স্টেডিয়াম গ্যালারীর সেইসব দিন

ইরাজ আহমেদ

সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো হাজার হাজার মানুষ, বজ্রপাতের মতো ফেটে পড়া তাদের চীৎকার, গালাগাল, অক্ষেপ, আড্ডা, খাবারের ঘ্রাণ, মারপিট-সব মিলে হাঁড়িতে টগবগ করে ফুটতে থাকা পানির মতো এক পরিস্থিতি। ঢাকা স্টেডিয়াম। তিন দশক অথবা তারও আগে ঢাকা স্টেডিয়ামে ফুটবল খেলা দেখার অভিজ্ঞতা যাদের নেই আমার মনে হয় তারা জীবনের বড় অভিজ্ঞতা থেকে বঞ্চিত। আমার তারুণ্যে ঢাকা স্টেডিয়াম নামে গ্যালারী ঘেরা গোলাকৃতি ওই সবুজ মাঠ আমাকে টেনে রেখেছিলো বৃহৎ এক চুম্বকের মতো।স্টেডিয়ামের সেইসব দিরাত্রির কথা লিখতে বসে একটু অসহায় বোধ করলাম। এতো গল্প জমে আছে ওই জীবনকে ঘিরে যে কোত্থেকে শুরু করবো ভেবে পাচ্ছিলাম না। তখন বিকেল হলেই বুকের মধ্যে ধুকপুক শুরু হয়ে যেতো। কখন পুরনো দিনের বেডফোর্ড কোম্পানীর বাসে চেপে বসবো স্টেডিয়ামে যাবার উদ্দেশ্যে। ওই বাসটাকে আমরা ঢাকাবাসী ডাকতাম ‘মুড়ির টিন’ বলে।ছোট বাস, কিন্তু লোক ওঠানোর কোনো বিরাম ছিলো না। চাপাচাপি করে নামতাম স্টেডিয়ামের উত্তর গেটে। গ্যালারীতে বসে খেলা দেখার উত্তেজনাই ছিলো আলাদা।তখন স্টেডিয়ামের পূর্ব এবং পশ্চিম গ্যালারী ভাগ হয়ে ছিলো তখরকার দুই হাই ভোল্টেজ ফুটবল দল মোহামেডান আর আবাহনরি নামে। কত নামী ফুটবলাররা খেলতেন দুই দলে-সালাহউদ্দিন, এনায়েত, মঞ্জু, নান্নু, টুটুল, ননী, মোতালেব, বড় কামাল, ছোট নাজির, পিন্টু, টিপু। পশ্চিম গ্যালারীটা ছিলো আবাহনীর সমর্থকদের দখলে আর পূর্বেরটা মোহামেডানের। গুরুত্বপূর্ণ কোনো ম্যাচ থাকলে জায়গা দখলের জন্য আমাদের গ্যালারীতে ঢুকতে হতো বেশ কয়েক ঘন্টা আগে। খেলা শুরু হওয়ার আগে লম্বা সময় ধরে সহ্য করতে হতো রোদ অথবা বৃষ্টি। কিন্তু কোনো ক্লান্তি ছিলো না তাতে। এমনও দিন গেছে খেলা দেখতে তিন ঘন্টা আগে ঢুকে পড়তে হয়েছে গ্যালারীতে। তারপর অপেক্ষা প্রিয় দলের খেলা দেখার জন্য। সেই অপেক্ষার সময়টা কিন্তু আমার জন্য ছিলো পিকনিকের মতো।

গ্যালারীতে বসে খাওয়া ছিলো অন্যতম এক আকর্ষণ। কত ধরণের খাওয়া যে তখন বিক্রি হতো সেখানে। ঘুঘনি থেকে শুরু করে কাসুন্দি দিয়ে নারকেল। বিক্রি হতো কোমল পানীয়, মুড়ি, চানাচুর, বাদাম। সব যে তখন পকেটের সামান্য টাকা খরচ করে কিনতাম তা নয়। মোহামেডানের সমর্থক হিসেবে পূর্ব গ্যালারীতে বসলে খাওয়ার কোনো অভাব হতো না। মহামেডানের পুরনো ঢাকার সমর্থকদের ছিলো দরাজ দিল। মহামেডান গোল করলেই উৎসাহ আর আবেগে ফেটে পড়া সেই মানুষগুলো আশপাশের মানুষগুলোকে খাওয়াতে শুরু করতো। খেতে না চাইলে বলতো-আরে মিয়া খান, মাম্মা গোল করছে তো। তারা মোহামেডান দলকে আদর করে ডাকতো ‘মাম্মা’। এরকম মানুষদের সঙ্গে খেলা দেখতে দেখতে বন্ধুত্ব তৈরী হয়ে গিয়েছিলো। মহামেডানের খেলার দিন সাদা লুঙ্গি, গোল্ডলিফ কোম্পানীর ফিনফিনে সাদা শার্ট পড়ে তারা খেলা দেখতে আসতো। হাতে থাকতো দামী সিগারেটের প্যাকেট। বন্ধুদের সূত্রে অবশ্য আমি ঘোর শত্রু শিবির আবাহনী সমর্থকদের পশ্চিম গ্যালারীতে বসেও বহু খেলা দেখেছি। সেখানেই পরিচয় হয় এক দাদার সঙ্গে। স্টেডিয়ামে এমন কোনো খেলা নেই যে ওই মানুষটা দেখতেন না। আমাদের চাইতে বয়েসে বড় ছিলেন। মুখ ভর্তি করে পান খেতেন আর মিহি রসিকতায় জমিয়ে রাখতেন চারপাশ। শুনেছিলাম, খেলা দেখার নেশায় আক্রান্ত দাদাকে তার মা বাড়ি থেকে খুঁজতে আসতেন স্টেডিয়ামে।

আমাদের খেলা দেখার দলটা ছিলো অনেক বড়। সিদ্ধেশ্বরী আর শান্তিনগর, দুই পাড়া মিলে বিশাল বাহিনী। মনে পড়ে তরুণ ভাই, মঈন ভাই, লিটন ভাইয়ের কথা। এই তালিকার তরুণ আর লিটন দুজনেই পৃথিবীকে বিদায় জানিয়েছে।

এরা বয়সে আমার একটু বড় হলেও সম্পর্ক ছিলো বন্ধুর মতো। দলবেঁধে আমরা কখনো বাসে অথবা পায়ে হেঁটে চলে যেতাম স্টেডিয়ামে। ভীড়ের সঙ্গে যুদ্ধ করে জোগাড় হতো টিকেট। তারপর গ্যালারীতে জায়গা দখলের যুদ্ধ। ওই সময়ে খুব অদ্ভূত ভাবে গ্যালারীতে তোলা হতো চায়ের পাত্র আর সিগারেট। বেসে থাকতে থাকতে সিগারেট ফুরিয়ে গেলে নিচে সিগারেটওয়ালাদের কাছে টাকা ছুঁড়ে মারতাম ছোট ইঁট দিয়ে মুড়িয়ে। অথবা দড়ি নামিয়ে দেয়া হতো একটা টিনের পাত্রসহ। ওরা নিচ থেকে ওই পাত্রে সিগারেট অথবা চা ভরে উপরে পাঠাতো। কারণ তখন একবার গ্যালারীতে ঢুকে গেলে বের হওয়ার কোনো প্রশ্ন ছিলো না।

এই স্টেডিয়ামে আমি রক্তগঙ্গা বয়ে যেতে দেখেছি। ইট বৃষ্টি, বোমা বিষ্ফোরণ দেখেছি, দেখেছি পুলিশের লাঠিচার্জ। খেলায় হেরে সমর্থকরা বের হয়ে এসে রাস্তায় বাস আর গাড়ি ভাঙচুর করতো। সেই আগুন জ্বলা দিনে বহু কষ্টে বাড়ি ফিরতে হতো পুলিশের হাত এড়িয়ে।তবুও বিকেল হলে স্টেডিয়াম টানতো আমাকে। সেই ভীড়, গ্যালারী ভর্তি দর্শকদের চীৎকার, উল্লাস, আক্ষেপ এখনো কানে এসে সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো আছড়ে পড়ে। খেলা নিয়ে এখন এতোটা উন্মাদনা আর দেখতে পাই না। সেই ঢাকা স্টেডিয়ামের ফ্লাড লাইট আর জ্বলে ওঠেনা রাতের ঢাকার আকাশে মোহজাল তৈরী করে। নীরব হয়েছে গ্যালারীও। কখনো দীর্ঘশ্বাস ফিরিয়ে আসে সেই দিনের স্মৃতি, সেই মানুষগুলোর মুখ।

ছবিঃ গুগল