শুভ জন্মবার্ষিকী সঞ্জীব চৌধুরী

মোর্জিনা মতিন কবিতা

‘নমস্কার, দাদা।’
সেলফোনে বলি আমি।
ও পাশ থেকে ছোটখাটো গড়নের, ছিপছিপে শরীরের, ভরাট-তীক্ষ্ণ গলার অধিকারী তিনি ফিরতি জবাব দেন- ‘নমস্কার। কে?’
‘কবিতা, দাদা।’
‘মোর্জিনা মতিন কবিতা! সর্বনাশ! কী খবর আপনার?’
‘দাদা, লাভ রোডে এসেছিলাম, ভাবলাম আপনার সাথে দেখা করে যাই।’
‘সর্বনাশ! আসুন। তিন তলায় উঠে আসুন।’

প্রশস্ত সিঁড়ি সংলগ্ন সবগুলো দেয়ালে নানান সব চিত্রকর্ম। দেশের সবচাইতে নান্দনিক পত্রিকা অফিস। ছাপাখানাটাও স্বচ্ছ কাঁচের দেয়ালে ঘেরা, যাতে পথচারীরা বাইরে থেকে দেখতে পান, কী করে সংবাদপত্র ছাপা হয়! এই পত্রিকা অফিসে লিখিত-মৌখিক পরীক্ষার মাধ্যমে সাংবাদিক নিয়োগ দেয়া হয়। একবার অন্য এক দৈনিক পত্রিকায় চাকরিরত অবস্থায় পরীক্ষা দিতে এসেছিলাম। ধর্ম, রাজনীতি, বিজ্ঞান, সাহিত্য, দর্শন, খেলাধূলা, সংস্কৃতি- সব বিষয়ের প্রশ্ন এসেছিল। আসবেই তো, আপনি সাংবাদিক হবেন, আর দুনিয়ার তাবৎ বিষয় আপনার নখদর্পনে মানে নখের আয়নায় থাকবে না, তা হবে না। এইজন্য বলা হয়, দুনিয়ায় সবচাইতে ফাস্ট জব হল সাংবাদিকতা। মনে আছে, একটা প্রশ্ন ছিল এ রকম- সাইফ আলী খানের মায়ের নাম কী? লিখেছিলাম- শর্মিলা ঠাকুর। লিখলে হবে কী, প্রতিযোগিতায় টিকতে পারি নাই।

আমি আর অপ্রতিম উঠে আসি তিন তলায়। ‘সঞ্জীব চৌধুরী, ফিচার এডিটর, দৈনিক যায় যায় দিন’ তামাটে প্লেটে দারুচিনি হরফে খোদাই করা রুমের দরজার নব ঘুরিয়ে প্রবেশ করি।
‘বসুন’ বলে দাদা অপ্রতিমের দিকে চাইলেন এক নজর। বললেন, ‘এত বড় ছেলের মা হলেন কবে! আমার কিংবদন্তীও বড় হয়ে যাচ্ছে। কী মুশকিল!’
‘জি, দাদা। কিমির দুই ছেলে, দোলার দুই মেয়ে, দর্জির দুই মেয়ে, পলি গোড়ানের এক ছেলে…’
‘আরিফ জেবতিকের সঙ্গে যোগাযোগ আছে?’
‘হি হি। আপনিও সবার মতো আরিফ ভাইয়ের কথাই আগে জিজ্ঞেস করলেন। জানেন, ভোরের কাগজের যার সঙ্গেই দেখা হয়, সে-ই আগে আরিফ ভাইয়ের কথা জানতে চায়। একদিন ফার্মেসীতে হাসান বিপুলের সঙ্গে দেখা, একদিন আড়ং এ রুমির সঙ্গে দেখা, একদিন সমকালে প্রতীক ইজাজের সঙ্গে দেখা- সবাই জিজ্ঞেস করে, আরিফ ভাইয়ের সঙ্গে যোগাযোগ আছে কী না। আচ্ছা, দাদা- আমাকে দেখলে সবার কেন আরিফ জেবতিকের কথা মনে আসে!’
‘হা হা হা। আরিফ আপনার লেখা না ছেপে পারত না। আপনি অবশ্যই ভালো লিখতেন। লেখা জমা দিতে এসে আপনি আরিফকেই খুঁজতেন। বাচ্চা ছিলেন তো, বাচ্চাবেলায় অমনটা হতেই পারে। চা না কফি খাবেন? অপ্রতিম কী খাবে?’
‘আমরা কিছুই খাব না, দাদা। আপনি ব্যস্ত মানুষ… দাদা আপনার তো আগামীকাল জন্মদিন’ বলে আমি আমার ব্যাগের চেইন খুলি। দাদা আমাদের সবার সেই চেনা চেহারায়- ভ্রু কুঁচকে, গালে টোল ফেলে, গোঁফঅলা ঠোঁটে মুচকি হাসেন।
‘দাদা, এই প্যাকেটে পাঠক ফোরামের প্রথম সংখ্যাটা আছে, আপনার হাতে গড়া। আর, আমি ইউটিউব দেখে, কাগজ কেটে কয়েকটা আমার প্রিয় জারবারা ফুল বানিয়েছি, কিংবদন্তীকে দেবেন। আর, একটা ফুলদানী আর কয়েকটা সত্যিকার জারবারা ফুল, আপনার ডেস্কে রাখবেন।’

মেয়ের সঙ্গে

‘সর্বনাশ, এত কষ্ট কেন করলেন!’
‘কিছুই করি নাই, দাদা।’

পিয়ন দরজা খুলে আসে, ট্রেতে করে দুটো কফির মগ, একটা চিপ্সের প্যাকেট নিয়ে।

এমনটা আজ ঘটতে পারত।
আজ রাতে হাতের কাজ শেষ করে আমি এই নিয়ে একটা স্টেটাস লিখতে পারতাম।
যদি সঞ্জীব দা বেঁচে থাকতেন।
আজ দাদার উদ্দেশে ‘শুভ জন্মবার্ষিকী’ নয়, বলতে পারতাম ‘শুভ জন্মদিন।’

তাই বেদনার্ত হৃদয়ে বলি-শুভ জন্মবার্ষিকী, সঞ্জীব চৌধুরী।

শুভ বড় দিন, সমগ্র বিশ্ব।

ছবি: গুগল