প্রেম যেন মোর গোধুলী বেলার গভীর ভাবনা

কনকচাঁপা শিল্পী কনকচাঁপা এবার গানের পাশাপাশি প্রাণের বাংলার পাতায় নিয়মিত লিখছেন তার জীবনের কথা। কাটাঘুড়ির মতো কিছুটা আনমনা সেসব কথা, হয়তো কিছুটা অভিমানিও। কিছুটা রৌদ্রের মতো, খানিকটা উজ্জ্বল হাসির মতো।

খুব ছোট বেলার কথা। খালা ফুপু পরিবেষ্টিত আমাদের শৈশব। তাদের আদর ভালবাসা গায়ে, জীবনে মেখেই বেড়ে উঠেছি। তাদের সঙ্গেই গ্রামে গেলে সময় কাটাই, কিন্তু কিছু সময় তারা রহস্যময় আচরণ করেন গোপনীয়তার ব্যাপার তো আর ছোট মানুষ আমি কিছুই বুঝিনা, কিন্তু এটুকু বুঝি এই অপার রহস্যে কিছু ভালোলাগা লুকিয়ে আছে। না হোক তা আমার, কিন্তু একদিন আমার ও এমন গোপনীয় কিছু আলাদা করে থাকবে। এটাও একটা ভাললাগার অনুভব ছিলো। মেয়েরা হয়তো একটু তাড়াতাড়িই বুঝে যায় সব। আর এই একটু একটু বুঝতে বুঝতেই বড় হয়ে যায় মেয়েটি।আমার নানাবাড়ি দাদাবাড়িতে সেই সময়ই খুবই আধুনিক শিক্ষিত পরিবেশ বিরাজমান ছিল। স্কুল কলেজে মেয়েরা ছেলেরা একসঙ্গে পড়তো। কিন্তু প্রেম করা যুগে যুগে সবসময়ই কঠিন ছিল। তো একজন খালা আমার হাতে কিছু লিখে বলতেন যাও, অমুক মামাকে পড়িয়ে আবার আমার কাছে এসো। আমি হয়ে গেলাম জীবন্ত চিঠি! আমার এক বোন দেখতাম মাটির ব্যাংক এ কি যেন ফেলে আবার তা ব্লেড দিয়ে বের করে। তখন একটু বড় হয়েছি, লুকিয়ে সেই ব্যাংক ভেঙ্গে আমি তাজ্জব! একজন মানুষের ছবি! সেই মানুষকে আমি খুব চিনি। এখন কি উপায়? ব্যাংক যে ভাঙ্গলাম? নতুন ব্যাংক কিনে সেই ছবি আবার ঠিকমতো রেখে তবেই বাঁচা। আর এক ফুপু, তিনি চিঠি দিতেন আর বলতেন অমুক কলাগাছের কাছে ইট আছে তার নীচে রেখে আগের রাখা চিঠি নিয়ে এসো। ধারাবাহিক ভাবেই এই ডাকপিয়ন এর কাজ করতাম। তার বিনিময়ে চকলেট বাদাম মেলা পেতাম বলাই বাহূল্য। আরও একটু বড় হয়ে ভাবতাম অভিভাবকরা এমন কেন? সেই তো বিয়ে দিতেই হয়, তো প্রেম কেন মেনে নেননা! আমি এই পরিণত বয়সেও অভিভাবকদের এই সমাজের উঁচু নীচু সমতার অংক বুঝিনা এবং বিশ্বাস ও করিনা। আমিও প্রেম করেছি এবং তাকেই বিয়ে করেছি। তাকে বাদ দিয়ে আর কারো দিকে তাকাইনি বা ভাবিনি, এমন কথা বুকে হাত দিয়ে বলতে পারবো না। কিন্তু আসল প্রেম আমি করলাম বিয়ের পর বলা যায় অনেকদিন পর। গান সংসার সন্তান যৌথজীবনে এই প্রেম বুঝতে বুঝতে অনেক দেরী হয়েছে। আপাতদৃষ্টিতে ক্ষেপাটে মানুষটার পুরো পৃথিবী আমিই এইটা বুঝে উঠতে আমার সময় লেগেছে কিন্তু যখন তা বুঝেছি তখন নিজের দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে নতুন উপলব্ধি তে ভেসে গেছি যে, এই লোকটাকেই আমি ভালোবাসি!!! এবং তা এতটাই যে আমি রোজদিনই নতুনভাবে প্রেমে পড়ি এবং লজ্জা পাই। এবং সে কথা তাকে বলতেও লজ্জা পাই। এটাই বোধহয় আসল প্রেম বা তার অতিরিক্ত কিছু। প্রেমের বাইরেও কিছু আছে। সেখানে দরকার আত্মার ভাব বিনিময়, দেহ সেখানে অ-দরকারি। এ চিনির এ ভাবনায় থিতু হতে না হতেই অনেক গভীর ভাবনায় আমি জড়িয়ে গেছি।

তা হলো আমার মনুষ্য প্রেম, দৈহিক আনন্দ, জৈবিক প্রাপ্তি সন্তান সংসার এর বাইরেও আরেকটি অনুভব আমাকে ভাবায়, দোলায়, জাগ্রত করে, উত্তেজিত করে ক্লান্ত করে ভয় দেখায়। আশার দোলাচলে অনেক দুর নিয়ে যায়, ভাসায়, ডুবায়, হাবুডুবু খাওয়ায়। সেই ভাবনা আমার মৃত্যু ভাবনা এবং ইশ্বর প্রেম। আমি বুঝতে পারি আমি এই গোধুলী লগ্নে ওই নিকষ কালো মৃত্যু কে আকাঙ্ক্ষা করছি কারণ এই গোধূলি পার হয়ে আঁধার ভুবনের পরই হয়তো পাবো সেই আকাঙ্ক্ষিত প্রেম, আকাঙ্ক্ষিত গন্তব্যের দেখা, আমাকে যিনি তৈরি করলেন এতো যত্নে, তিনি কতইনা ভালবাসেন আমাকে! আমি কখন তাঁর সামনে দাঁড়াবো এই ভাবনা আমাকে যতটুকু ভয় পাইয়ে দেয় তার চেয়ে বেশী আনন্দিত উত্তেজিত থাকি আমি। আমার সমস্ত চিন্তা তাকে ঘিরে। এখন আমার কাছে প্রেমের ব্যাখ্যা সম্পূর্ণ অন্যরকম। দৈহিক জৈবিক সাংসারিক প্রেম আমাকে আর টানে না, শুধুই মনে হয় এই গোধূলি বেলায় প্রেম বড়ই ধুসর, সারাদুনিয়া, তার আলো, তার বাতাস সব গোধুলীর ধুসরতায় মিশে একাকার হয়ে যাচ্ছে এর পর আসবে মৃত্যু। তাকে আলিঙ্গন করেই আমি আমার স্রষ্টা কে পাবো। কিন্তু তার সামনে কি নিয়ে দাঁড়াবো, কি করে নিজের ভালবাসা উপস্থাপন করবো এই দ্বিধার দোলাচলে সারাক্ষণ আমি দুলি। আমি এই দ্বিধান্বিত ভাবনা থেকে বের হয়ে একাগ্র চিত্তে তাঁকে ভালবাসতে চাই, তাঁকে আমার ভালবাসা বুঝাতে চাই। এ আমার একান্ত প্রেম সাধন। আমাকে জয়ী হতেই হবে।

ছবি: গুগল