বাংলাদেশের জন্ম দিতে প্রাণ দিলো ওরা…

পরিমল মজুমদার

পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী এলাকায় আসার ১১ দিন পর আমাদের ফার্মেসির চাবি নিয়ে ছোড়দাকে যেদিন ক্যাম্পে যেতে বললো, তার পরদিন আমরা সপরিবারে দেশ ছেড়ে পালালাম। নদী পথে সীমান্ত পেড়িয়ে প্রথমে আসামের ধুবরী, তারপর বালুরঘাট শহরে। আমার মামার বাড়িতে। সেখানে কিছুদিন থাকার পর মামা-মামীর বোঝা হয়ে দাঁড়ালাম আমরা।
চৌরঙ্গী মোড়ের পাশে আরেকটা মোড় ছিলো তখন। যেটা দিয়ে মোক্তার পাড়া রোডে যাওয়া যায়- সেখানে একটা বন্ধ দোকানের সামনে আমরা চৌকির উপর পানের দোকান দিলাম। বাসা ভাড়া নেয়া হলো মোক্তার পাড়া রোডে। এরপর আমাদের বেঁচে থাকার চেষ্টা দেখে ওই বন্ধ দোকানের মালিক তার দোকান ঘরটি আমাদের ভাড়া দিলেন নাম মাত্র টাকায়। আমরা একটা ফার্মেসী দিলাম।
একদিকে দেশত্যাগের অপমান বোধ আর বন্ধুবিহীন জীবন আমার ক্রমশঃ দুঃসহ হয়ে উঠলো। আমরা স্থানীয়দের কাছে আলাদা নামে চিহ্নিত হলাম- ‘জয়বাংলার মানুষ’।

মন খারাপ হলেই একা একা হাঁটতে শুরু করতাম। বাস স্ট্যান্ড পাড় হয়ে বেলতলা পার্ক, আরো এগিয়ে হাসপাতাল…আরো এগিয়ে চলা গন্তব্য বিহীন। কখনো আত্রাই নদীর খেয়া পাড় হয়ে ওপাড়ে গ্রামের হাটে ঘুরতাম। গ্রামের মানুষদের মাঝে চেনা মুখ খুঁজতাম..। পেতাম না।
আবার পিছু নিতাম, যুদ্ধ করে ক্যাম্পে ফিরতো যে মুক্তিযোদ্ধাদের দল তাদের। মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে গল্প করে মনটা ভালো হয়ে যেতো।

তারপর একদিন এলো সেই ভয়াবহ রাত। পাকিস্তানি কামানের শেল এসে পড়তে শুরু করলো এই শহরে। প্রথম দিনে এই গোলা একটি বাড়ির ছাদে এসে পড়ায় ওই পরিবারের ১১ জন মারা গেলো।

শহরজুড়ে মাইকে জানানো হলো, প্রতি বাড়িতে বাঙ্কার তৈরী কর‌তে হ‌বে। আমরাও করলাম, শুরু হ‌লো ভূতল জীবন। প্রায় প্রতি রাতে কামানের গোলা এসে পড়তে লাগলো।
গোলা আসাটা বোঝা যেতো। প্রথমে বাতাস কাটার বিকট একটা চোওওওওও শব্দ হতো, তারপর বিস্ফোরণের আওয়াজ। অনেক মানুষ মারা গেলো।
সেনাবাহিনী শহরের প্রবেশ করলো। এভাবে একমাস থাকার পর আমরা আবার পালালাম দুরের একটা গ্রামে। গ্রামটার নাম মনে নেই। আমাদের আশ্রয় হয়েছিলো ক্ষেতের মাঝখানে এক রুমের একটি খামার বাড়িতে।

ডিসেম্বর মাসের শুরুতে শহরে শেল পড়া বন্ধ হলো। আমরা আবার ফিরলাম। এরপর শুরু হলো ভারতীয় সেনাবাহিনীর বিজয়ীর বেশে দেশে ফেরা। সঙ্গে লরী বোঝাই বন্দী পাকিস্তানি সেনারা।

একদিন তারা একটা পাকিস্তানি ট্যাংক এনে শহরের প্রবেশ মুখে বসিয়ে দিলো। আমি প্রায় দিন বিকেলে ওই ট্যাংকের ভিতরে ঢুকতাম।
তারপর এলো সেই দিন। দাদারা বাচ্চু বোম আর আতশবাজি নিয়ে এলো বাসায়। আমরা স্বাধীন। শহরে মাইক বাজছে – ‘শোনোরে একটি মুজিবরের থেকে লক্ষ মুজিবরের …..’।

আমার মনে আছে, আত্রাই নদীর ধারে একটা সিনেমা হল ছিলো। ওখানে সিনেমা দেখেছিলাম, ‘বিলম্বিতালয়:। উত্তম কুমার নায়ক ছিলো। একটা গান ছিলো- এক ‘বৈশাখে দেখা হলো দু’জনার….’।

চৌরঙ্গী মো‌ড়ে কমলালয় নামে একটা স্টেশনারী দোকান ছিলো। ওখান থে‌কে বিখ্যাত শালিমার কোম্পানির চানাচুর আর ঝুড়ি ভাঁজা কি‌নে খেতাম।
আ‌রেক মোড়ে বিভাসের পানের দোকান। পা‌শে একটা নতুন কাপড়েরর দোকান হলো, নাম ‘ললিতা’ । মা‌লিক জয় বাংলার ।

ওই মোড়ে স্ট্রো‌কে আক্রান্ত এক ডাক্তারের দোতলা বাড়ি ছিলো। তার ছেলে জয়ন্ত মদ খেয়ে প্র‌তি‌দিন মাতলামি করতো। মাঝে মধ্যেই আমাদের জয়বাংলার লোক বলে গালাগাল দিতো।

আমার খুব জানতে ইচ্ছে করে, কেমন আছে বালুরঘাটের মানুষজন। বাংলাদেশের জন্ম দিতে নিজের জীবন দিতে হয়েছিলো যাদের, ওই পরিবারগুলোর অবস্থা কি ?
ইচ্ছে আছে একবার ঘুরে আসবো আমার স্মৃতি মাখা ফেলা আসা সেই চেনা শহর।

ছবি: রূপক মজুমদার।