষ্টি মেলে খুঁজে নেয়া সেই নতমুখীকে। কোনোদিন একটু হাসি, কোনোদিন একবার বড় বড় চোখ তুলে তাকানো। সেইসব দুপুর তখন জীবনানন্দ দাশের সেই পরিপূর্ণ জীবন হয়ে যেতো। বুকের মধ্যে আছড়ে পড়তো সমুদ্রের ঢেউ। মনে পড়ে এই দুপুরবেলাই পড়া হয়ে গিয়েছিলো শরৎ বাবুর দেবদাস আর চরিত্রহীন। পড়েছিলাম লেডি চ্যাটার্লিজ লাভার, লাভস্টোরি। স্কুল জীবনে খাতার তলায় সাবধানে ঢেকে এইসব বই পড়তে হতো।বাড়িতেই ছিলো এসব বই। কিন্তু তখনো এসব বই পড়ে ফেলার ওপর নিষেধ ছিলো।

ছোটবেলায় দুপুরবেলা পাড়ায় কত ধরণের ফেরিওয়ালা ডেকে যেতো।কারো মাথায় কুলফি মালাইয়ের লাল কাপড় দিয়ে বাঁধা পাত্র, কারো কাঁধে বইয়ের বান্ডিল। লেইসফিতা ডাকতে ডাকতে ফেরিওয়ালা আসতো কাঁধে সাদা কাপড়ে মোড়ানো ঝুলি নিয়ে। বিভিন্ন বাড়ির তরুণীরা ভীড় করতো সেইসব মনোহারী জিনিস কিনতে। বাড়ির মহিলারাও যোগ দিতো সেই কেনাকাটায়। দুপুরে গলির অন্তরাত্না কাঁপিয়ে হাঁক দিতো জুতা সেলাই, জুতা সেলাই। আমাদের ছেঁড়া স্যান্ডেল মেরামতের আসর বসতো, সঙ্গে চলতো আড্ডা।

কখনো দুপুরে খুব একা হয়েও থাকতাম। শীতকালে বারান্দায় একা বসে বাগানে রৌদ্রের বিদায় পর্ব দেখতাম। স্কুলের গণ্ডি পার হয়ে কবিতা লিখতে শুরু করেছিলাম। ওইসব একলা দুপুরে কবিতার খাতা সামনে নিয়ে বসে আকাশপাতাল ভাবতাম। দেখতাম আকাশে একলা চিলের ভেসে যাওয়া, পোষা কুকুরটার ঘুম।

এখন দুপুর বলে সময়টাকেই হারিয়ে ফেলেছি মনে হয়। ছোটরা দুপুরে স্কুল অথবা কলেজ থেকে বাড়ি ফিরে মুখ গুঁজে বসে থাকে কম্পিউটারের সামনে। বড়রা কাজের গভীরে, অফিসে। এখন আর কাউকে দুপুরবেলা সাইকেলের হ্যান্ডেলে বাংলা সাবান বেঁধে অসময়ে বাড়ি ফিরতেও দেখি না। দুপুর হারিয়ে গেছে এই ব্যস্ত পৃথিবীর গহ্বরে।

ছবিঃ গুগল