জনপ্রিয়তার আগুন পুড়িয়েছিল তাঁকে

তাঁর গাড়ির দরজা খুলতেই ঝাঁপিয়ে পড়া ভক্তদের ভীড়,কেউ তাঁকে কাঁধে তুলে নিতে চাচ্ছে, কেউ কাঁচি দিয়ে কেটে নিতে চাচ্ছে তাঁর পোশাকের অংশ। হোটেলের দরজায় আছড়ে পড়া মানুষের সমুদ্র, ফ্ল্যাশ লাইটের ঝিলিক, সাংবাদিকদের প্রশ্নের তুফান-এই ভালোবাসা আর উচ্ছ্বাসের কেন্দ্রে থাকা মানুষটা চার্লি চ্যাপলিন, স্যার চার্লস স্পেন্সার চ্যাপলিন।

জনপ্রিয়তার আগুন তাঁকে পুড়িয়েছে বহু বছর। বিব্রত হয়েছেন কখনো, কষ্টও পেয়েছেন ফেলে আসা জীবনের কঠিন প্রান্তের কথা ভেবে। কত স্মৃতি, কত বেদনা ভীড় করে আসতো তাঁর চোখে। হয়তো মনে পড়ে যেতো মার কথা। মা হ্যানা চ্যাপলিন ছিলেন অপেরা গায়িকা। স্বামীর সঙ্গে সম্পর্কের ইতি টানা হয়ে গেলেও পাঁচ বছরের চার্লি ও নয় বছরের সিডনিকে নিয়ে ভালোই ছিলো সুন্দরী হ্যানার পরিবার। কিন্তু ল্যারিঞ্জাইটিসের প্রকোপে ক্রমশ দুর্বল হয়ে আসছিল তাঁর কণ্ঠস্বর।

একদিন স্টেজে গাইতে উঠেছিলেন মা। হঠাৎ গানের মাঝে গলা ভেঙ্গে গেলো।  সরু হয়ে গেল কণ্ঠস্বর।

হাসির রোল পড়ে গেলো দর্শকের সারিতে। কিছুক্ষণের মধ্যে তা পরিণত হল টিটকিরিতে। স্টেজ ছাড়তে বাধ্য হলেন হ্যানা। স্টেজের পাশে দাঁড়িয়ে অবাক চোখে সব দেখছিল চার্লি। উদ্বিগ্ন ম্যানেজার শ্রোতাদের শান্ত করতে ছোট্ট চার্লিকে তুলে দিলেন স্টেজে। গান গাইবে চার্লি। অনেক পরে স্মৃতির পৃষ্ঠা উল্টাতে গিয়ে বলেছিলেন, সেদিন মজাই লেগেছিলো তার। স্টেজে উঠে মনের আনন্দে গান গাইতেও শুরু করেছিলেন। কিন্তু অদ্ভূত কান্ড হলো সেদিন। ছোট্ট চার্লির গান শুনে হাততালির ঝড় বয়ে গেল। স্টেজের উপর পয়সা পড়তে লাগল বৃষ্টির মতো। চার্লি গান থামিয়ে বললেন, ‘‘আমি আগে পয়সা কুড়োব, তার পর তোমাদের গান শোনাব’’। সেই শুনে আরও হাসিতে ভরে গেল হল। সে দিনটাই ছিল চার্লির প্রথম স্টেজ পারফর্ম্যান্স এবং তাঁর মায়ের শেষ।
একবার চ্যাপলিন ঠিক করলেন হলিউডের কোলাহল ছেড়ে ছুটি কাটাতে যাবেন ইউরোপে। তবে আগে যাবেন এক দশক আগে ছেড়ে আসা নিজের শহর লন্ডন। যাত্রার আগের দিনটা ভেবেছিলেন নির্জনে প্যাকিং করবেন। কিন্তু ডাগ ও মেরি আমন্ত্রণ জানালেন তাঁদের ছবি ‘দ্য থ্রি মাস্কেটিয়ার্স’ -এর উদ্বোধনে। কাছের মানুষদের অনুরোধ ফেলতে পারলেন না চ্যাপলিন। গেলেন জনসমুদ্র ঠেলে থিয়েটারে। কিন্তু সেখানে মানুষ আর মানুষ। সবাই দেখতে চায় চার্লি চ্যাপলিনকে। ভিড়ের ঠেলায় তাঁর শখের টুপি ছিটকে গেল। সেটি কুড়োবার জন্য হুড়োহুড়ি লেগে গেল ভক্তদের মধ্যে। তিনি অসহায়ের মতো ডাগ আর মেরিকে খোঁজার চেষ্টা করলেন। লক্ষ মানুষের ভিড়ে তখন তারাও উধাও। তাঁর জামা ধরে টানলেন এক ভক্ত।টানের চোটে ছিঁড়ে ছড়িয়ে গেলো বোতাম। ছিঁড়লো কোট, টাই আর অসহায় কলার। ততক্ষণে পুলিশের হাত থেকে প্রায় তাঁকে ছিনতাই করে নিয়ে কঁধে তুলে উল্লাস শুরু করেছে কিছু মানুষ। চ্যাপলিন অসহায় চোখ মেলে শুধু দেখলেন, এক মহিলা ভক্ত কাঁচি দিয়ে কেটে নিচ্ছেন তাঁর প্যান্টের একটি অংশ! তবে সেদিন মানুষের কাঁধে চড়েই হলের গেটে কাছে পৌঁছে গিয়েছিলেন তিনি। তবে এতো ঘটনার পর মুখের সেই বিখ্যাত হাসিটা কিন্তু মোছেনি সেদিন। আমেরিকার মানুষের পাগলামি হাসিমুখে মেনে নিয়েছিলেন মেগাস্টার।
ছোটবেলায় লন্ডনের রাস্তায় দাঁড়িয়ে চার্লি দেখতেন, তৈরি হচ্ছে বিলাসবহুল রিৎজ হোটেল। আর লন্ডনে পৌঁছে সেই রিৎজ হোটেলেই উঠলেন। বাইরে তখন আজ লক্ষ মানুষ তাঁর অপেক্ষায়। হোটেলের ম্যানেজার নিজে তাঁকে ঘরে পৌঁছে দিয়ে গেলেন। ঘর ভর্তি গোলাপের স্তবক আর শুভেচ্ছাবার্তা। হোটেলের নীচের রাস্তায় পুলিশ জনসমুদ্র সামাল দিতে হাবুডুবু খাচ্ছে।চ্যাপলিন জানালা দিয়ে দেখলেন হোটেলের আশপাশের বাড়িগুলো ঢাকা পড়েছে দৈত্যাকার সব বিলবোর্ডে। সেখানে বড় বড় হরফে লেখা, ‘চার্লি অ্যারাইভস’। বারান্দায় বের হয়ে আসতেই সবাই চীৎকার করে ওঠে- ‘‘গুড লাক চার্লি’’, ‘‘ওয়েল ডান চার্লি’’, ‘‘গড ব্লেস ইউ চার্লি’’। আনমনা হয়ে গেলেন চ্যাপলিন। এত ভালবাসা কি তাঁর প্রাপ্য? জনতার উদ্দেশ্য হাত নাড়লেন তিনি। চুম্বন ছুড়ে দিলেন আকাশের দিকে। ঘরে থেকে নিয়ে এলেন কয়েকটি গোলাপ। একটি ছুঁড়ে দিলেন ভক্তদের দিকে। হুড়োহুড়ি পড়ে গেল সেই গোলাপ কুড়োতে।
এই অসাধারণ অভিনেতার খ্যাতির বিড়ম্বনা নিয়ে এমন অনেক কাহিনী ছড়িয়ে আছে। লন্ডন শহরে নিজের পুরনো থাকার জায়গা দেখতে বের হয়েছেন চ্যাপলিন। মনে হয়েছিলো কেউ লক্ষ্য করবে না। কিন্তু তাই কী হয়! মানুষ ঘিরে ধরলো তাঁকে কেনিংটন রোডে। চ্যাপলিনের স্মৃতির পাড়ায়। সেদিন একটু ভয় পেয়েছিলেন চ্যাপলিন। তিনি একা। জনতার ঢল সামলাবেন কি করে? তখন অস্থির হয়ে রাস্তার এক পুলিশ অফিসারের শরণাপন্ন হলেন তিনি। উৎকন্ঠিত গলায় বললেন, ‘আমি চার্লি চ্যাপলিন। আমাকে লোকে চিনতে পেরে গিয়েছে। এখানে। আমাকে একটা ট্যাক্সি ডেকে তুলে দিন।’
মজার ব্যাপার হচ্ছে সেই পুলিশ অফিসার চার্লি চ্যাপলিনকে সেদিন বলেছিলো, ‘‘চিন্তা করবেন না, মিস্টার চ্যাপলিন। আমি এ পাড়াতেই থাকি। এদের সবাইকে আমি চিনি, সবাই খুব ভাল মানুষ, কোনও ক্ষতি করবে না আপনার।’’ কথাটা শুনে সেদিন থমকে গিয়েছিলেন চ্যাপলিন।বুকের মধ্যে লাগল চ্যাপলিনের। ওই কেনিংটন তো তার স্মৃতির পাড়া। মানুষগুলো তারই প্রতিবেশী। নিজে বড় হয়েছেন এই মানুষদের মাঝেই। সেদিন তাঁর মনে হয়েছিলো সাফল্য মানুষকে ভীতু করে দেয় হয়তো। তারপর সব ভুলে তিনি এগিয়ে গিয়েছিলেন রাস্তায় জমা হওয়া মানুষদের কাছে। সবাই এবার কাছে এসে একে একে হাত মেলালো তাঁর সঙ্গে। সবার মুখে একটাই কথা, ‘শুভেচ্ছা রইলো চার্লি।’ চ্যাপলিন লক্ষ্য করলেন তারা কেউ তাকে ‘মিস্টার চ্যাপলিন’ বলে ডাকেনি। ভালোবাসায় মন ভরে গেলো তাঁর। সেই রাতে পুলিশ অফিসার ট্যাক্সি ডেকে হোটেলে পাঠিয়েছিলেন চ্যাপলিনকে।
লন্ডনে রিৎজে ডিনারের পর চ্যাপলিনের এক বন্ধু মজা করে তাঁকে বলেছিলেন, এই অভূতপূর্ব অভ্যর্থনার পর তাঁর এবার মরে যাওয়া উচিত। খ্যাতির শিখরে থাকাকালীন চলে যাওয়াটাই সেরা মৃত্যু।
চার্লি চ্যাপলিন ১৯৭২ সালে ৮৩ বছর বয়সে যখন অস্কার নিতে মঞ্চে উঠেছিলেন। টানা বারো মিনিট হাততালির ঝড় বয়ে যায় অস্কার মঞ্চে। অস্কারের ইতিহাসে সেটাই ছিল দীর্ঘতম অভ্যর্থনা। আবেগে প্রায় কিছুই বলতে পারেননি সে দিন চার্লি। তারপর ঠিক পাঁচ বছর পর বড়দিনে, ঘুমের মধ্যে পৃথিবী ছেড়ে চলে যান স্যর চার্লস স্পেন্সার চ্যাপলিন।

বিনোদন ডেস্ক
তথ্যসূত্রঃ চার্লি চ্যাপলিনের আত্নজীবনী, আনন্দবাজার পত্রিকা
ছবিঃ গুগল