তাইতো বলি, ভালো থাকুক সবাই

আন্জুমান রোজী,(কানাডা থেকে)

নতুনবছর নতুন কিছু কি বয়ে আনে? বয়ে আনে কি নতুনকিছু প্রাপ্তির সম্ভাবনা? নাকি নতুন কোনো অনুভূতির সঞ্চার হয়? সবই তো প্রাকৃতিক নিয়মে চলে! শুধু একটি সংখ্যার পরিবর্তন ছাড়া আর তো কোনোকিছু নয়! তাহলে এতো আলোড়ন কেন; কেন এতো আনন্দ উৎসবের উদ্দ্যমতা? এই উদ্দ্যমতার অনুভূতি আমাকেও যেন ছুঁয়ে যায়। চারদিকে মানুষের আনন্দের বহিঃপ্রকাশ দেখে বিভিন্নজনের সঙ্গে কথোপকথনের মাধ্যমে একে অপরের অনুভূতি শেয়ার করেছি। আর জেনেছি কিভাবে বরণ করে নিচ্ছে নতুনবছর। এ শুধু আমার কৌতূহল!

অ্যালেক্সকে জিজ্ঞেস করেছি, ‘কী করছো থার্টি ফাস্ট নাইটে? সে বললো, ‘আমি মিড নাইটে ইয়োগা সেশনে যাবো। জিজ্ঞেস করলাম , ‘সেটা কখন শুরু হবে?’ সে বললো, ‘রাত সাড়েদশটা থেকে রাত দুটা পর্যন্ত চলবে।
–তাহলে তুমি নতুনবছর আগমন মুহূর্তে ইয়োগা করবে?
–হ্যাঁ।
–অর্থাৎ ধ্যানের মধ্যদিয়ে তুমি নতুনবছরে প্রবেশ করবে?
–হ্যাঁ।
–এভাবে কেন ভাবলে? মানুষ তো অন্যভাবে নতুনবছর বরণ করে!
–কারণ আমি মানুষের ভিড় পছন্দ করি না। তাছাড়া নতুনবছরের মুহূর্তটিকে আমার মতো করে অনুভব করতে চাই। এ কাজটা আমি প্রতিবছরেই করে থাকি।
মনেমনে বললাম, ‘ইম্প্রেসিভ।’

তারপর জনাথনকে জিজ্ঞেস করলাম, থার্টি ফাস্ট নাইটে কী করছো?
সে বললো, ‘দশটায় বেডে যাবো। তারপর সূর্য ওঠার আগেই উঠে যাবো নতুন সূর্যোদয় দেখার জন্য।’
–বারোটা এক মিনিটে জাগবে না?
–না। নতুনবছরের প্রথম সূর্য আমার কাছে অনেক কিছু।
আমি বেশ উত্তেজিত হয়ে বললাম, ‘জানো আমাদের বাংলা নববর্ষ ঠিক এভাবে বরণ করি। সূর্যোদয়ের সঙ্গে-সঙ্গে আমরা গান, প্রার্থনা করে বরণ করি।’ তখন সে বললো, ‘ বাহ, ইন্টারেস্টিং।’ আবারো জিজ্ঞেস করি, ‘কোথায় যাবে সূর্যোদয় দেখতে? এই শহরের দালানকোঠার মাঝে তো সূর্য ওঠা দেখা সম্ভব না!। তখন সে বললো, ‘ উত্তরে পাহাড়ের ঢালে চলে যাবো।’
–সূর্যোদয় দেখবে আর কী ভাববে?
একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস টেনে বললো, ‘চোখভরে নতুন সূর্যোদয় দেখবো। শুধু এইটুকু। এভাবেই আমি নতুনবছর বরণ করে নেই।’

বারবারাকে জিজ্ঞেস করলাম, তুমি কী করবে?
–আমি আর জন শ্যাম্পেনের বোতল খুলবো। তারপর নতুনবছরের জন্য একে অপরকে উইশ করবো।

ডোমেনিককে জিজ্ঞেস করলাম, ‘তুমি কী করবে?’ সে বললো, ‘ফায়ার প্লেসের পাশে বসে ড্রিং করবো আর কাউন্ট ডাউন করবো।
–সঙ্গে কে থাকবে?
–সোফিয়া। (ডমোনিকের স্ত্রী)

ভিনোসকে জিজ্ঞেস করলাম, তুমি কী করবে?
—ডাউনটাউনে যাবো।
আমি বললাম, ‘অনেক ঠাণ্ডা কিন্তু! -৩০ হবে। একদম বরফের মতো ঠাণ্ডা।
সে আরো উচ্ছ্বসিত হয়ে বললো, ‘আই ডোন্ট কেয়ার।’

আমাকে জিজ্ঞেস করলো, ‘তুমি কী করবে?
–আমি ওয়ার্মে থাকবো, বাইরে কোথাও যাওয়ার ইচ্ছে নেই। এক বন্ধু আসবে, তার সঙ্গে সময় কাটাবো। আর নেটফ্লেক্সে মুভি দেখবো। বলতে পারো রিলাক্স মুডে থাকবো।
নতুনবছরের মুহূর্ত ঠিক এইভাবেই খুব নীরবে আমাকে আর আমার বন্ধুকে ছুঁয়ে গেলো। কারণ আমরা মুভি মুডে ছিলাম। মুভিটা ছিল, “It’s too complicated”

নতুন দিনে ঘুমভাঙার পর আমার বন্ধুকে বললাম, মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত প্রকাশকে অবদমন করা কি সম্ভব?’ আমাকে তখন সে বললো, হ্যাপি নিউ ইয়ার, রোজী।
আমিও উইশ করে তাকে আবারো জিজ্ঞেস করলাম, ‘আপনি কি জানেন, বাংলাদেশে নতুনবছর বরণের জন্য নিষাধাজ্ঞা দিয়েছিল? কিন্তু তরুণরা তা পটকা ফুটিয়ে উড়িয়ে দিয়েছে।’ আমার কথা শুনে নীনা আপা অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে। সেইসঙ্গে আমিও হাসি।

ভালোলাগা, ভালোবাসা প্রকাশের আরেকটি মাত্রা হলো নতুন বছরকে বরণ। কোনো না কোনো উছিলায় মানুষ মানুষের কাছে আসবেই। এটাও মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি। নতুনবছর কিছুই না, আবার অনেককিছু । সৌহার্দ , সম্প্রীতি আর মানুষে মানুষে বন্ধনের জন্য এইসব দিনগুলো একেকটি মেলবন্ধন। সবার মধ্যে একই অনুভূতির সঞ্চার! শুভকামনটাই বেশি অনুরণিত হয়। তাই বলি, ভালো থাকুক সবাই।

ছবি: লেখক