নব্বই এর গল্প… এক

শেখ রানা (নিউবুরি পার্ক, লন্ডন)

নব্বই এর কথা ভাবলেই যে দৃশ্যটা আমি বন্ধ চোখে দেখি তা হলো- প্রেসক্লাবের সামনের প্রায় ফাঁকা রাস্তা, হাইকোর্ট কম্পাউন্ডের সবুজ মাঠ আর বর্ষাকালের রাত-দিন বৃষ্টি। টিনের চালে সেই বৃষ্টি পড়ার শব্দও শুনতে পাই।

এ এক অদ্ভুত নস্টালজিয়া! নব্বই দশক মানে তো শুধু নব্বই নয়, ৮৫ এর আবাহনীর হ্যাট্রিক চাম্পিয়ন এর কৈশোর দুঃখ, আলী ইমাম আর পরে নাসের হেজাজীর হাত ধরে প্রাণাধিক প্রিয় মোহামেডানের ৮৬-৮৭-৮৮ হ্যাট্রিক চ্যাম্পিয়নশিপ, জাফর ভাই এর সঙ্গে স্টেডিয়ামে প্রথম খেলা দেখা, এই সব দিন রাত্রি-র অদ্ভুত সুন্দর সাদা-কালো দিন, শুক্রবার সকাল বেলায় ঝন্টু-পন্টু দুই কিশোরের ছোটদের নাটক, মনের মুকুর, আমরা নতুন আমরা কুড়ির সেই সমবেত সঙ্গীত।

আর হাইকোর্ট মাজারে জুমার নামাজ শেষ করে মুঠো ভর্তি নকুল আর মিলাদের জিলিপি নিয়ে রুদ্ধশ্বাসে দেখতে বসা থান্ডার-থান্ডার-থান্ডারক্যাটস হোওওওওওও…

এই সব একাকার হয়ে একটা শান্ত, নিমীলিত পাখি হয়ে ওড়াউড়ি করে আমার মাথায়। অথচ সে দিনগুলোয় কত উদ্বেলিত হতাম! মনে পড়ে, ৯২ এর দিকে ফেরা নামে একটা সিরিজ নাটক হলো। খালেদ খান আর ফাল্গুনী হামিদ এর। খুব অন্যরকম! অথবা তৌকির আর মেমীর ফিরিয়ে দাও অরণ্য-র সেই আকুতি।

নব্বই বললেই আনন্দের ঝাঁপি খুলে দেয় ব্যান্ড এর গান, ক্যাসেট প্লেয়ার। এল আর বি, রেনেসাঁ, সোলস, শহীদ মাহমুদ জঙ্গী, লতিফুল ইসলাম শিবলী, বাপ্পী খান, আশিকুজ্জামান টুলু, প্রিন্স মাহমুদ সহ অনেক অনেক নাম এমনকি সাউন্ড গার্ডেন এর স্টুডিও ক্রু পরিমল পর্যন্ত। এই সব নাম ক্যাসেট এর গায়ে দেখতে দেখতে মুখস্ত হয়ে গিয়েছিল।

নব্বই ভাবলেই আমাদের ছোট্ট ঘরে একটা সেগুন কাঠের আলমিরা চোখে ভাসে। তাতে বই ভর্তি। হুমায়ুন আহমেদ, শাহরিয়ার কবির, জাফর ইকবাল থেকে শরৎ রচনাবলী। বঙ্গবন্ধু আর মুক্তিযুদ্ধের অনেক বই। নুলিয়াছড়ির সোনার পাহাড় আর ফেলুদা। আর টেবিলের নিচে স্তুপীকৃত বেগম, ক্রীড়াজগত, খেলা, বিচিত্রা আর আনন্দ বিচিত্রা। একটু পরে যায় যায় দিন আর বিচিন্তা, আজকের সূর্যোদয়। আর প্রতিদিন সাধু ভাষায় ইত্তেফাক। জ্বল জ্বল করতো তাতে প্রতিষ্ঠাতা তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার নাম।

এই সব শব্দ স্মৃতির ফাঁকে দেখতে পাই বেইলি রোড, ফুলার রোডে সাইকেল করে একটা ক্ষীণকায় কিশোর একা একা ঘুরে বেড়াচ্ছে। বিকেল হলেই প্রবল উৎসাহে ক্রিকেট খেলা। সেই মাঠে আবার একটা আম গাছ ছিলো। মাঝে মাঝেই টেনিস বল বিপুল বিক্রমে সেই গাছ থেকে টুপটুপ আম ফেলতো। আর আমরা হতবিহবল হয়ে মুহূর্ত ধরতাম। সেই মুহূর্তের অদৃশ্য হাত ধরে বর্ষাকাল শুরু হত।

সেই বর্ষা প্রারম্ভে উদাস হয়ে যাই। নব্বই এর সময়কালে ঢাকা শহরে অনেক সবুজ গাছ ছিল, আকাশ উপুর করে নামতো বৃষ্টি।

সেই ওম দেয়া বৃষ্টি আর একবার আমাকে আলিঙ্গন করলেই পারে!

ছবি: গুগল