ভয়…

দীপারুণ ভট্টাচার্য্য

সিকিউরিটির ছেলেটা, “গুড নাইট” বলে দরজা খুলে দিলো, পার্কিং এর শেষ গাড়িটির জন্য। রাত সাড়ে দশটা। বছর শেষ হতে আর কয়েকটা দিন বাকি। অভ্রের গাড়িটা গুরুগ্রামে পথে নামল। হালকা কুয়াশার চাদরে শীত জাপটে ধরেছে অঞ্চলটা। পথে লোক নামমাত্র। অভ্রের সঙ্গের পাঞ্জাবি ছেলেটির নাম মনমিত। তাকে ১৪সেক্টরে নামিয়ে তবে সে গাড়ি ঘোরাবে ফরিদাবাদের দিকে।
মনমিত বলল, “আজ কুচ য়্যাদা হি ফিল হো রাহা হ্যায়। লাগ রাহা হ্যায় বহুত রাত হো গিয়া!”
– “ঠান্ডা হ্যায় না, ইসলিয়ে।”
সকাল সাতটায় বেরিয়ে আজকাল অভ্র রাত নটার আগে চেষ্টা করেও বাড়ি ফিরতে পারে না। কোন কোন দিন মাঝরাত গড়িয়ে যায়। তার উপর রোজ ৮০ কিমি গাড়ি চালানো। রাত হয়ে গেলে অবশ্য সে দিল্লি হয়েই ফেরে। পাহাড়ি রাস্তাটা সব সময় নিরাপদ নয়। একবার রাত দুটোতে ফিরতে গিয়ে সুজনদার গাড়ি খারাপ হয়ে খুব বিপদ হয়েছিল।
মনমিতকে নামিয়ে অভ্র গাড়ি ঘোরায়। এই সময় অনেকেই মদ খেয়ে গাড়ি চালায়। হরিয়ানাতে নিয়ম দিল্লির মত শক্ত নয়। তাই উল্টোদিকের বা পাশের গাড়ি মেরে দিতে পারে যখন তখন। ভয় পেয়ে লাভ নেই, খানিকটা ভাগ্যের উপরে ছাড়তেই হয়।
গাড়িটা এবার পাহাড়ী রাস্তা ধরবে। হালকা কুয়াশার চাদর ঠেলে সা সা করে ছুটে চলেছে গাড়িগুলো। অভ্র চলছে আশির গতিতে। পদোন্নতির কুফল কি এই কাজের চাপ না এটা তার অক্ষমতা! কিসের ভয়ে এই দৌড়, এক সিংহাসন থেকে অন্য সিংহাসনে না শুধুই টিকে থাকার লড়াই! অভ্র বোঝে না। মন অস্থির হলে সে স্বামীজির কথাটা চিন্তা করে, “যার যেখানে কাজ তার সেখানেই মুক্তি।” তবে বাড়িটাকে আজকাল শুধুই শোয়ার জায়গা বলে মনে হয়। রিমার কথা ভেবে কষ্ট হয় অভ্রের। অভিযোগ হীন এক নারী একাই টানছে সংসারটা।
“খুসবু চক” পেরিয়ে একটু গতি বাড়ায় অভ্র। গাড়ির আলোটা কখনো পথে পড়ছে কখনও হারাচ্ছে জঙ্গলের মধ্যে। সামনে কুয়াশা ছাড়া রাস্তায় কিছুই দেখার নেই। ব্যাক মিরার ও অন্ধকার। আরাবল্লি পর্বতের এক বিস্তীর্ণ বাবলা কাঁটার জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে এঁকে বেঁকে চলেছে এই রাস্তা। হঠাৎ একটা ভাবনা তার মাথায় এলো, এই বিরাট অঞ্চলে জুড়ে সে একই রয়েছে এখন, একদম একা! বুকের মাঝখানে একটা অনুভুতি হল অভ্রের।
কোন কোন রাতে ব্যাক মিরারে তাকিয়ে অভ্র একজনকে দেখতে পায়। যেন বাবু হয়ে বসে থাকে পিছনের সিটে, শব্দ হীন। প্রথমদিন তাকে দেখে চমকে উঠেছিল অভ্র। নিজের অজান্তে গাড়িটা নক করতে করতে বন্ধ হয়ে যায়। তবে এখন আর ততটা ভয় নেই। দেখতে দেখতে কেমন যেন গা সওয়া হয়ে গেছে। কখনও কখনও আয়নার মধ্যে দিয়ে অভ্র তাকে দেখতে চেষ্টা করে। সামান্য চোখে চোখ পড়লেই সে চিৎকার করে বলে ওঠে, “এই ব্যাটা, সামনে দ্যাখ”। অভ্র সামনের দিকে তাকায়। এই রাতের সঙ্গীকে চেনেনা সে!
বাবাকে কোনদিন অভ্র গাড়ি চড়াতে পারে নি। তার মনে পড়ে বাবাকে একবার সে সাইকেলে চড়িয়ে হোস্টেল থেকে স্টেশনে পৌঁছে দিয়েছিল। সংসারের হাল যার কাঁধে তাকে সাইকেলে চড়িয়ে এক অনাবিল শান্তি পেয়েছিল অভ্র। জীবনে প্রথম দায়িত্ব নেবার আনন্দ। রাতের যাত্রাতে তেমনই এক আনন্দে কাটে একলা চলার ক্লান্তি।
পালি রোডে ঢুকেই গতি কমে আসে। সামনের ট্রাকটা বড্ড ধীরে চলছে। কিছুদিন আগে খাদ থেকে একটা গাড়ি পাঁচিল ভেঙে নিচে পড়ে গিয়েছিল। পুলিশ যখন গাড়ির ভগ্নাংশ তোলে তখনও তার মধ্যে চারটি নিষ্প্রাণ দেহ। অভ্র দেখেছে। সামনের ট্রাকটা আলো দেখিয়ে পথ দিলো। ওভারটেক করে অভ্র এগিয়ে যায়। পাথরের উপর জুবুথুবু বাঁদর পরিবারকে রুটি দিচ্ছে ট্রাক চালক।
ধীরে ধীরে জঙ্গল ছেড়ে লোকালয়ে ঢোকে অভ্র। মানব রচনা, ওমেক্স, গ্রিনফিল্ড কলোনি পেরিয়ে সে এসে পড়ে জাতীয় সড়কে। রাত বারোটা বাজতে চলেছে। তাই দিল্লি ঢোকার মুখে এখন সারি সারি ট্রাকের ভিড়। খানিকটা এদিক ওদিক করে অভ্র তার কলোনির মধ্যে চলে আসে। রাতের বেলা কলোনির একটাই গেট খোলা থাকে।
ঠান্ডায় কুকুর গুলোও নিস্তেজ। অন্য সময় তারা চিৎকার করতে করতে খানিকটা এস্কর্ট করে দেয়। রাতের মায়া মেখে এখন ঘুমাচ্ছে পাড়াটা। গাড়িটা পার্ক করে একরকম কাঁপতে কাঁপতে বাড়ির সামনে এসে দাঁড়ায় সে। এই বাড়ির তিন তলায় অভ্র ও রিমার সংসার। গেটটা আজও বন্ধ। একতলার পাঞ্জাবি পরিবার রোজ দশটার মধ্যে গেট বন্ধ করে শুয়ে পড়ে। বাইরে থেকে খোলা যায়না বলে রিমাকেই রোজ নীচে আসতে হয়। দোতলায় তামিল পরিবার প্রবল কৃপণ। সিঁড়ির আলোটা আজও বন্ধ। দরজা খুলে অভ্রের টিফিন বাক্সটা প্রায় ছিনিয়ে নিয়ে এক ছুটে উপরে উঠে যায় রিমা। এতো দ্রুত সিঁড়ি ভাঙতে তাকে কখনও দেখেনি অভ্র। গেট বন্ধ করে সে ধীরে ধীরে সিঁড়িতে উঠতে থাকে। সিঁড়ির আলোছায়ার সে বুঝতে পারে রিমা তিনতলার সিঁড়িতে অপেক্ষা করছে।
দোতালার দরজার সামনে দিয়ে ওঠার সময় একটা মৃদু কান্নার শব্দ কানে আসে। যেন কোন মেয়ে গোঙাচ্ছে। দরজার সামনে দাঁড়ায় অভ্র। ভালো করে শুনতে কান পাতে। রিমা কয়েক সিঁড়ি নেমে আসে। হাতের ইশারা করে।
– “শুনছো, নিচের ঘরে কে যেন…”
– “ও থাক তুমি তাড়াতাড়ি উপরে চলে এসো।”
– “ঘরের ভিতর, কে যেন কাঁদছে, শুনে যাও।”
-“সন্ধে থেকেই শুনছি ওটা। তুমি তাড়াতাড়ি উঠে এসো।” রিমার গলায় এতো বিরক্তি কেন, অভ্র জানে না।
– “একটু খোঁজ নেবো না…”।
– “কাদের খোঁজ নেবে তুমি; আঙ্কেলরা এক সপ্তাহ হলো দেশে গেছে।”
হঠাৎ পা দুটো অসম্ভব ভারী লাগে অভ্রের। তার হাতটা আঠার মতো আটকে আছে দরজার হাতলে। কিন্তু এখনও তাকে অনেক গুলো সিঁড়ি চড়তে হবে।

ছবি: গুগল