অপরাধ কেউ কেউ করে সবাই কিন্তু অপরাধী নয়

বচ্চন গিরি

(কলকাতা থেকে): খুব ছোটবেলা থেকেই আমার পরীক্ষার তারিখ মনে থাকতো না| তখন আমার পড়ার ঘরে বড় বড় করে চক(পেন্সিল জাতীয়) দিয়ে পরীক্ষার তারিখ লিখে রাখতো আমার মা| আমার জীবনের প্রথম শিক্ষক|

স্কুলের ক্লাস পরীক্ষার সময়ে আমার অঙ্কের মাস্টারমশাই প্রায়ই আমাকে উনার বাড়িতে ডেকে পাঠিয়ে উনার একমাত্র মেয়ের সঙ্গে পড়তে বসাতেন| আমাদের পরিবারের তেমন অর্থবল না থাকায় উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত একটাও পয়সা চাননি, কারণ উনি জানতেন আমি পয়সা দিয়ে জীবনে কখনো টিউশনি পড়তে পারবোনা -উনি আমার শিক্ষক|

স্কুল লাইফ থেকে প্রতিদিন ভোর চারটায় ঘুম থেকে তুলে চোখে মুখে জল দিয়ে আমাকে পড়তে বসাতেন যিনি অথবা বৃষ্টির দিনগুলোতে একটা ছেঁড়া ছাতা নিয়ে আমাকে আনতে গিয়ে নিজে জলে ভিজলেও আমি যেন না ভিজে যাই, আমার যেন বই ব্যাগ না ভেজে সেদিকে যিনি নজর রাখতেন| আমাকে জীবনে বড় হয়ে ওঠার প্রথম পাঠ যিনি শিখিয়েছেন যিনি বতর্মানে তিনিও একজন শিক্ষক এবং তার কলেজের ছাত্র – ছাত্রীদের প্রিয় স্যার| তিনি আমার একমাত্র বন্ধু ও দাদাভাই| তিনিও একজন শিক্ষক|

ক্লাস নাইনে পড়ার সময় হাফইয়ার্লি পরীক্ষার সময় অঙ্কে আমি ১০০ র মধ্যে ১০ পেয়েছিলাম| তখন স্কুলের ছাত্র ছাত্রীদের সামনে প্রার্থনার লাইনে আমার কান ধরে যিনি বলেছিলেন -“তুমি জীবনে পরীক্ষায় পাশ করতে পারবেনা আর| তুমি আগের মতো নও, শেষ হয়ে গিয়েছো তুমি|” এইকথা শুনে মনে জেদ চেপে গিয়েছিল এবং তারপর থেকে জীবনে কখনো অঙ্কে কম নম্বর পাইনি| হয়তো সামনে নয় কিন্তু আমি কী করছি না করছি সেই খবর যিনি রাখতেন তিনি ফণীভূষণ পাল| তিনিও একজন শিক্ষক|

কলেজে ওঠার পর বয়ঃসন্ধির পাল্লায় পড়ে একটা সময় সবকিছু শেষ হয়ে গিয়েছিল| সেই সময় একজন মা, একজন বড় দিদির মতো যিনি সবসময় পাশে থেকে আমাকে গড়ে তুলেছেন তিনি মৌমিতা চক্রবর্তী| আমার প্রিয় মৌ দিদি| তিনিও একজন শিক্ষক|

আমার ইংরেজীর টিউশনি স্যার আমার কাছে পয়সা চাইতেন না কখনো| অথচ তার বাড়িতেও ঠিকমতো হাঁড়ি চড়তো না| খুব কষ্ট পেতাম মনে মনে কিন্তু উপায় ছিলোনা কিচ্ছু| তখন যদি উনার মতো মানুষ আমার পাশে না থাকতেন হয়তো জীবনে পড়াশোনা কী সেটাই জানতাম না| তিনিও একজন শিক্ষক|

ছোট থেকে খুব ইচ্ছেছিল সাংবাদিক হবো| একদিন এক সাংবাদিককে সাহস করে মনের গোপণ ইচ্ছেটা প্রকাশ করলাম| তারপর আমাকে আর পিছন ফিরে তাকাতে হয়নি| উনি নিজের হাতে কাজ শিখিয়েছেন সাংবাদিকতার খুঁটিনাটি| পরবর্তীকালে যখন সংবাদপত্রে সাংবাদিক হিসেবে যোগদান করার পর আমি উনার উপরের পোস্টে চাকুরি পাই একই সংবাদপত্রে| তখনও যিনি অফিসে সকলের সামনে অনায়াসে আমাকে ‘স্যার’ বলতে লজ্জা পেতেন না বরং আমি নিজেই লজ্জা পেয়ে বলেছিলাম -আপনি আমাকে ‘তুই’ বলবেন| তিনিই আমার শিক্ষক|

আমার বেশ মনে আছে আমি যার কাছে গিটার শিখতাম তিনি আমার কাছে কোনও পয়সা নেননি কখনো বরং একদিন বলেছিলেন -“তোর কাছে একটা জিনিস চাই দিবি? ভেবে নিস এটাই তোর ‘গুরুদক্ষিণা’…..
আমি অবাক হয়ে জানতে চেয়েছিলাম কী চাও?
তিনি মৃদু হেসে বলেছিলেন -“আমি টুকটাক লিখি কিন্তু কাউকে দেখাই না| লজ্জা-ভয় লাগে| যদি লোকজন হাসাহাসি করে সেই ভয়ে|
তারপর থেকে উনার লেখাগুলো পড়তাম আমিই| পরবর্তীকালে উনাকে ফেসবুক পোস্ট করতে বলি| উনি পোস্ট করতেন| এখন উনি খুব ভালোমাপের একজন লেখক| উনার কোনও বই বেরোয়নি ঠিক, কিন্তু উনার প্রতিটি লেখা আজও আমার এবং অনেকের মন ছুঁয়ে যায়| উনিই আমার সেই একলা সময়ের বন্ধু| উনিও একজন শিক্ষক|

দীর্ঘ দিন সাংবাদিকতা করার পর যখন চাকুরিটা ছাড়লাম ব্যাক্তিগত কারণে তখন পড়াশোনা থেকে একেবারেই বাইরে আমি| সেই সময় আমাকে বই নিয়ে পড়তে যে মেয়েটি বসিয়েছিল এবং সকাল- বিকেল -রাত্রি আজও ফোন করে খোঁজ নেয় যে মেয়েটি -কি কি পড়লি আজ বল? তিনি মৌদীপা মুখার্জী…
সে আমার কাছের প্রিয়জন ঠিকই কিন্তু সে আমায় পড়তে বসিয়েছে নতুন করে তাই সেও আমার শিক্ষক|

ফেসবুকে আমার আসা বা লেখালেখি বেশি দিন নয়| ২০১৫ -র ডিসেম্বর থেকে| তখন অরুনজিব রয়’দা,কল্যাণ মন্ডল’দা, অর্কায়ন বাসু’দা,বাসব মন্ডল’দা সহ আরও অনেকের সঙ্গে পরিচয় হয়| তারপর পরিচয় হয় আমার খুব প্রিয় বন্ধু হয়ে উঠেছে ঋত্বিক গোস্বামী, মিতালী সাহা সহ অনেকের সঙ্গে| পরবর্তীকালে যারা ভালো বন্ধু হয়ে উঠেছে| যাদের কাছে খুব দুঃখ পেলেও অনায়াসে কেঁদে ফেলা যায়| এরা সকলেই আমার শিক্ষক|

যে মেয়েটি আমার বোন, বন্ধু, সহকর্মী| আমার খুব দুঃখের সময়গুলোয় যে আমার কাঁধে হাত রাখে| যে আমাকে পথ চেনায় -চেনায় মানুষ কিন্তু দোষ করলে আমাকে কাটাছেঁড়া করতেও যে ভয় পায়না| যাকে লুকিয়ে আমি কোনও কাজ করতে পারিনা ঠিক ধরে ফেলে তিনি সূপর্ণা রায় চৌধুরী | ঘটনাক্রমে তিনিও একজন কলেজের অধ্যাপিকা|

আমি কোনও ভুল করলে যে মা -দিদি আমাকে ধমক দিয়ে বলে -“কান ছিঁড়ে দেবো তোর|” তারপর আপন স্নেহে আমাকে বুকে টেনে নেয় তিনি চন্দ্রাণী বাসু| তিনিও একজন শিক্ষক|
দীর্ঘ দিন কথা না বললে যার মুখ ভার হয়ে যায়| আমাকে ধমক দিয়ে বলে -“কেন কথা বলিস নি ভাই? অজুহাত খাড়া করবিনা মোটেই| তিনি সুমনা পাল তিনিও একজন শিক্ষক|

আমার বান্ধবী পামেলা দাস একজন সাংবাদিক কিন্তু পামেলার সৎ চিন্তা ভাবনা আমাকে প্রতিমূহুর্তে জীবনের শিক্ষা দেয় অথবা সাংবাদিক  পারমিতা পাল আমার খুব কাছের বন্ধু ও বোন| পারমিতার সততা ও কাজ আমাকে নতুন করে ভাবতে শেখায়| উনিও একজন শিক্ষক…..!

ভাবছেন সাপোর্ট করছি খুব| হ্যাঁ, করছি| কারণ জি.ডি বিড়লার ঘটনা খুবই জঘন্যতম ঘটনা| এই ঘটনায় অভিযুক্তদের কঠোরতম শাস্তির দাবী জানাই| কিন্তু কয়েকজন কে সামনের সারিতে বসিয়ে পুরো শিক্ষক জাতিকে নোংরা হিসেবে প্রমাণ করতে চাওয়া আমার কাছে সমান নিন্দনীয় হিসেবেই মনে করি| ঘটনাটা জঘন্যতম তার জন্য প্রতিবাদ হচ্ছে, আন্দোলন হচ্ছে অবশ্যই আমি সমর্থন করি কিন্তু দুজন বা দশজন ধর্ষণ করেছে বলে পুরো শিক্ষক জাতি ধর্ষক এই যুক্তি সত্যিই আমি মেনে নিতে পারলাম না|

ছবি:গুগল