তেজোময়ী

মেহেরুন্নেছা

সংসার একজন নারীর জন্য সবসময় বৈরি। কি চাকুরীজীবী আর কি গৃহিনী… উভয়ের ক্ষেত্রেই সেটা প্রযোজ্য। সমাজ, সংসার, পরিবারের মর্যাদার কথা ভেবে নারীরা মুখে কুলুপ এঁটে রাখেন।

নারীর প্রতি বিদ্বেষ যেমন পুরুষের ; নারীর প্রতি বিদ্বেষ তেমন নারীর; নারীর প্রতি বিদ্বেষ তেমন এ সমাজের। এ যুগে এসেও পারিবারিকভাবে বাবা-মা, ভাইয়েরা মিলে একজন নারীকে পৈতৃক সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করার জন্য পাঁয়তারা করতে থাকে। অথচ যেখানে একজন মা নারী ; সেখানেতো সেই মায়ের তাঁর কন্যা সন্তানের জন্যই সহানুভূতি থাকার কথা। মর্মান্তিক বাস্তবতা হলো মেয়ের প্রতি কিংবা মেয়ের পরিবারের প্রতি সহানুভূতি দূরে থাকুক আরো মেয়েকে খুব কঠিনভাবে দূরে ঠেলে দেয়। এখন পর্যন্ত পুত্র এবং পুত্রবধূরা তাঁদের যত মানসিক কিংবা সামাজিক নীপিড়নই করুক না কেনো বাবা-মায়ের পক্ষপাতিত্ব সেই পুত্রদের দিকেই। ব্যতিক্রম যে নেই তা নয়।। আমি ব্যতিক্রমদের কথা বলছিনা। আমি এখানে এমন কিছু নারীর কথা বলছি যাদের সারা জীবন অতিবাহিত হয় দূর্ভাগ্যের বেড়াজালে।

অদ্ভূত সাইকোলজি! আমার দেখা অনেক পরিবারেই তাদের কন্যা সন্তানের প্রতি এমন চরম রূঢ়তা চোখে পড়েছে।

আজ কেবলি সেইসব নারীদের মনে পড়ছে যারা তেজোদীপ্ত। যারা একেকজন মেঘে ঢাকা তারা। তারা নিজস্বতার অলংকারে মোড়ানো। জীবনভর সংগ্রাম করে নিজের উপর ভর করে তারা চলতে শিখে গেছে। উপলব্ধির দরজাগুলো তাদের নিকট উন্মুক্ত হয়ে গেছে। নৈতিকতার পরশ তাদের জীবনের পরতে পরতে ছাপ রেখে যাচ্ছে।
সমাজের এসব নীপিড়নকে অতিক্রম করতে গিয়ে তারা আজ বজ্রমুখর। তারা ভয়ঙ্কর প্রতিবাদী। এ নারীরা কষ্টে কষ্টে কষ্টিপাথর। তাদের পাশে তাদের স্বামী- বাবা-মা-ভাই-বোন-আত্মীয়-স্বজন কেউ নেই।

এই না থাকার পেছনের গল্পটা কিন্তু সত্যি সত্যি কঠিন-নির্দয়-পক্ষপাতদুষ্ট!

এদের কেউ কেউ হয়তো প্রচন্ড কষ্টের মাঝেই নিজে লেখাপড়া করে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। বিয়ের পরেও হয়তো স্বামীর কটাক্ষকে উপেক্ষা করে বাবা-মা-ভাই-বোনকে প্রতিষ্ঠিত করেছে। বেলাশেষে যেদিন সেই নারী জানালো তার শরীরের পক্ষে আর এতো বোঝা বহন করা সম্ভব হচ্ছেনা ; সেদিন থেকেই বাবা-মা-ভাই-বোন-আত্মীয়-স্বজন কেউ আর তার পাশে থাকলোনা। এতোদিন ধরে যে নারী স্বামী কিংবা শ্বশুরবাড়ির লোকজনের বিরাগ-ভাজন হয়ে নিজের বাবা-মা -ভাই-বোন-আত্মীয়-স্বজনকে এতো করলো তারা আর তার খোঁজ নেয়ার প্রয়োজন মনে করলোনা। অন্যদিকে শ্বশুরবাড়িও মনে করেছে যে এই নারী তার সর্বস্বই বাবার বাড়িতে দিয়েছে।
সুতরাং এতো আসলে খুব খারাপ মহিলা।

আর আত্মীয়-স্বজনের ক্লেদাক্ত চেহারার কথা না বললেও একটা অধ্যায় বাকী থেকে যাবে। এসব আত্মীয়রা মৌমাছির মতো। যতক্ষন দিতে পারবে ততক্ষনই তারা এসব নারীর সঙ্গে আছে। যখন দিতে অপারগ হবে তখন আর মৌমাছিদের গুনগুন শোনা যাবেনা। যেনো আত্মীয় হিসেবে তাদেরকেই সাহায্য করা ওই নারীর কর্তব্য; তার প্রতি সহযোগিতার কোনো দায়িত্ববোধ এদের থাকার দরকার নেই। বরং এই নারীর ভালো কোনো বয়ান এসব আত্মীয় কখনো মুখে আনবেনা। এরকম নারীরা হয় সবদোষে দুষ্ট।
কারন তারা স্পষ্টবাদী। একজন স্পষ্টবাদীকেতো এ সমাজ সহজভাবে নেয়না।

এর মধ্যে কোনো নারী যদি তার নিজস্ব চাওয়া-পাওয়াকে অটুট রাখার জন্য ডিভোর্সী হয়তো তাহলে তার জীবন  বিষিয়ে তুলবে। সে নারী যত পুত-পবিত্র কিংবা অনবদ্য হোক না কেনো সব কিছু তুড়ি মেড়ে এক ফুৎকারে উড়িয়ে দেবে। কারন তিনি ডিভোর্সী। তিনি দোষী। যেই পুরুষটির কারনে ডিভোর্স হলো তার কোনো দোষ নেই। সমস্ত দোষ হলো ওই নারীর।

এখনো এ দেশের নারীদের মুখে প্রতিধ্বনিত হয় … “ছেলেরা হলো সোনার আংটির ন্যায়; যেটা বাঁকা হলেও সোনার থাকে”! কি জঘন্য পুরুষতোষামোদী কথা!

আবার বলে …” পুতের নাতি, কাঁধে ছাতি!” এখানেও ছেলে সন্তানের জন্য যত পক্ষপাতিত্ব আর আহাজারি।

যে নারী পরিবার-পরিজন-আত্মীয়-স্বজন-এর জন্য এতো কিছু করলো তাকে এ সমাজ কোথাও এক দন্ড ছাড় দিতে রাজী নয়।

কেনো?

কারন সে একজন নারী।

কি পুরুষ কি নারী কেউ এখন পর্যন্ত এমন বলিষ্ঠ -চেতনাময়ীদের প্রতি উদার নয়। তাদের কখনো বুঝার চেষ্টা করেনি।এখনও এ সমাজ দেদীপ্যমান নারীদের কাবু করার জন্য তৎপর থাকে। এ অভিযানে হয়তো পুরুষদের সহযোগী হিসেবে কিছু ব্যক্তিত্বহীন-অসার-অমেরুদন্ডী নারীদেরও চোখে পড়ে।

তবুও এই মহিয়ষীরা চলবে। পথ যত বন্ধুর হোক না কেনো ; জীবন যতই একাকীত্বে বিলীন হোক না কেনো তাদের থামায় কার সাধ্য!কারন, এ নারীরা যে একা চলতে জানে!

ছবি:গুগল