নানারঙে সেজে উঠছে নিউইয়র্ক

স্মৃতি সাহা

জেগে থাকা নিউইয়র্ক শহর। কবি লোরকার ভাষায় স্লিপলেস সিটি। সেই শহরে স্বপ্নও যেন নির্ঘুম। এই শহরের দিনরাত্রির রোজনামচা স্মৃতি সাহার কলমে প্রাণের বাংলায় নিউইয়র্ক থেকে ধারাবাহিক ভাবে।

হিমের গন্ধ আর সবুজ দূর্বাদলে হীরক দ্যুতির শিশির বিন্দু নিয়ে এখানে শীতের সকাল আসে না। আর দিবাকরের শুদ্ধ স্পর্শও মাটি পায় না এখানে শীতের সকালগুলোতে। ডিসেম্বরের দিনগুলো এখানে খুব ধূসর। সারাদিন মেঘের চাদর জড়িয়ে সূর্য লুকোচুরি খেলে। আর মেঘের চাদর খুব যত্ন করে ছাইরঙা তুলির আঁচর বুলিয়ে চলে প্রকৃতিতে, মনে। আচ্ছা মন কি আকাশের প্রতিবিম্ব? মন খারাপ করা আকাশ যখন নিজেকে মুড়িয়ে নেয় ধুসর চাদরে বা কনকচূড়া ফুলের রং চুরি করে খিলখিলিয়ে হেসে ওঠে তখন তার ছায়া মনে একই ছবি এঁকে যায় অবিরামভাবে। থাক, মনের গল্প না হয় আরেকদিন হবে। এবার বরং বলি ধুসর রঙা শীতের এই শহর কিভাবে আস্তে আস্তে রঙিন হয়ে উঠছে।

নানারঙে সেজে উঠছে নিউইয়র্ক। উৎসবের বারতা নিয়ে ক্রিসমাস একদম দোরগোড়ায়। বাতাসে ক্রিসমাসের গন্ধ। এফ.এম গুলোতে, শপিং মলে অনবরত বেজে চলেছে ক্রিসমাস সং। কনকনে উদীচী(উত্তরে) হাওয়ার মাঝেও পথ চলতি চারপাশের মানুষ গুলোর চোখমুখে এক পশলা প্রদীপ্ত উচ্ছ্বলতা খুব স্পষ্ট। এরই মধ্যে চারপাশে শুভ্রাংশু ছড়িয়ে শুরু হয়ে গেছে তুষারপাত। নিঃশব্দে আকাশের অর্গল খুলে ঝরে পড়ছে যেন শ্বেতকাঞ্চন। যখন এই তুষারপতন হয় তখন চারপাশটা এক অদ্ভুত সাদা আলোয় উদ্ভাসিত হয়। মনে হয় যেন কোন ইচ্ছাময়ী তাঁর ইচ্ছাতেই প্রিয় ধরণীকে অনবরত শুচি করে চলেছে শ্বেতশুভ্র আশীর্বাদ দিয়ে। এবার নিউইয়র্কে বেশ তাড়াতাড়িই শুরু হলো তুষারপতন। আর তা দেখে অনেকেই এবার হোয়াইট ক্রিসমাসের আশা পোষণ করছে। এখানকার আদি বাসিন্দাদের মধ্যে এই হোয়াইট ক্রিসমাস নিয়ে এক ধরণের শুভ বিশ্বাস কাজ করে। তাদের মতে ক্রিসমাসের দিন যদি তুষারপাত হয় তবে তা ঈশ্বরের শুভ ঈঙ্গিত। আসলে সরল এই বিশ্বাসগুলোই আমাদেরকে সব সময় জীবনকে উপভোগের মন্ত্র শিখিয়ে যায়। ক্রিসমাসের মূল আকর্ষণ হলো ক্রিসমাস ট্রি। আর ক্রিসমাস ট্রি হিসেবে ব্যবহার করা হয় চিরহরিৎ পাইন গাছ। শীতের এই সময়ে যখন চারপাশে সব হারিয়ে একলা হয়ে যাওয়া বৃক্ষরাজি যখন বুকের মধ্যে বেহাগ বাজিয়ে চলে সেখানে এই পাইন গাছ সবুজের জয়গান গেয়ে জীবনের কলতান জানান দেয়। আর এজন্যই শীতপ্রধান দেশগুলোতে মূলত পাইন গাছকে ব্যবহার করে থাকে ক্রিসমাস ট্রি হিসেবে। তবে এখানে কিছু ধর্মীয় ব্যাখ্যাও আছে এই গাছ ব্যবহারের ক্ষেত্রে। নিউইর্য়কের সবচেয়ে বড় ক্রিসমাস ট্রি করা হয় রকফেলার সেন্টার, ম্যানহাটন। ১৯৩১ সাল থেকে হয়ে আসা এই ক্রিসমাস ট্রি এখন নিউইর্য়কের অন্যতম ঐতিহ্য। আর এই ক্রিসমাস ট্রি’র চোখ ধাঁধানো ডেকোরেশন এর অন্যতম আকর্ষণ। ক্রিসমাসের প্রায় একমাস আগে এই ক্রিসমাস ট্রি বসানো হয়, তখন থেকেই নিউইর্য়কবাসী আর পর্যটকদের মূল আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু এই ক্রিসমাস ট্রি। যেকোনো উৎসবের বিশুদ্ধ আর নির্মল আনন্দ বাঙ্গালী মননে নাড়া দেবে এটা খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার।

আর কিছুদিন পর থেকেই স্কুল, কলেজ, অফিসগুলোতে শুরু হয়ে যাবে ক্রিসমাস হলিডে। উৎসবের উত্তাপ পুরোটা অনুভব করতে আমরাও বেড়িয়ে পরি। নিরিবিলি রাস্তার দু’পাশের বাড়িগুলো বর্ণিল সাজে যেন উৎসবের বার্তায় মূর্ত হয়ে ওঠে এসময়। শপিং মলে থাকে অতিরিক্ত সেলের অফার। সান্তা তার স্যাক ভর্তি প্রেজেন্টস এনে সবাইকে যেন খুশী করতে পারে, এ তারই কারণ। সান্তা তার রেইনডিয়ারদের নিয়ে আমাদের সকলের দোরগোড়ায় একমুঠো আনন্দ আর শান্তিসহ আবির্ভূত হোক!!

ছবিঃ লেখক