প্রয়াত কবি শিমুল মোহাম্মদ এর ৫ টি কবিতা

আশির দশকের কবি শিমুল মোহাম্মদ। দ্রোহ আর প্রেম তাঁর কবিতায় পাশাপাশি হাত ধরে হাঁটছে। স্বৈরাচারী শাসনের বুটের তলায় এক রুদ্ধশ্বাস সময়ে কবিতা লিখতে শুরু করেন শিমুল। প্রকাশিত যৌথ কাব্যগ্রন্থ প্রতিবিম্ব ভেঙ্গে যাই ও একক গ্রন্থ স্বপ্নবিদ্ধ বিনতার চোখ। শিমুল মোহাম্মদ ২০০৭ সালের ২০ অক্টোবর মারা যান। কবির জন্মদিন ছিলো গত সপ্তাহে। সে উপলক্ষ্যে প্রাণের বাংলার পাতায় শিমুলের পাঁচটি কবিতা। 

 

 

আমিও মৃত্যুতে একদিন

(অগ্রজ কবি আবুল হাসান : যারা মৃত্যুর পরও বেঁচে থাকে)

বন্ধুর ভূমিতল পল্লবে ঘেরা
শাল পিয়াল জারুল কিংবাা দেবদারু
মমতায় ছড়িয়ে রাখে প্রকৃতি দেহ
আকাশ ছুঁয়েছে মেঘ বহু দূর সবুজ সীমায়!

আমরা দুজন তরুণ
এক্স এল মটরযানে ছুটে যাচ্ছি
ভূমি থেকে অনেক উঁচুতে আমাদের পথ।

বাতাসে দীর্ঘশ্বাসে কণ্ঠদেশ জুড়ে থাকে সঙ্গীতের বিস্তৃৃতি
দূরে কোথাও উচ্চগ্রামে হাঁক দেয় রাত পাওয়া পাখি
একটা মায়াবী ডাক…কে যায়?
দ্রুতিময় পেছনে ফেরা আমাদের চারটা চোখ
ছন্দময় এক-একটি সুবজাভ বৃক্ষ দূরে সরে যায়।
কী নির্ভীক এই এগিয়ে যাওয়া। আমরা চলিষ্ণু।

অনতিদূরে পোড়ে বৃক্ষের ঝরাপাতা
শুদ্ধতা দহনে কর্পূর পোড়ে, সৌরভে টের পাই পোড়ে
কারো কপাল, বুঝি কোথাও কিছু একটা পোড়ে
মনের আগুনে পোড়ে চোখ, বুঝতে পারি কিছু একটা নেই!

একদিন আমিও থাকবো না, জানি যেমনি রাত্রিতে থাকে না রোদ
একে একে জেনে যাবে সব্বাই আমি নেই।
আমার মৃত্যুতে কালো শোক হবে না নিশ্চয়।
কারো কারো কাছে উচ্চারিত হবে স্মৃতি
পড়ে থাকবে ফেলে আসা একলা প্রবোধ।

আমিও মৃত্যুতে একদিন একাকার হয়ে যাবো।

ছায়ার কাছেও একা

চেতনায় চেনা মুখ
উদিত হয় না আর
নদী ও নারীরা আজ
ফিরিয়ে নিয়েছে মুখ!
আমি
আমার
ছায়ার
কাছেও
একা
কোথায় পুড়ছে চোখ
জানলো না একবারো কেউ

যে তুমি একদিন এপথ আগলে দাঁড়াতে
সে তুমি আজ যেন ভিন্ন মানুষ

কেউ আর আমার মতন আকাশ দেখে না
নতমুখ সকলেই নির্মিত ব্যস্ততায় দূরে
আমার
লোকালয়
আমাকে
নিলো না
আজো

নিঃশব্দ দুপুরে

(যার চোখে তুমুল বৃষ্টি)

চিকচিকে চোখের কোণে সবুজ ঝরে
ঘুম চাইতে গেলেই অরণ্য উধাও
আকাশ জোড়া মেঘ চাইলেই তুমুল বৃষ্টি
তোমাকে চাইতে গেলেই পূর্ণিমা নিরুদ্দেশ।

শাল পিয়ালের পত্রছায়া, রাত্রি শেষে ভোর
আমি তোমায় হৃদয় জুড়ে পুষে রাখি রোজ।

অথচ
নিঃশব্দ দুপুরে শুভ্র বিড়াল হয়েছি বহুবার
তুমি তাই আমার পদশব্দ কোনো দিন শোনোনি।
আজ ও
সূর্য আলোক দুহাতে ঢাকলেও রাত্রি হয়
ঘড়ির কাঁটা পিছিয়ে দিলেও হৃদয় নাচে
জোয়ার-ভাটায় নদী তবুও সমুদ্রে লীন।
তবু ও
দ্যাখ মরি মরি করে মরছি না!

নক্ষত্র তবু তো জ্বলে

মেঘের শরীরে জল
তোমার গহিনে আমি
আলোর আড়ালে ছায়া
তোমার পার্সে টাকা

আমার পকেটে ছাই
তোমার দুহাতে কড়ি
হৃদয়ে মুমূর্ষু কায়া
মেঘহীন বৃষ্টিতে ভয়

আশার কথক হই
তুমিহীন ভালোবাসা
উদ্বাস্তু দিনের মায়া
আমাকে করেছে সাথি

কবিতা উধাও হলে
কলম দীনতা পায়
মানুষে মানুষ কই
নক্ষত্র তবু তো জ্বলে!
স্পর্শ করলে না

আমি তো তোমাকে বিশ্বাসের বিনিময়ে বিশ্বাস দিতে চেয়েছি
আমি তো জানি আজ যা বর্তমান কাল তা অতীত
আর তাই এই আমি তোমাকে আরাধ্য ভেবে
তোমাকে হৃদয় সড়কের সহযাত্রী করতে চেয়েছি
আঙুলে আঙুল খুঁটে বলতে চেয়েছি ভালোবাসা
আমাদের দিঘল অস্তিত্বের স্বপ্নময় নাম।

আমার অন্ধকার ঘরে তোমাকে ঢেকে আলো জ্বালাতে চেয়েছি
ঘরের ভেতরকার অন্ধত্বের কষ্টটাকে
একটা কৌটোয় পুরে ছুড়তে চেয়েছি
অনেক দূরের কোনো এক গভীর অতলে।

একজন মানুষকে আমারই অপেক্ষায় দেখতে চেয়েছি
কেমন উন্মুল নত হয়ে বসে থাকে কথাহীন অভিযানে
আমি দেখতে চেয়েছি দুচোখে বহতা ঘর নদী
যার প্রত্যাশা ঐ আকাশ নীলের অনন্ত সাগর।

অথচ তুমি আমার বাড়িয়ে দেওয়া হাত স্পর্শ করলে না!