আনন্দধারা বহিছে ভুবনে

আন্জুমান রোজী,(কানাডা থেকে)

সকল ধর্মের উৎসব আনন্দের অনুভূতি প্রায় এক। স্থান-কাল-পাত্রভেদে  মূলত মানুষের মৌলিক অনুভূতির মধ্যে বিশেষ  কোনো পার্থক্য নেই। সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না, কষ্ট; আবেগ অনুভূতি সব একইরকম। শুধুমাত্র প্রকাশভঙ্গি বা ধরণাটা ভিন্ন। সেই-অর্থে সব ধর্মীয় উৎসবের ধরণ যেমনই হোক না কেন; আনন্দটা ছুঁয়ে যায় সবাইকে। অন্তত আমি সেই আনন্দে উদ্বেলিত হই সঙ্গত কারণেই। তাছাড়া, আনন্দ একটি স্পর্শকাতর অনুভব। যা পরিবেশকে আচ্ছন্ন করে রাখে, আনন্দধারায় মানুষও হয় আবেগাপ্লুত। হিন্দুদের দুর্গোৎসব, বৌদ্ধদের বৌদ্ধ পূর্ণিমা, মুসলমানদের ঈদ উৎসব , খ্রিস্টানদের ক্রিসমাস উৎসব-সমূহের আনন্দে- সকল  মানুষ একাকার হয়ে যায়।  কানাডাতে এমন দৃশ্যই দেখা যায়। ধর্মীয় উৎসব বলে কোনো কথা থাকে না এখানে। ধর্মীয় সীমারেখা পেরিয়ে- যেকোনো ধর্মের উৎসব হয়ে যায়- মানুষের উৎসব।

মানুষ সৃষ্টির প্রকৃতি একই রকম, একই ধারায় সব মানুষের জন্ম; অথচ মানুষে মানুষে কত বিভেদ! কত মতের অমিল! শুধুমাত্র ভিন্ন মতবাদের কারণেই কি এতো জটিলতা?  সব মতবাদের উদ্দেশ্য যদি হয় মানবতা বা মানুষের সেবা; তাহলে  এতো হানাহানি কেন? সব ধর্মেই তো বলে- মানুষের উপকার করতে, সৎপথে চলতে, মিথ্যা না বলতে, গরিব দুঃখীর পাশে দাঁড়াতে ; তাহলে পার্থক্যটা কোথায়? উদ্দেশ্য যদি এক হয়ে থাকে ; তাহলে তো সমস্যা হওয়ার কথা নয়! যে যেভাবে ধর্মীয় বেড়াজালে জড়িয়ে জীবনধারণ করুক না কেন; দিনশেষে সব কাজের ফল একই রকম! এসব খুবই সহজ হিসাব, খুব সহজ ব্যাপার। কিন্তু বাস্তবতা তার উল্টো।

সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো- প্রত্যেক ধর্মের মানুষ নিজ ধর্মকে সেরা ধর্ম মনে করে অন্য ধর্মের প্রতি বিদ্বেষভাব পোষণ করে। যার ফলে- এক ধর্মের মানুষ আরেক ধর্মের মানুষকে হেয় করতে একটুও দ্বিধাগ্রস্ত হয় না।  সব ধর্মের মধ্যে এই মানসিকতা বিদ্যমান। ইদানীং  একটা বিষয় খুব লক্ষ্য করছি; ধর্মীয় গোঁড়ামিটা অনেকের মধ্যে বেশ জোরালোভাবে কাজ করছে। বিশেষ করে মুসলমান সম্প্রদায়ের মধ্যে খুববেশি- বাড়াবাড়ি পর্যায়ে চলছে। এবা্রের টরন্টোর ক্রিসমাস উৎসব নিয়ে অনেকের মধ্যে  নাকসিঁটকানো ব্যবহার দেখছি। এমনটা আগে কখনও চোখে পড়েনি। সরাসরি বলে বসবে; “ক্রিসমাস আমাদের জন্য নয়; ওটা খ্রিস্টানদের জন্য । ওখানে গেলে পাপ হবে।” পাপ-পুণ্যের বিষয়টা যেন মানুষ তার নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে ফেলেছে। বিচার করার মালিকের উপরেও মালিক হয়ে বসে আছে এই পৃথিবীর মানুষ। আমি যখন সঙ্গে সঙ্গে সেই মানুষটিকে জিজ্ঞেস করলাম- ‘পাপ কেমন করে হয়;  আমাকে একটু বুঝিয়ে বলবে?’ তাছাড়া তুমি যদি অন্যধর্মের মানুষের সঙ্গে মেলামেশা নাই করো; তাহলে তুমি কীভাবে প্রমাণ করবে-  তুমি উত্তম ধর্মের অধিকারী!”  তখন সে বলে, ‘ আমাদের ধর্মেই নিষেধ আছে পর-ধর্মের সংশ্রবে না থাকতে।” আমি আবার প্রশ্ন রাখলাম, “তাহলে তুমি বিধর্মীর দেশে আছো কেন? আছে তো আছো- সেইসঙ্গে এই দেশের সবরকম সুযোগ-সুবিধা নিয়ে জীবন চালাচ্ছো। এদের সবকিছু খাচ্ছো, ব্যবহার করছো; তখন তোমার পাপ হয় না?” তখন সে থতমত খেয়ে চুপসে গেলো। তারপর আমি ধীরধীরে বললাম, “ক্রিসমাস একটি উৎসবের নাম। এটা যতটা না ধর্মীয়- তারচেয়ে ঢের বেশি সাংস্কৃতিক। এই উৎসব সবার। তুমি একটা বিষয় লক্ষ্য করেছো, সবাই কেমন আনন্দে মাতোয়ারা! যে আনন্দ উৎসবে সৌহার্দ, ভ্রাতৃত্ব আর সাম্যের কথা বলে- সেই আনন্দে কোনো পাপ নেই। । এখানে ধর্মীয় দৃষ্টিতে না দেখে; দেখ সার্বজনীন দৃষ্টিতে। দেখবে-  সব ধর্মীয় উৎসবই পবিত্র।”

কানাডা এমন একটি দেশ; যেদেশ ও দেশের মানুষ- সব ধর্মকে সমান মূল্যায়ন করার মানসিকতা রাখে। সবধর্মের কৃষ্টি-সংস্কৃতিকে ব্লেন্ড করে এখানে মানুষের জন্য এক আনন্দযজ্ঞ গড়ে উঠেছে। সেই আন্দযজ্ঞের সবচেয়ে  বড় উৎসব; অর্থাৎ  ক্রিসমাসের আয়োজন চলছে। ক্রিসমাসের পরেই শুরু হয়ে যায় নতুন বছর বরণ করার আড়ম্বরপূর্ণ প্রস্তুতি। এখন কানাডাতে ক্রিসমাসের সাজসাজ রব। আনন্দের ফোয়ারা বইছে চারদিকে। প্রতিটি  শপিংমল লোকে লোকারণ্য। খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব বড়দিন উপলক্ষে শুরু হয়েছে  মাসজুড়ে নানা আনুষ্ঠানিকতা। ক্রিসমাস ট্রি লাইটিং-এর মধ্যদিয়ে ক্রিসমাস উৎসবের সূচনা হয়। পুরো ডিসেম্বর মাসজুড়ে  বাড়ি-ঘর, রাস্তা-ঘাট, আফিস-আদালত, বিপণীবিতান থেকে শুরু করে প্রায় সর্বত্রই ক্রিসমাস ডেকরেশনে সাজানো হয়। বিভিন্ন কোম্পানিগুলো প্রতিদিনই কোনো না কোনো ক্রিসমাস পার্টির আয়োজন করে থাকে।

স্কুলগুলোতে চলে ক্রিসমাসের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। অ্যাপার্টমেন্ট বিল্ডিংগুলোতে চলে ক্রিসমাস লাঞ্চ বা ডিনার পার্টি। উপহার আদান-প্রদানের হিড়িক পড়ে যায়।  এমন আয়োজনে সবধরনের মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা এবং অংশগ্রহণকারী সকলকে গুরুত্বসহকারে দেখার প্রবণতা বেশ প্রকট। মোটকথা আনন্দ ভাগাভাগি করে নেওয়ার মানসিকতা ফুটে ওঠে বেশি। শুধুমাত্র ক্রিসমাস সন্ধ্যা আর ক্রিসমাস দিনে ধর্মীয় উপাসনা ও আচার-অনুষ্ঠানের মাধ্যমে ঘরোয়া পরিবেশে পরিবা্রের সদস্যদের নিয়ে ক্রিসমাসের বিশেষ দিনটি উদযাপন করা হয়। তাছাড়া ডিসেম্বরের অন্যান্য সবদিন-  সবার জন্য উন্মুক্ত।

রবীন্দ্রনাথের ভাষায় বলতে হয়- “আনন্দধারা বহিছে ভুবনে।” এমন এক পরিবেশে- আমি নিজেকে অন্য ধ্যান-ধারণার , অন্যজগতের মানুষ ভাবি কেমন করে? মানুষমাত্রই চায় স্বস্তি, চায় আনন্দ, চায় মানুষের ভালোবাসা। এসব মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি। আর সেই প্রবৃত্তিগুলো ডালপালা মেলে আনন্দ করার সুযোগ পায়; এমন সব উৎসবের উদযাপনের কারণেই। তাই বলা যায়, ধর্ম যারযার, আনন্দ সবার। এই আনন্দ অবগাহনের   সকলের সুখী সমৃদ্ধ জীবন ও সময় বয়ে নিয়ে আসুক সেই কামনা করি প্রাণান্তকর।

ছবি: লেখক