দুপুরের জানালায় বালকের মুখ

ইরাজ আহমেদ

লিখতে বসে মনে হলো জানালার গল্প লেখা যেতে পারে। একদা জানালা এই নাগরিক জীবনে বেশ গুরুত্বপূর্ণ জায়গা দখল করে বসেছিলো। আমার অন্তত তাই মনে হয়। কথাটা ভাবতেই পেছনের কয়েকটা পৃষ্ঠা আপনাতেই উল্টে গেলো। জানালার ছবি দেখতে পেলাম, কাঠের জানালা। তখন তো আর থাই অ্যালুমিনিয়াম এসে ভারী আর অভিজাত আড়াল তৈরী করে দেয়নি।কাঠের জানালাই ছিলো আমাদের ভরসা। কাঠের জানালার সঙ্গে থাকতো কাঠেরই চৌকাঠ আর ছিটকিনি। সেই চৌকাঠ বৃষ্টির দিনে ভিজে অদ্ভূত মাদকতাময় ঘ্রাণ ছড়াতো। জানালার কাঠের পাল্লা বৃষ্টিতে ভিজে যেতো। অনেক সময় চুরি হতো বাইরে ঝুলে থাকা ছিটকিনি। তবুও জানালা বড় প্রিয় ছিলো।

এখন পেছন ফিরে তাকালে দেখতে পাচ্ছি কোনো মেঘলা দুপুরে জানালার পাশে বসে থাকা এক বালকের মুখ। সে নিঃসঙ্গতা কাটাতে বসে থাকে জানালায়, অপেক্ষায় বসে থাকে জানালায়। অপেক্ষা করে ঘরের মানুষদের ফিরে আসার। সে জানালায় বসে দেখে বিদ্রোহের, প্রতিবাদের আগুনে পোড়া শহর, দেখে বৃষ্টি, দেখে বন্যায় ডুবে যাওয়া উঠান, দেখে পতাকা বদল, দেখে স্বাধীনতা।

আমার মনে আছে দেশ স্বাধীন হবার আগে এই বাড়ির জানালায় দাঁড়িয়ে দেখেছিলাম ফকিরেরপুল পানির ট্যাংক তৈরী হতে।আমাদের বাসা ছিলো নয়া পল্টন এলাকায়। বড় বড় ভবনের মাথা তখন আকাশ ঢাকতে পারেনি। জানালায় দাঁড়ালেই দেখতে পেতাম লোহার তৈরী বিশাল লোহার পিলার আকাশ ছুঁতে চাইছে। ওই জানালায় বসে ১৯৭৯-৭০ সালের পথে মানুষের অবিরাম মিছিল দেখেছি। দেখেছি আগুনের স্রোত হয়ে ভেসে যাওয়া মশাল মিছিল। গোটা দেশের মানুষ তখন ফেটে পড়েছে প্রতিবাদে। মঞ্চ জুড়ে চলছে স্বাধীন বাংলাদেশের মাথা তুলে দাঁড়াবার প্রস্তুতি পর্ব।বালক বয়সে রাজনীতির সেই উত্তাপ ভালো করে উপলব্ধি করতে না পারলেও একটা ভয়ঙ্কর কিছু যে ঘটতে চলেছে সেটা টের পেতাম। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ ভোরবেলা পাশের বাড়ির জানালায় এসে লেগেছিলো ট্যাংকের শেল। বিধ্বস্ত জানালার ছবিটা আজো চোখে ভেসে থাকে। সেই যুদ্ধের সময়ে কাঠের জানালাকেও ভীষন অনিরাপদ মনে হতো। তখন ঢাকা শহরে রাত্রি নামা মানেই আতঙ্ক। পাড়ায় পাড়ায ঘুরছে রাজাকারদের দল, গলির মাথায় এসে থামছে পাক বাহিনীর ট্রাক। তখন বাড়ির কাঠের জানালাগুলো বিকেলবেলাই মুখ থুবড়ে পড়ে থাকতো ঘরের অন্ধকারে। ভয় পেতাম এই বুঝি আমাদের একতলা বাড়ির জানালার বাইরে এসে কান পাতছে ঘাতকের দল। শুনে ফেলছে ঘরের ভেতরে রেডিওতে লো ভলিউমে চলতে থাকা স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের অনুষ্ঠান। ওই একবারই মনে হয়েছিলো জানালা বাড়ির জন্য বাহুল্য এক জায়গা।

যুদ্ধ গেলো, স্বাধীনতা এলো। জানালার জন্য আকূলতা গেলো না আমার। ওই জানালায় দাঁড়িয়ে বন্ধুদের সঙ্গে কত আড্ডার প্রহর ফুরিয়েছে চোখের নিমেষে। জানালায় দাঁড়িয়ে আড্ডা দেয়ার অদ্ভূত স্টাইল ছিলো আমাদের বন্ধুদের। আমি ঘরের ভেতরে, বাইরে কেউ দাঁড়ানো। কথা চলছে ঘন্টার পর ঘন্টা। আবার জানালা ছিলো গোপন সংকেত পাঠানোর জায়গাও। জানালার ওপাশ থেকে রাতে ভেসে আসতো শিস। বাইরে বের হওয়ার সংকেত। জানালায় বন্ধুরা রেখে যেতো চিরকূট। তখন বেশীরভাগ বাড়ির জানালার পুরোটাই ছিলো কাঠের। কারো কারো বাড়ির জানালায় থাকতো একটু কাঁচ। বেশীর ভাগ জানালার রঙ খয়েরি অথবা সবুজ। পুরনো শহরে বহু জানালায় দেখা যেতো খড়খড়ি নামে বস্তুটি। এই জানালার পাশেই কখনো দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যেতো সেই প্রিয় মুখ। যার জন্য অধীর অপেক্ষায় কাটতো সময় আরেক জানালায়।

মাঝে মাঝে ভাবি, হারিয়েই গেলো জানালার সেইসব দিন। কতদিন জানালায় বসে আকাশ দেখা হয় না এখন। কেউ হয়তো দেখে। আমার কাছে সে খবর এসে পৌঁছায় না। ভারী থাই অ্যালুমিনিয়ামের জানালা বন্ধ হয়ে থাকে দিনের পর দিন। সকালবেলা জানালা খোলার রীতিটাও কখন যেন জীবন থেকে বিদায় নিলো। জানালার চৌকাঠের বৃষ্টিভেজা ঘ্রাণ নাক টেনে আর কোথাও পাওয়া যায় না। জানালার কপাট বন্ধ হলো আমাদের।

ছবিঃ গুগল