ভালো লাগলে শুভঙ্কর হয়েই পড়ে থাকো

লুৎফুল হোসেন

বলেছিলাম নীল মসলিন আর একটা নীল টিপ । পরেছো কি সব কমলা, সবুজ ! আর ওটা কি দিয়েছো কানে ! অত্তো বড় ! মনে হচ্ছে কিছুক্ষণের মধ্যে কানটা ছিঁড়ে পড়ে যাবে ।

কি আশর্য ! ওটা তো তোমারই কিনে দেয়া । শাহরুখ শাহীদের জুয়েলারী একজিবিশন থেকে !

আর সেদিন যে খুব বলছিলে কমলা আর টিয়ে সবুজে নন্দিনীকে জ্বলজ্বলে দেখাচ্ছিলো?আমি বলে আজ ওই রংগুলোও ম্লান লাগছে বুঝি!

বলেছিলাম বোধ হয় । ভদ্রতা করে কত কিছুই তো বলতে হয়।

ও তোমার কাছে খুব শুনতে চেয়েছিলো বুঝি ! এক কুড়ি হাত দূর থেকে পারলে তো প্রায় চেঁচিয়ে বলছিলে ঘরশুদ্ধ মানুষের সামনে । আমি সারা দিন দেড় কুড়ি মানুষের খাবার আয়োজন করে ঝড়ো কবুতরের মতোন চুপসে আছি । আর উনার শখ উথলে পড়ছিলো শুভঙ্কর হবার । ভালো লাগলে শুভঙ্কর হয়েই পড়ে থাকো না কেন? অহেতুক বায়োস্কোপ দেখার শখ!

মনে হয় ক্ষ্যাপা রাজহংসী হয়ে ঠুকরে দিতে চাইছে যেনো ।

উফফ কিচ্ছু ভালো লাগে না । আমি আর কোত্থাও যাবো না।

নাটকের টিকিট দুটো আর ছোট্ট হ্যান্ডমেড পেপারে মোড়ানো বাক্সটা ওয়ারড্রোবের উপর রেখে সদ্য শুভঙ্কর উপাধি পাওয়া মানুষটা লঘু পায়ে ঘর ছাড়িয়ে বারান্দায় চলে যায়।নিজেকে নিমজ্জিত করে ধুম্রকুটশলাকায় ।

ন্যাচারাল হোয়াইট পার্লের মাঝখানে ব্লু স্যাফায়ার-এর একটা আগলি কাট স্টোন । একটু ওয়াইল্ড বিউটি বলা যায় । শখ করে আনা স্টোন এন্ড স্ট্রিংটা গুটি শুটি মেরে পড়ে থাকে হ্যান্ডমেড কাগজ আর আঠার গন্ধের সঙ্গে দোকানের কৃত্তিম সুরভির ককটেল ঘ্রাণ নিতে নিতে ওই ছোট্ট বাক্সটার ভেতর, তন্দ্রাচ্ছন্নের মতোন।

ধোঁয়ার সঙ্গে সখ্য গড়তে গড়তে মানুষটা ভাবতে থাকে। শার্লির হেঁয়ালীতে সায় দিয়ে নাটকটা দেখে একবারে বাড়ী ফেরাটাই বুদ্ধিমানের কাজ ছিলো । ভার্চুয়াল রোমান্সটাকে মাধবীলতার মতোন বেড়ে উঠবার যোগ্য সুযোগ দেয়া যেতো । অহেতুক তাড়াতাড়ি বাড়ী ফিরতে গিয়ে কিছু কাজও অসমাপ্ত ফেলে আসা হলো . . . সাধের রোমান্সের লতাগুল্মে শুধু কিছু পেট্রল ঢালা হলো।

আহলাদী জেদ যেনো দুটো মানুষেরই মাথার ভেতর ধেই ধেই করে নাচছিলো । আর সাতশো সমুদ্র নৈঃশব্দ সারাটা বাড়ী জুড়ে দিগন্ত জোড়া মাঠের মতোন বিস্তৃতিতে থম থম করছিলো । এক ফোঁটা কলের জল যদি কোথাও চুঁইয়ে পড়ে তবে নির্ঘাত বোমা ফাটার মতোন শোনাবে । ঘরময় অণু ও পরমাণুতে কেবলি নিস্তব্ধতা।

ছেলেটা হুড়মুড়িয়ে ঘরে ফিরেই হৈ চৈ বাঁধিয়ে সব স্তব্ধতা চৌচির করে দিলো । হাটু গড়িয়ে তার রক্ত পড়ছে বেশ । অপরাধীর মতোন মুখ করে দাঁড়িয়ে আছে অনির্বাণ । আহা (!) আহা (!) চিৎকারের ভেতর দিয়ে হতাশা ক্রমশ যেন ক্ষোভে রূপ নিলো ঘরের মাঝে ।

বাপ ব্যাটা মিলে মহা উল্লাসে সবটুকু শান্তি আমার জীবন থেকে ছিনিয়ে নিচ্ছে যেনো!

পাশের ক্লিনিক থেকে ব্যান্ডেজ বাঁধিয়ে ফিরতে ফিরতে ছেলের সঙ্গে কথা বলতে থাকে মানুষটা আনমনে ।

গতকালের মেসির মিসটা ! প্রথম পেনাল্টি মিস ছিলো তাই না?

মেসির চাইতে ছেলেটারই যেন বেশী মন খারাপ এজন্য । কি যে যাদু করেছে একটা মানুষ ! পৃথিবো জোড়া ছেলে বুড়ো সব তার প্রেমে দিওয়ানা । খেলে বটে ! তবু ছেলেকে একটু উস্কে দিতে চায়। বলে, সিরন তো দুর্দান্ত সব গোল করছে একের পর এক ! এদিকে মেসির মিস অথচ ও কিন্তু দু দুটো গোল দিলো পেনাল্টি থেকে । কোনো মিস নাই।

নাহ ! ছেলেটার মুখ গোমড়া হয়ে গেছে।

বার্গার খাবি?

কোনো উত্তর নাই । বাবার দিকে তাকায় ছেলে । বোঝে মন ভালো করতে চায় বাবা । সুযোগটাও সে লুফে নেয় । চওড়া একটা হাসি হেসে বলে,ডাবল চীজ গ্রিলড চিকেন বার্গার ! ওকে । আমি নেবো মাশরুম চীজ । মার জন্য নিয়ে যাবো একটা । কোনটা নেবো বলতো?

খুশী খুশী হয়ে গেছে অনির্বাণের মুখটা । তার দিকে চেয়ে মানুষটা ভাবে, কত সহজে এই ভালোলাগা । এই মন খারাপ তো আবার এই ভালোলাগা। ওই বয়সটাতেই যদি থেমে থাকতো জীবন?আহা !

ছবিঃ গুগল