পাতাঝরা সময়…

শেখ রানা (নিউবুরি পার্ক, লন্ডন)

নব্বই মানে আম্মার সাথে রিকশায় করে কলাবাগান অথবা নিউমার্কেট যাওয়া।

হাইকোর্ট থেকে চার টাকা রিকশা ভাড়া। এখন শুনতে অবিশ্বাস্য লাগবে, আমারই কেমন লাগছে লিখে। মোটে চার টাকা? হাইকোর্ট থেকে কলাবাগান!

কলাবাগানে আমার নানা-নানু থাকতেন। খালা-মামা মিলে অনেক মানুষজন। কলাবাগানের কাছাকাছি আসতেই আমি খালাম্মাদের ভালোবাসার গন্ধ পেতাম। কলাবাগান আমার কাছে তাই খুব আপন একটা জায়গা ছিল।

প্যান্ডোরার বাক্স ছিল নিউমার্কেট। আম্মার সঙ্গেই যেতাম। খেলার পত্রিকা, কেক-পেস্ট্রি-মিমি আর গল্পের বই-কমিকস। আম্মাকে কত যে জ্বালিয়েছি।

নব্বই এর কথা বললেই চোখের সামনে ভেসে আসে একটা শান্ত দুপুর। ছুটির দিন। বাসার সবাই ভাত ঘুমে। আমি সোফা-কাম বিছানায় আধ শোয়া হয়ে গল্পের বই পড়ছি। পাশে ক্যাসেট প্লেয়ারে বাংলা গান বাজছে। যে কোনো কিছু। ফিডব্যাক এর উল্লাস অথবা রেনেসাঁর ‘ভালো লাগে জোছনা রাতে।’

আমার ইংরেজি গান শোনাও শুরু নব্বই এ। এবং এক অদ্ভুত মিশেলে। মডার্ন টকিং, ম্যাডোনা, মাইকেল জ্যাকসন (জাস্ট বিট ইট কে একসময় জাস্ট পিরে বলা হতো সেটা মনে পড়ে গেলঃ) অন্যদিকে জন ডেনভার, লোবো, ক্রিস ডি বার্গ। অথবা ডেফলেপার্ড, মেটালিকা, ডিও-র রহস্যময় টেম্পল অফ দ্যা কিং। আর সর্বগ্রাসী স্করপিওন্স। এই নানাবিধ গান শুনে একটা দিক ভালো হয়েছে-গান নিয়ে আমার কোনো উন্নাসিকতা জন্মায়নি। ভালো গান বা খারাপ গান এর মাপকাঠি যে আদতে অসার সেটা হৃদয়ঙ্গম করেছি নিজের মত করে।

বি টি ভি-তে আবেদ খানের উপস্থাপনায় মাসে একবার, সম্ভবত রবিবারে, সলিড গোল্ড নামে ইংরেজি গানের অনুষ্ঠান হতো। মনে আছে, ক্লিফ রিচার্ড এর প্রিটি ওমান গান শুনে স্বপ্নালু হয়ে ছিলাম অনেকদিন।

বিটিভি-র ব্যান্ড ‘সঙ্গীত’ এর প্রোগ্রাম নিশ্চয়ই কেউ ভুলে যায়নি।অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতাম। মূল অনুষ্ঠানের কয়েকদিন আগে টিজার দেখাতো বোধহয়। কত ভালো ব্যান্ড যে হারিয়ে গেল সময়ের নিয়মে, নাকি সময়ের প্রয়োজনে-আমরা কেউ জানিনা।

নব্বই সময়কালেরই কোনো এক রাত। বিটিভিতে তার আগে থেকেই আনন্দমেলা বা এখনই নামে ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান এর ভক্ত ছিলাম আমরা। বিটিভিতে এখন কি আগের মতন ম্যাগাজিন অনুষ্ঠানের সেই চল-টা আছে। দেখা হয়না অনেক দিন। জানিও না।

সেই আনন্দমেলা বা এখনই-র সদা হাস্যোজ্জল আর চমৎকার কথা বলে সুদর্শন একজন মানুষ সেই রাতে জলসা নামে একটা অবাক করা অনুষ্ঠান উপস্থাপনা করলেন। আমি যদি ভুল করে না থাকি জলসা-র প্রযোজক ছিলেন রিয়াজউদ্দিন বাদশা। আমরা চোখ বড় বড় করে দেখতে লাগলাম প্রয়াত নীলুফার ইয়াসমিন গাইছেন রেনেসাঁর হৃদয় কাদামাটির কোনো মূর্তি নয়, ফিডব্যাক এর সবাই গামছা মাথায় প্যাচিয়ে হাসিমুখে বসে আছে, খান আতাউর রহমান, কলিম শরাফি, মাকসুদ, হামিন আহমেদ পরস্পরের গান নিয়ে মিথস্ক্রিয়া করছেন আর সেই সময়ের মনোহর পার্থ বড়ুয়া হারমোনিয়াম নিয়ে হাসিমুখে ‘বাঁশী শুনে আর কাজ নাই’ গেয়ে সারা ফেলে দিলেন।

প্রিয় আনিসুল হক, আপনিও নব্বই এ ছিলেন। বিটিভির সেই সাদা-কালো সময়ের স্বজন হয়ে।

কিছু মানুষের হাসিমুখ দেখলেই একটা মন ভালো করা অনুভূতি হত।

পরম করুণাময় আপনাকে এ রকম হাসিমুখে রাখুন।

ছবি: গুগল