রাত ঘুমে আমি কোনও স্বপ্ন দেখি না…

তিয়াষ মুখোপাধ্যায়

(কলকাতা থেকে): খবরের কাগজে কাজ করার ভাল আর খারাপ সব দিকই রয়েছে, ঠিক যেমন যে কোনও কাজেরই থাকে…।
তবে সব রকম খারাপ দু’হাতে কুড়িয়ে নিয়ে বস্তাবন্দি করে চেপেচুপে রেখে দিতে পারলেও যে খারাপটা সব সময় ফলার মতো খাড়া হয়ে থাকে আর প্রতিনিয়ত ক্ষতবিক্ষত করে, তা হল নিরাসক্ত থাকার ব্যর্থ অভ্যেস…।

এখন, অন্তত গত এক বছর ধরে তো বটেই, এমন একটা দিন যায় না, যে দিন খবরের কাগজের রাশি রাশি পাতার কোনও না কোনও প্রান্তে অন্তত একটা খবর থাকে না বধূহত্যার…।
নাহ্, বধূমৃত্যু নয়, ইচ্ছে করেই হত্যা বললাম…।
হয় ঝুলে, নয় পুড়ে— এই দু’টোই বেশি ঘটে…। বলাই বাহুল্য, আসলে ঝুলিয়ে বা পুড়িয়ে…। ঝোলার ধরনে, পোড়ার বীভৎসতায় এবং মৃত্যুর পরে কত দিন ধরে ফলো আপের সম্ভাবনা রয়েছে— এ সব মাপকাঠি দিয়ে বিচার হয়, খবরটা পাতার মাথায় বড় করে ছাপা হবে নাকি সংক্ষিপ্ত খবরের তালিকায় কয়েক লাইনে ছাপা হবে…।

সে যা-ই হোক না কেন, কিছু এসে যায় না…। এসে তো যায় সেই মা-বাবাদের, যাঁরা দু’দিন আগেই শখ-আহ্লাদ করে মেয়ের বিয়ে দিয়েছিলেন ঘর-বর দেখে…। অথবা সাধ্যমতো যাচাই করে নিয়েছিলেন মেয়ের পছন্দ করা ছেলে, তার পরিবার— সবটুকুই…। শেষ রক্ষা হয় না এ সবে…।
আদরের মেয়ের সঙ্গে বাবা-মার দেখা হয় লাশকাটা ঘরে…।
ময়না-তদন্তের প্রাথমিক রিপোর্ট বলে, ‘‘তরুণীর দেহে একাধিক আঘাতের চিহ্ন মিলেছে’’। অথবা বলে, ‘‘আত্মহত্যাই করেছেন তরুণী’’…।

আচ্ছা, আত্মহত্যা বলে কি সত্যিই কিছু হয়…?
নিজেকে কি নিজে এমনি এমনিই মেরে ফেলা যায়…? প্রতিদিনের কষ্ট, যন্ত্রণা, অপমান, লাঞ্ছনা— এগুলো কি বড় বড় ঘাতক অস্ত্রের চেয়ে কোনও অংশে কম…? শুধু ছুরিতে কোপালেই কি চামড়া দিয়ে রক্ত পড়ে…? শুধু আগুন দিয়েই কি ছাই করে দেওয়া যায় অস্তিত্ব…? নাকি শুধু দড়ি দিয়েই শ্বাসরোধ করা যায় বেঁচে থাকার…?

অপরাধীদের শাস্তি হয়, অথবা হয় না…। ফুটফুটে মেয়েগুলো আর ফেরে না…।

আমার এত কিছু ভাবা কাজ নয়…। আমি তো সাংবাদিক…। আমি আট কলামের ব্রডশিটে মৃত্যুর পাশে মৃত্যু সাজাতে পারি শব্দ দিয়ে…। আমি নিস্পৃহ থেকে নিস্পৃহতর হতে পারি, এক একটা মৃত্যুতে…। আমি অভ্যেস করতে পারি, কী করে নিরাসক্ত ভাবে ‘স্টোরি’টুকু আলাদা করে রাখতে হয়, বিচ্ছিন্ন করে রাখতে হয় জীবন থেকে…।
কিছু কিছু ক্ষেত্রে, বিচ্ছিন্নতা আসলে আশীর্বাদ…।

সকলে এই আশীর্বাদে ধন্য হওয়ার সুযোগ পায় না…।

তাই এখনও এত অক্ষর, এত রং-তুলি, এত আলো এসে ধাক্কা মারে শরীরে…।
এখনও নিজের নিজের ভাষায় চিৎকার করে চলেন প্রতিটি শিল্পী…।
নিজের চোখের নুন-জলে এঁকে চলেন যন্ত্রণার জলছবি…।

টেক আ বাও, Sudeshna Ritu Sarkar…।
একটা ছবিতে এত কথা বলা যায়, এত এত এত সত্যি কথা একসঙ্গে বলা যায়…!
টেক আ বিগ বাও ইনডিড…।

ছবি: গুগল