আমার কাঁধের ওপর হাত রাখল সময়

ঘড়ির কাটা একটু একটু করে এগিয়ে যাচ্ছে। আরো কিছু ঘন্টা, মিনিটের গ্রন্থি অতিক্রম করলে ঘোষণা আসবে বছর শেষ হওয়ার। তখন সেই সময়ের ঘড়ির অক্লান্ত যাত্রার সেই মুহূর্তে নিউইয়র্কে শুরু হবে বল ড্রপ আলোর ফোয়ারা নিয়ে, আলো জ্বলে উঠে রঙীন করে দেবে ‍সিডনির আকাশ, মিশরে বেজে উঠবে নতুন সুর, ইউরোপের রাত্রি নীরবতা ভেঙ্গে চমকে উঠবে সহস্র কন্ঠের উল্লাস ধ্বনিতে। সেই আনন্দের ধাক্কা এসে লাগবে এশিয়ার দেশে দেশে, আমাদের বাংলাদেশেও। গোটা বিশ্বের মানুষ সমেবেত কন্ঠে বলে উঠবে হ্যাপী নিউ ইয়ার, হ্যাপি ২০১৮ সাল।

ফেলে যাওয়া পুরনো বছরটার জন্য আমার বড় মায়া হয় তখন। এই আলো, এই উৎসব, গান, বাদ্য আর নতুন সময়কে স্বাগত জানানোর উচ্ছাসে রাজপথ যখন ফুটছে আবেগে ঠিক তখনই মনে হয় পেছনের গলি বেয়ে মাথা নিচু করে ম্লান মুখে কোন অজানা কালের গর্ভে অথবা ইতিহাসের পৃষ্ঠার দিকে হাঁটতে শুরু করলো ফেলে যাওয়া মুহূর্তের যোগফলটুকু। তার কথা তখন কেউ আর মনে করে না। হয়তো মনে করতেও চায় না। নতুনের জন্য সবার থাকে অপেক্ষা আর আবাহন। সেই উজ্জ্বল আসরে পুরনোর ঠাঁই কোথায়! সেই চলে যাওয়া সময়ের পথরোধ করে তল্লাশী চালালে হয়তো জামার বুক পকেটে মিলবে আমাদেরই রক্তাক্ত, ভ্রষ্ট রাজনীতির তুলকালামের চিহ্ন। পাওয়া যাবে আমাদের মুদ্রাদোষে ক্রমশ নষ্ট হওয়া প্রকৃতির দীর্ঘশ্বাস, হয়তো মিলবে মানুষের অমানবিক হয়ে ওঠার ইতিহাসের কয়েকটি ছেঁড়া পৃষ্ঠা আর সময়ের হাতের মুঠোয় শুকিয়ে যাওয়া ফুল কোনো। কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের সেই কবিতার লাইনটা কি ছিলো?

‘‘আমার কাঁধের ওপর হাত রাখল সময়/তারপর কানের কাছে ফিসফিস করে বলল-দেখলে!কাণ্ডটা দেখলে!/আমি কিন্তু কক্ষনো তোমাকে ছেড়ে থাকি না/ তার কথা শুনে/হাতের মুঠোটা খুললাম/কাল রাত্রের বাসি ফুলগুলো সত্যিই শুকিয়ে কাঠ হয়ে আছে’’।

সত্যিই সময় আমাদের কখনোই ছেড়ে থাকে না। কতগুলো মুহূর্তের যোগফল এই জীবন। সেখানে সময়ের ফাঁক বলে কিছু কি আছে?সেকেন্ড, মিনিট আর ঘন্টার নিপুন সেলাই আমাদের গেঁথে রেখেছে জীবনের এই বিচিত্র কান্ডে। সেখানে সময়কে আমরা বিদায় জানাই কোন সাহসে! আসলে বিদায় তো জানাই কিছু ঘটনাকে, বিদায় জানাই কষ্টের স্মৃতিকে, শোককে, বেদনাকে।মানুষ দুঃখ-কষ্টের দুঃসহ স্মৃতি ভুলতে চায়, ভুলতে চায় তার চারপাশে সময়জুড়ে ঘটে চলা ঘটনার তান্ডবকে। আর তাই ক্যালেন্ডারের পাতায় সংখ্যা দিয়ে আটকে রাখা কিছুটা সময়কে তিনশ পয়ষট্টি দিন পর তড়িঘড়ি বিদায় করতে উৎসবের আয়োজন করে।মানুষ সামনে এগুতে চায়। নতুন ভেবে স্পর্শ করতে চায় সময়ের ভিন্ন মোর্চাকে। সব যন্ত্রণা ভুলে বেঁচে থাকতে চায়  নতুন আশার ডানায় ভর করে।

পৃথিবীতে কম তোলপাড় ঘটেনি ২০১৭ সালে। দেশে দেশে যুদ্ধ বেধেছে, যুদ্ধের হুমকী ঝুলছে এখনো মাথার উপর, রাষ্ট্রযন্ত্র পাল্টে গেছে, ধর্মের নামে জঙ্গীবাদের ভূত তাড়িয়ে ফিরেছে মানুষকে, রক্তের স্রোত বয়ে গেছে, বিজ্ঞান মহাকাশের রহস্য জানতে গবেষণা চালিয়েছে, দরিদ্র মানুষের জীবনের যন্ত্রণা বেড়েছে, নৈতিকতা এগিয়ে গেছে আরো পতনের দিকে, পাল্টেছে সমাজের গঠন। একাধারে অনেকগুলো নেতিবাচক কথা বলে গেলাম। ইতিবাচক কিছুই কি ঘটেনি পৃথিবী জুড়ে গত এক বছরে? খারাপ ঘটনার ধাক্কায় সেই ভালোকিছুকে আমরা ভুলে যাই।খবরের এটাই নিয়ম। আমরা তাই সেইসব ভালো ঘটনাকেই মনে করতে চাই। হয়তো নতুন সময়ের দরজায় দাঁড়িয়ে মনে মনে খুঁজতে চাই নিজেদের সংশোধনের উপায়।হয়তো হাতের মুঠোয় সেই শুকনো ফুলটাকে আবার বাঁচিয়ে তোলার রাস্তা আর বিশ্বাস করতে চাই মানুষের সুন্দর চিন্তার মৃত্যু ঘটে না। জয় হোক নতুন সময়ের।

ইরাজ আহমেদ

ছবিঃ গুগল