পিটারের বাড়ির গলি, অন্ধকার আর অদ্ভুত ঘোর…

মাহবুব রেজা

এক।।
মিলানোর সেন্ট্রাল রেল ষ্টেশনের পাশের এক ঘিঞ্জি গলিতে আমি ছিলাম বছর খানেক। এলাকার নাম ভিয়া ক্রেসপি। ইতালিতে এলাকাকে বলে জোনা। ক্রেসপি মূলত রাস্তার নাম। ভিয়া মানে রাস্তা।

মিলানো ইতালির দ্বিতীয় বড় শহর, বানিজ্যিক রাজধানীও বটে। আমার মিলানোতে থাকার দিনগুলো শুরু হয়েছিল সেই গলির ইহুদী মালিকের বাড়িতে এক বাঙালির দুই রুমের ফ্ল্যাটে। কম দামের ভাড়া বাড়িতে ইতালিরা খুব একটা থাকত না। থাকতো আমাদের মতো বিদেশীরা।
ষ্টেশনের পাশে হওয়াতে বাড়তি পাওনা ছিল সারাদিন রেলের শব্দ। কিছু পুরনো ইতালিয়ান মানুষজন (বিশেষত বুড়ো বুড়ি ) ভিয়া ক্রেসপির পাশের এলাকায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল। এরা প্রয়োজন ছাড়া সাধারনত বিদেশীদের সঙ্গে খুব একটা কথা টথা বলতো না। তবে কখনও সখনও বিদেশীরা সামনা সামনি পড়ে গেলে তারা মুখে এক ধরনের কষ্টার্জিত হাসি এনে নিয়ে বলতো,’ কমেইস্তাই সিনোরে।’ মানে হলো কেমন আছেন জনাব।
নিজের দেশ ছেড়ে , প্রিয় জন ছেড়ে এখানে এভাবে কেউ কি ভালো থাকে!
আমরা যে ভালো নেই সেটা সম্ভবত ওরা আমাদের মুখ দেখে বুঝে যেত।
আমি এক বুড়োকে চিনতাম। ওর নাম ছিল পিটার। সিসিলিয়ান। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্বের পর পিটার সিসিলি ছেড়ে মিলানে চলে এসেছিল। তারপর আর সেখানে ফিরে যায়নি। পিটারের এক ছেলে ওকে ছেড়ে জার্মানে চলে গেছে। মেয়ে থাকে পালেরমো।
পিটারের বাড়িটা ছিল ভিয়া বেনিনি তে। একটা চিকন গলির শেষ মাথায়। বাড়িগুলো বেহায়ার মতো একটা আরেকটার গায়ে লেগে দাঁড়িয়ে থাকে দিনমান।
ওর সঙ্গে আমার পরিচয় এক সস্তা চায়না বারে। প্রথম দেখায় পিটারই আমার সঙ্গে অনেক কথা বলেছিল।
কেন বলেছিল? তা জানি না তবে আমি লেখালেখি করি , আমার কয়েকটা গল্পের বইও আছে জানতে পেরে পিটার বেশ অবাকই হয়েছিল। পিটার আমাকে জানিয়েছিল তার মা আন্দ্রেয়াও নাকি একসময় গল্প কবিতা লিখতো।
মার কথা যখন পিটার বলছিলো তখন তাকে দেখে মনে হলো যেন তার মা নয় সে নিজেই লেখালেখি করে!
বুড়ো পিটারের সেকি উৎসাহ!
এরপর আমি সময় সুযোগ পেলেই পিটারের সঙ্গে দেখা করতে ওর বাড়িতে যেতাম।
চিপা গলি। দু’পাশে পুরনো রঙজ্বলা লাগোয়া ঘরবাড়ি পেরিয়ে আমি পৌঁছে যেতাম। আমাকে দেখলে সে ভীষণ খুশি হতো। তার স্ত্রী আন্দ্রেয়া যে বিদেশি হিসেবে আমাকে খুব সমাদর করতে চাইত না সেটা আমি বুঝতে পারতাম। পিটারের দেখাদেখি আন্দ্রেয়াও হেসে হেসে কথা বলার কসরত করতো, আমি বুঝেও না বোঝার ষোল ভাগ অভিনয় করতাম।
একেই কি সের এর ওপর তিন সের যাকে বলে!
নির্ণয় না জানি।
হোটেলের কিচেনের কাজ শেষ করে কখনও কখনও আমাকে অনেক রাতে বাড়ি ফিরতে হতো। আমি ইচ্ছে করলে অন্য পথ ধরে বাড়ি ফিরতে পারতাম কিন্তু কেন যেন মাঝে মাঝে আমি রাতের অন্ধকারকে পিঠে বয়ে নিয়ে পিটারের বাড়ির গলির ওপর দিয়ে হেঁটে হেঁটে বাড়ি ফিরতাম।

দুই।।
এখনও অনেক রাতে আমি কাজ শেষে বাড়ি ফিরি। আমার শুক্রাবাদের বাড়িও এক গলির ভেতরে। আমি যখন আমার বাড়ির গলিতে ঢুকি তখন আমার মধ্যে এক ধরনের ভ্রম কাজ করে।
আমার তখন মনে হয় আমার পিঠে বুঝি কবে থেকে ভর করে আছে পিটারের গলির অন্ধকার!

ছবি : লেখক