সঙ্গীতে জাগুক প্রাণ…

সুস্মিতা খান

ফেইসবুক এর গরম আড্ডা চালাতে পারেন প্রাণের বাংলার পাতায়। আমারা তো চাই আপনারা সকাল সন্ধ্যা তুমুল তর্কে ভরিয়ে তুলুন আমাদের ফেইসবুক বিভাগ । আমারা এই বিভাগে ফেইসবুক এ প্রকাশিত বিভিন্ন আলোচিত পোস্ট শেয়ার করবো । আপানারাও সরাসরি লিখতে পারেন এই বিভাগে। প্রকাশ করতে পারেন আপনাদের তীব্র প্রতিক্রিয়া।

ছোটবেলায় – অন্য সকল মানুষের মতন – আমার দুই চোখের এবং কানের বিষ ছিল শুক্রবার রাত দশটার ইংরাজী সংবাদের পর “সূধী দর্শক মন্ডলী এখন দেখতে পাবেন উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের অনুষ্ঠান জলসা”। ওইা একটা সময় তাড়াতাড়ি ঘুমাতে যেতে মোটেই খারাপ লাগতোনা, অবশ্য না গেলেও ফলাফল এক। অ্যায়ে অ্যায়ে অ্যায়ে অ্যায়ে অ্যায়ে, ঝিং ঝিং ঝিং, পিড়িং পিড়িং, অ্যায়ে অ্যায়ে অ্যায়ে অ্যায়ে – টিভিতে চলে এগুলো আর টিভির সামনে বসা চারিদিকে খালি ভোঁস ভোঁস ফোঁস ফোঁস আওয়াজ।

এই ঘটনার অনেক অনেক অনেক কাল বাদে ২০১২ সালে শুনলাম – মিলিটারি ময়দানে রাতভর অ্যায়ে অ্যায়ে অ্যায়ে অ্যায়ে অ্যায়ে, ঝিং ঝিং ঝিং, পিড়িং পিড়িং, অ্যায়ে অ্যায়ে অ্যায়ে অ্যায়ে হবে। সেই পিড়িং পিড়িং শোনার জন্য আমার খুব প্রিয় একজন মানুষ দিওয়ানা হয়ে গেলো। কাহিনী কি জানার জন্য আমিও গেলাম। ভাইরে ভাই, টমের মতন কাঠি দিয়েও চোখ খোলা রাখতে পারি নাই। ২০১৩ তে শুনি আবার হবে, প্রিয় মানুষ অটো দিওয়ানা, আমি ভাবলাম যাই দেখি কাহিনী কি। বুদ্ধিমান নেড়ার মতন হেলমেট পড়ে বেলতলায় গেলাম। পিড়িং পিড়িং ভালো না লাগলেও তবলার তেড়ে আসা তেরে-কেটে বোল ভালোই লাগলো। ২০১৪, প্রিয় মানুষ দিওয়ানা, আমি হেলমেট নিয়ে রেডি। গিয়ে ঘটাং করে “ঘাটাম” আর “ম্রিদাঙ্গাম” এর প্রেমে পড়ে গেলাম। ২০১৫ আর ২০১৬ তে আমিও দেওয়ানা। পিড়িং পিড়িং তখনো বুঝিনা কিন্তু তবলার তাল আর ঘটাং করে “ঘাটাম” আর “ম্রিদাঙ্গাম” এ প্রেম বাড়ল। ২০১৭ এর জন্য অপেক্ষা। আচমকা শুনি হবেনা। জানি লোকে “আঁতেল” বলে গাল দিবে তাও বলি – হবেনা শুনে চোখ মুছে ছিলাম। মাস খানিক পরে হবে শুনেও চোখ মুছে ছিলাম। সম্পূর্ণ বিপরীত কারণে। মিলিটারি ময়দান থেকে জনমানুষের আবাহনী মাঠে।

বেঙ্গল ক্লাসিক্যাল মিউজিক ফেস্টিভ্যালের কথা বলছি।

ঢাকা শহরের জ্যাম জগৎ বিখ্যাত। ধানমণ্ডিও এই ঐতিহ্য ধরে রেখেছে। গায়ে গায়ে বাড়ী, গ্যারেজের উপর বিশ্ববিদ্যালয়, উঠানে উঠানে স্কুল আর এক বিল্ডিঙে দুই হাসপাতালের এলাকা ধানমণ্ডিতে আচমকা ৩০,০০০ মানুষ গেলে কি গোল বাঁধে তা নিয়ে চিন্তা ছিল। ধানমণ্ডির সুশীলরাও দেখলাম “আবাসিক এলাকাতে সারারাত গানের পার্মিশান কিভাবে দেয়” এই নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে আলাপ দিলেন। আমি ভাবলাম – এই বুঝি টেঁসে গেলো।

২৬ ডিসেম্বর দুরু দুরু বুকে বদর বদর বলে ধানমণ্ডির দিকে রওনা দিলাম। শামুক গতিতে মানিকমিয়া তারপরে খরগোশ গতিতে আবাহনী মাঠ। ধানমণ্ডির সুশীলরাও দেখলাম “বেঙ্গলরে ট্রাফিক কন্ট্রোল করতে দিলে খারাপ হয়না” আলাপ দিলো। মাঠে পা রেখে মনে হল – একি দেখিলাম, একি হেরিলাম। এটা জাদু ছাড়া কিছু নয়। কোন বাসায় গেলে তাদের বাথরুম যদি পরিষ্কার হয় আমি টেবিলের ধুলা মাপ করে দেই। বেঙ্গলের হাতে পড়ে আবাহনী মাঠে না ছিল ধুলা, না ছিল কাদা, আর বাথরুম ছিল সুবহানআল্লাহ।

এখন বলি কোনটা কোনটা আমার ভালো লেগেছে।

প্রথম দিনে ড. এল সুব্রহ্মণ্যন এবং আসতানা সিম্ফনি ফিলহারমোনিক অর্কেস্ট্রা এর পরিবেশনা। কি অসাধারণ পরিবেশনা। চোখ ফেরানো যায়না, কান সরানো যায়না। মাঝে অনেকে অনেক কিছু করলেন কিন্তু অর্কেস্ট্রা এর পরিবেশনার পরে আমার কানে লেগে রয়েছিলো রাকেশ চৌরাসিয়ার বাঁশি-বাদন এবং পূর্বায়ন চ্যাটার্জির সেতার-বাদন।

দ্বিতীয় দিনের থেকে বেছে নিতে বললে আমি বেছে নিবো বেঙ্গল পরম্পরা সংগীতালয় এর ছোট ছোট বাচ্চাদের তবলা-বাদন; পণ্ডিত শিবকুমার শর্মার সন্তুর-বাদন এবং ওস্তাদ শাহিদ পারভেজ খান এর সেতার-বাদন।

তৃতীয় দিনে আবাহনী মাঠে আগুণ ধরালেন বিদ্বান ভিক্ষু বিনায়ক রাম ও সেলভাগণেশ বিনায়ক রাম এর ঘাটম ও কঞ্জিরা বাদন। ওইরকম কিছু যে কেউ কোনোদিন করতে পারেন তা আমি স্বপ্নেও কোনোদিন ভাবিনি। এখনো পর্যন্ত আমি ওই সময়ের কথা চিন্তা করি আর আমার শরীরে ধুকপুক ধুকপুক করে। রাত শেষে ভোর হল পণ্ডিত অজয় চক্রবর্তীর সাথে – যামিনী হলো যে ভোর, বাঁশি বাজে যোগী আয়।

চতুর্থ দিনের পুরোটা জুড়ে আছেন পণ্ডিত তেজেন্দ্রনারায়ণ মজুমদার এবং ড. মাইশুর মঞ্জুনাথ এর যুগল সরোদ এবং বেহালা-বাদন। রাত শেষে কানে লেগে থাকলো সাসকিয়া রাও দ্য-হাস এর চেলো-বাদন। সবুজ শাড়ি পরে ওলন্দাজ কন্যা সাসকিয়া মঞ্চে এসে বাজালেন রবি ঠাকুর। শাড়ির সঙ্গে দাড়ি বুড়ো। ভালো না বেসে উপায় আছে?

শেষ রাতের পরিবেশনা থেকে আমার কানে লেগে আছে ব্রজেশ্বর মুখার্জির খেয়াল। যতবার তিনি “সাজান” বলে ডেকেছেন আমার মনে হয়েছে আমার ভালোবাসার মানুষটা আমাকে ফেলে চলে যাচ্ছে। আমি কষ্টটা টের পেয়েছি সেই “সাজান” ডাকের। পণ্ডিত হরিপ্রসাদ চৌরাসিয়ার বাঁশি নিয়ে কিছু বলার ক্ষমতা আমার নেই।

অনেক ভালো ভালো কথা বললাম। এখন একটু তেতো কথা বলি। এবং এই তেতো কথার কোনটাই বেঙ্গলের জন্য নয়।

– যারা ভিআইপি কার্ড নিয়ে যান তারা দয়া করে আচরণটা ভিআইপি এর কাছাকাছি রাখেন। গলা ফাটিয়ে গল্প, সেলফি এবং পরচর্চা করার জন্য এতদূরে না গিয়ে নিজের বাড়ির ছাদে সিডি চালিয়ে চেয়ার পেতে এইগুলা করতে পারেন।
– দয়া করে কাপ, গ্লাস, টিস্যু (ব্যবহৃত কিংবা আনকোরা), গামছা, চাদর, শাড়ি, লুঙ্গি, জাঙ্গিয়া বা কোনোকিছু দিয়ে জায়গা রাখবেন না। চেয়ারটা আপনি বাসা থেকে আনেন নাই, বংশানুক্রমেও পান নাই, যেইখান থেকে চেয়ার আনা হইসে সেই ডেকরেটরের মালিকও আপনি না, এইটা আপনার মনে রাখা দরকার। 
– স্পন্সর কোম্পানির কর্মকর্তারা দয়া করে অধীনস্থদেরকে কাপ, গ্লাস, টিস্যু (ব্যবহৃত কিংবা আনকোরা), গামছা, চাদর, শাড়ি, লুঙ্গি, জাঙ্গিয়া বা কোনোকিছু দিয়ে জায়গা রাখার কাজে ব্যবহার করবেন না। এতে আপনার কোম্পানির “৩০০ টাকার বাল্ব ১০০ টাকার” প্রচারের বদলে অপপ্রচারটাই বেশী হয়।
– দয়া করে খামোখা হাঁটাহাঁটি করবেন না। নজর স্টেজ থেকে আপনার স্টাইলিশ বা অনুপস্থিত ব্লাউজের দিকে চলে যায়।

সব কথার শেষ কথা – আমার মতন আলাপে ভোঁস ভোঁস করা মানুষের মনে পিড়িং পিড়িঙের জন্য ভালোবাসা নিয়ে আসার জন্য প্রিয় মানুষ – Kanta আপা – এবং Bengal Classical Music Festival – Bangladesh কে ধন্যবাদ। ধন্যবাদ জানাবো জনাব সুস্মিতাকে (আমি সুস্মিতা হলে স্বামী জনাব সুস্মিতা)। আমি জানি শুধুমাত্র আমাকে ভালোবাসার কারনে আপনি কয়েক বছর যাবত এই পিড়িং পিড়িং সহ্য করে যাচ্ছেন। এই পিড়িং পিড়িং আপনাকে না চাইলেও বাকি জীবন নিতে হবে। বলেন সুম্মা আমিন (তবে আমার ধারনা আপনার এখন এই জিনিস ভালোই লাগে)।

সঙ্গীত জাগায় প্রাণ। সঙ্গীতে জাগুক প্রাণ।

২০১৮ এর উৎসবের অপেক্ষায়।

ছবি: লেখকের ফেইসবুক থেকে