সত্যজিতের সীমাবদ্ধ নিয়ে

সীমাবদ্ধ সিনেমাটি সত্যজিৎ রায় নির্মাণ করেছিলেন ১৯৭১ সালে। তাঁর পরিচালিত রাজনৈতিক ট্রিলজির প্রথম খন্ড বলা যেতে পারে সীমাবদ্ধকে। এর আগে ১৯৭০ সালে নির্মিত হয়েছিলো ‘প্রতিদ্বন্দ্বী’, ও ‘জন-অরণ্য’ ১৯৭৫ সালে। সীমাবদ্ধ ছবিতে নায়কের ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন বরুন চন্দ। কলকাতার সিনেমার এই চরিত্রাভিনেতা তখন ছিলেন প্রায় নবাগতই। এমনি আরেক নবাগত অভিনেতা সেই ছবিতে অভিনয় করেছিলেন। তিনি দীপংকর দে। পত্রিকার কাছে তারই জবানীতে শোনা যাক ওই সিনেমায় তার প্রথম অভিনয়ের অভিজ্ঞতার কথা। দীপংকর দে তখন নানা ধরণের ছুটকো ব্যবসার ধান্দায় ব্যস্ত।ওই সময় পত্রিকার খবরে জানা গেলো সত্যজিৎ রায় প্রখ্যাত কথাশিল্পী শংকর রচিত সীমাবদ্ধ উপন্যাসটি চিত্রায়িত করবেন। বন্ধুদের উৎসাহে দীপংকর একদিন গাইড খুঁজে সত্যজিতের বিশপ লেফ্রয় রোডের ঠিকানা বের করে ফোন করে বসলেন। ফোনটা ধরেছিলেন স্বয়ং সত্যজিৎ রায়।

সীমাবদ্ধ ছবির একটি দৃশ্য

গম্ভীর কন্ঠে জানিয়ে দিয়েছিলেন সিনেমার কাস্টিং হয়ে গেছে। কিন্তু কোনো এক অজ্ঞাত কারণে পরদিন সকাল দশটায় দীপংকরকে যেতে বলেছিলেন তাঁর বাসায়। দীপংকর দে‘র ভাষায়, ‘সাহেবি আমলের কাঠের চওড়া সিঁড়িওয়ালা বাড়ি। এমনিতেই নিজের হৃৎস্পন্দন শুনতে পাচ্ছি। তার ওপর কাঠের সিঁড়ি বেয়ে উঠতে গিয়ে দ্বিগুণ শব্দময় মনে হচ্ছে।দোতলায় সবে উঠেছি, দেখি দীর্ঘদেহী মানুষটি এক ভদ্রলোক ও এক ভদ্রমহিলার সঙ্গে কথা বলছেন। পরনে ঢোলা পাজামা-পাঞ্জাবি। বেশ কঠিন স্বরে ‘ইংরেজি বলতে পারেন?’ বলে তাঁদের বিদায় করলেন। আমি ত্রস্তপদে আবার নীচে পালিয়ে গেলাম। আমার ভাগ্যের লিখন কি একই হবে? কিছু ক্ষণ পরে, সাহস সঞ্চয় করে দরজায় কলিং বেল বাজালাম। নিজেই দরজা খুললেন। ‘লোকে এত বিরক্ত করে! আসুন’, এই বলে অভ্যর্থনা জানালেন, যেন আমি কত দিনের চেনা! ‘আপনাকে তো বলেছি সব চরিত্র নির্বাচন হয়ে গিয়েছে। খুব শিগগির শুটিং শুরু হবে।’ উভয়পক্ষ কিছু ক্ষণ নীরব। মনে হল আমাকে জরিপ করছেন। বিজ্ঞাপন জগৎ সম্বন্ধে নানা প্রশ্ন করতে লাগলেন। ছবি-সংক্রান্ত একটি শব্দও ব্যয় করলেন না।
‘চা খাবেন?’

সীমাবদ্ধ ছবির আরকটি দৃশ্য

মন বলল, হলেও হতে পারে। দু’পেয়ালা চা এল। সবে চুমুক দিয়েছি, হঠাৎই বললেন, ‘একটা ছোট চরিত্র আছে। চলবে?’ শব্দগুলো দৈববাণীর মতো কানে প্রবেশ করল। নির্বাচিত হলাম। ’
স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে দীপংকর জানালেন ওই ছবিতে ছোট চরিত্রে অভিনয়ের জন্য পারিশ্রমিক পেয়েছিলেন ৭৫ টাকা।
সাক্ষাৎকারে দীপংকর দে বলেন, ‘এক রবিবার ইউনিয়ন কার্বাইড অফিসে শুটিংয়ের ডাক পড়ল। মেক-আপ ম্যান আমার মুখে কোনও রং মাখালেন না, শুধু পাউডার পাফ করে ছেড়ে দিলেন। মনঃক্ষুণ্ণ হলাম। শুনেছিলাম চিত্রতারকাদের মুখে লাল-হলুদ কত না রং মাখানো হয়! তার পর দেখি নায়ক বরুণ চন্দ থেকে শুরু করে কোনো শিল্পীকেই মেক-আপ করা হয়নি। বুঝলাম এটাই ‘ফিল্ম রিয়েলিটি’।
একটা লম্বা রেলগাড়ির মতো লাইন। তার ওপর মোটা তক্তায় চাপানো হয়েছে বিশাল ক্যামেরা। কালো কাপড়ে মাথা ঢাকলেন পরিচালক। গম্ভীর গলায় নির্দেশ দিলেন ‘সোজা হেঁটে এই ডান দিকের ঘরে ঢুকে যাবে।’ তাই করলাম। কাট। জীবনের প্রথম শট দিলাম। ‘ভাল হয়েছে।’ ঘাম দিয়ে যেন জ্বর ছাড়ল।
এর পর নায়কের অফিস চেম্বারে শট। ক্যামেরার সামনে আমি, আর আমার পিছনে একটি ‘উষা’ কোম্পানির পাখা। ছবিতে পাখাটির প্রয়োজন আছে। কিন্তু পাখার নাম তো হবে ‘ব্রিজ’ (Breeze) অর্থাৎ, বাতাস। সত্যজিৎ রায় সেই সময় রথম্যান সিগারেট খেতেন। প্যাকেট থেকে রুপোলি তবকটা ছিঁড়ে ‘উষা’ লেখাটিকে মুড়ে ফেললেন। তার পর একটা দেশলাই কাঠির মাথা দিয়ে তার ওপর ‘ব্রিজ’ লোগো এম্বস করলেন। এক হাত দূর থেকে মনে হচ্ছিল, সত্যি সত্যিই এটা আসল খোদাই। এই যে খুঁটিনাটির প্রতি নজর দেখে বিষ্মিত হয়েছিলাম।’
সীমাবদ্ধ নিয়ে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে দীপংকর দে সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গে তার আরো কিছু স্মৃতির পৃষ্ঠা উল্টে গেলেন। ‘আর এক দিনের কথা মনে পড়ে। মানিকদার বউমা বুনি, সন্দীপ রায়ের স্ত্রী তখন অন্তঃসত্ত্বা। নার্সিং হোমে ভর্তি হয়েছে। মানিকদা শুনেছিলেন, আমি অল্পবিস্তর জ্যোতিষচর্চা করি। দু-চার দিনের মধ্যেই ‘আগন্তুক’ ছবির শুটিং শুরু হবে। তাঁর কাছে কিছু নির্দেশ নিতে গিয়েছি। ঠাট্টা করে প্রশ্ন করলেন, ‘কী বলে তোমার জ্যোতিষ? বুনির ছেলে হবে না মেয়ে?’ বলে ফেললাম, ‘মেয়ে।’ এ বার গড়ের মাঠে ‘আগন্তুক’ ছবির প্রথম দিনের শুটিং। উৎপলদা কয়েকটি কিশোরকে বিজ্ঞান শেখাচ্ছেন মাঠে বসে। দূরে ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল দেখা যাচ্ছে। আমিও শুটিং দেখতে গিয়েছি। প্রণাম করতেই বলে উঠলেন, ‘এক চড় দেব। বুনির আজই ছেলে হয়েছে।’ ঘাবড়ে গেলাম। কাঁধে হাত রেখে ভয়মুক্ত করলেন। হাসতে হাসতে বললেন, ‘ছেলে হয়েছে বুনির।’ রায় পরিবারের শিক্ষা, ঐতিহ্য, ঘরানা ওই মুহূর্তটুকুতে তাঁর চোখেমুখে যেন উদ্ভাসিত হয়ে উঠেছিল।’

বিনোদন ডেস্ক
তথ্যসূত্র ও ছবিঃ আনন্দবাজার পত্রিকা