এভাবেই নতুন বছরকে বরণ করে নিউইয়র্ক

স্মৃতি সাহা

জেগে থাকা নিউইয়র্ক শহর। কবি লোরকার ভাষায় স্লিপলেসসিটি । সেই শহরে স্বপ্নও যেন নির্ঘুম। এই শহরের দিনরাত্রির রোজনামচা স্মৃতি সাহার কলমে প্রাণের বাংলায় নিউইয়র্ক থেকে ধারাবাহিক ভাবে।

ইলশেগুঁড়ি দিন বাঁধা পড়ে একঘেয়েমিতে। বিন্দু বিন্দু বৃষ্টি, সুর তোলার আগেই মাটিতে হারিয়ে যায়। মধ্যদুপুরে ছাই রঙা মেঘের আড়ালে যখন সূর্যকে চাঁদ বলে ভ্রম হয়, এমন দিনে মন বিষাদের সিন্ধু হয়ে ওঠে আর তা দীর্ঘশ্বাসে বিষাদ তাড়ায়। মন পবনের নাও বৈঠা চালায় উল্টোমুখে। অবধারিত হয় পুরানো দিনের ঝাঁপির মায়াময় হাতছানি। এমন ইলশেগুঁড়ি দিনে কাঁথামুড়ে গল্পের বই, চায়ের কাপে মা আর বোনেদের সঙ্গে আড্ডায় প্রহর পার, বাড়িময় আতপের গন্ধ ছড়িয়ে হেঁসেলে খিচুড়ি, আনমনে জানালায় চোখ, পিছনবাড়ির শাল আর সেগুনের অনবরত ভিজে যাওয়া আর দিনশেষে জলফুরিয়ে যাওয়া গুমোট মেঘের শাড়ি পড়া অনেক দূরের আকাশ।

ইলশেগুঁড়ির ঝিরিঝিরি থামলেই প্রকট হত ঝিঁ ঝিঁ পোকার ক্লান্তিহীন সুর। ফুরিয়ে যাওয়া দিনের সেই অপ্রতিরোধ্য ছবিগুলো সুযোগ পেলেই রূপোর কাঠিতে জীবন্ত হয়ে উঠা। জীবন্ত অতীতকে আবার ঝাঁপি বন্দী করতে হয় দৈনন্দিকতার দাবীতে। মনকে কিছুটা বশীভূত করে ডিঙ্গোতে হয় ঘরের পৈঠা। কি মনে করে নিত্যদিনের পথ এড়িয়ে অন্য পথের পথিক হওয়া। কে জানতো সেই অন্য পথেই রয়েছে জীবনের কিছু অনিবারিত সত্য। পথিমধ্যে, আনমনেই চোখে পরে এই শুভ্র মায়ার আধার। বিন্দু বিন্দু জল মেখে কি লাবণ্যময়ী! আভরণহীন গাছগুলো যখন জীর্ণতার বিষাদ সবার অলক্ষ্যে ছড়িয়ে দেয় প্রকৃতিতে, জীবনে তখন সেই বিন্দু বিন্দু বৃষ্টিজল জীর্ণতাকে কি দারুণ ভাবে অলংকৃত করছে! এই ইলশেগুঁড়ি একঘেয়েমি আনছিলো, আনছিলো মনখারাপ করে দেওয়া অতীতের ঝাঁপি। আর এখানে সেই ইলশেগুঁড়ি প্রকৃতিতে হীরকদ্যুতি ছড়াচ্ছে!! ঠিক যেন জীবনের সেই বোধ প্রকৃতিতে চাক্ষুষ, “জীবনের কোনো কিছু মূল্যায়িত করতে হয় সময় আর পরিস্থিতির মাপকাঠিতে!!”

অনেক হলো মেঘলা দিনের কাব্য। এখন বরং রঙধনুর গল্প বলি। ক্রিসমাসে সান্তা ক্লজ মুঠোভর্তি আনন্দ আর রঙ নিয়ে এসেছে নিউইয়র্কারদের জীবনে। চারিদিকের শুভ্রতার মঙ্গল গান আর তার মাঝে উচ্ছল লাল, প্রাণোদিপ্ত সবুজের আখ্যান। আর এই আখ্যান আরোপিত হলেও তা প্রাণের সঙ্গে যুক্ত হয় অবধারিত ভাবে। ক্রিসমাস শেষ হবার সঙ্গে সঙ্গেই এখানে শুরু হয়ে গেছে নতুন বছরকে বরণ করার সব আয়োজন। নিউইয়র্কের বর্ষবরণের অনুষ্ঠানকে ঘিরে সারাবিশ্বের মানুষের উৎসাহী দৃষ্টি থাকে সবসময়। টাইম স্কয়ারে ৩১শে ডিসেম্বর রাত ১২:০০ টায় বল ড্রপকে ঘিরে আমেরিকাসহ সারাবিশ্বের মানুষের উদ্মামনা সত্যিই বিস্ময়কর। সেই বল ড্রপ স্বচক্ষে দেখার জন্য হাজার হাজার পর্যটক সমাগত হয় এখানে। আর সেই মুহূর্ত উদযাপনের জন্য নিউইয়র্কে শুরু হয়ে গেছে প্রস্তুতি। টাইম স্কয়ার এখন পর্যটকদের পদচারণায় মুখর। অতিরিক্ত নিরাপত্তা এখন শহরজুড়ে, যাতে সকল পর্যটক নিউইয়র্ক বাসীদের সঙ্গে মিলে উপভোগ করতে পারে নিউ ইয়ার ইভ আর সেই বল ড্রপের রঙীন মুহূর্ত। টাইম স্কয়ারে আয়োজিত এই ‘বল ড্রপ’ শত বছরের ঐতিহ্য। ১১০ বছর ধরে চলে আসছে এই আয়োজন। ১৯০৭ সালের ৩১শে ডিসেম্বর প্রথমবারের জন্য এই আয়োজনটি করেন ‘নিউইয়র্ক টাইমস্’ পত্রিকার কর্ণধার। এরপর থেকে প্রতি বছর আয়োজিত হয়ে আসছে বর্ষবরণের এই অনুষ্ঠান। বল ড্রপের জন্য যে বলটি ব্যবহার করা হয় সেটাকে বলে “ওয়াটারফোর্ড ক্রিষ্টাল বল”। বলটিকে রাখা হয় ‘ওয়ান টাইম স্কয়ার’ এর গগনচুম্বী অট্টালিকার ছাদে। প্রতিবছর ৩১শে ডিসেম্বর রাত ১১:৫৯ মিনিটে ৬০ সেকেন্ড-এর কাউন্টডাউন শুরু হয় এখানে। কাউন্টডাউন শেষ হবার সঙ্গে সঙ্গে ঘড়ির কাঁটা যখন ১২:০০ টার ঘরে ঠিক তখন বলটিকে ১৪১ ফুট উঁচু থেকে ড্রপ করা হয়। আর একারণেই এটাকে “বল ড্রপ” বলা হয়। বল ড্রপের পর পরেই বাজির আলোর রোশনাই-এ আলোকিত হয়ে ওঠে নিউইয়র্ক-এর আকাশ। আর এভাবেই সারাবিশ্বকে সঙ্গে নিয়ে পুরাতন কে পিছনে ফেলে নতুন বছরকে বরণ করে নিউইয়র্ক শহর। জীবনকাব্যকে অজস্র অভিজ্ঞতা আর গল্পে সমৃদ্ধ করে বিদায় নিতে চলেছে ২০১৭ সাল। বছর শেষে খেরোখাতায় পাওয়া না পাওয়ার হিসেব না উহ্য থাক বরং। এরচেয়ে নতুন বছরের পদার্পণকে উল্লেখযোগ্য করে তুলি সবরকম শুভ ইচ্ছা আর পরিকল্পনা দিয়ে।

ছবিঃ গুগল