পরবাসে বাংলার এই জয়গান আমাকে ছুঁয়ে যায়

স্মৃতি সাহা

জানুয়ারির শুরু। তীব্র শীত প্রকৃতিতে লিখতে শুরু করেছে শীতের বন্দনা। প্রকৃতি যেন মরিয়া হয়ে উঠেছে শীতের নানারঙের ছবি আঁকতে। শীতের অসহনীয়তা এত প্রকট যে তা নির্দ্বিধায় মন আর মননকে করে তুলছে জড়। জানুয়ারির সকালগুলোতে সে সূরযের দেখা পাওয়া খুব সৌভাগ্যের ব্যাপার। মেঘের পসরা সাজিয়ে আকাশ যেন মেঘের ক্যানভাস। যে ক্যানভাসে ধুসর রঙের পরতে পরতে মন খারাপের গল্প বিহ্বল করে দেয় প্রতি মুহূর্তে। ঘরের ঘুলঘুলি পেরিয়ে সেই ধুসর মেঘের ছায়া পড়ে মনেও! তবে সেই ধূসরতা মনে নিপাট ভাজে সিন্দুক বন্দী করেই শুরু হয়ে যায় আমার আটপৌরে দিনের পাঁচালী। সেই ছেলেকে ঘুম থেকে তোলা, স্কুলের জন্য তৈরী করা, সকালের জলখাবার বানানো ঠিক যেন জীবনজুড়ে একঘেয়েমির অনবদ্যতা।

তবে এর মাঝেও মনে আঁকতে থাকি পেরিয়ে আসা সময়ের সাদাকালো স্কেচ। পাঁচফোড়নের সব্জীর সুবাস যখন হেঁশেলে বাতাস হয়ে ভাসতে থাকে তখন তাতে কেমন যেন মায়ের গন্ধ পেয়ে যায় এ মন। মনের ক্যানভাসে তখন মায়ের স্কেচ, বিবশ করে আমাকে। আমি তখন পৌছে যাই কয়েক হাজার মাইল পেরিয়ে মায়ের কাছে। সময় থমকে যায় আমার হেঁশেলের! আমি গিয়ে দাঁড়াই জানালার পাশে, আকাশমুখী দু’টি নিঃস্ব হয়ে যাওয়া ম্যাপল গাছ আমার দৃষ্টি আটকে দেয়। আমি ওদেরকে এড়িয়ে আকাশে চোখ মেলতে পারি না, পারি না ধুসর মেঘের রাজ্যের কল্পকথায় চোখ জুড়াতে। আমি তাকিয়ে থাকি ম্যাপল গাছ দু’টোর দিকে, ক’দিন আগেও গাছজুড়ে পান্না সবুজের স্নিগ্ধতা অনাবিল জীবনের গল্প শোনাতো আমায়, আর এখন শুধুই অভিমানের গল্প সেখানে। চোখ সরিয়ে নেবো ঠিক এমন সময় অবশিষ্ট একটি দু’টি পাতা খসে পড়ে, উড়তে উড়তে আমার জানালার খাঁজে এসে আটকে পড়ে। কি ভেবে জানালার কাঁচ সরিয়ে পাতা দু’টো হাতে ধরি আর অদ্ভুতভাবে পাতারা যেন কথা বলে ওঠে! বলে,” প্রকৃতির নিয়ম সব সময়ের সৃষ্টি করা। আমরা ঝরে যাই কারণ সৃষ্টির শৈল্পিকতায় আমাদের অবদান শেষ , এরপর প্রকৃতিজুড়ে শ্বেতশুভ্র শ্বেতকাঞ্চন আভা ছড়াবে, সেখানে আমাদের সবুজ যে বড় বেমানান!” আমার মনের ধূসরতা পাতা দু’টোয় ভাসিয়ে আমি আবার দৈনন্দিকতায় ফিরি। নতুন উদ্যমে প্রাত্যহিকে মন দিই।  ছেলে আর কর্তা স্কুল, অফিসের জন্য বেরিয়ে গেলে আমার কিছুটা অলস সময়। আর সেই সময়ের মোক্ষম ব্যবহার কর‍তে মেয়েকে নিয়ে পৌঁছে যাই বাড়ির পাশের পাবলিক লাইব্রেরীতে। আমার সৌভাগ্য লাইব্রেরীর একটি বড় অংশ জুড়ে আছে বাংলা ভাষার বই। প্রথম যেদিন আমি এই পরবাসে আপন বর্ণমালার পসরা পেয়েছিলাম সেই সময়ের অনুভূতি ঠিক ভাষায় বোঝাতে পারবো না! আর সেই দিন থেকে সময় পেলেই আমি ছুটে যায় সেই লাইব্রেরীতে। পছন্দমত একটি বই আর এক পেয়ালা কাপুচিনো নিয়ে বসে যাই লাইব্রেরীর ক্যাফেতেই। বইয়ের কালো কালো অক্ষরে লিখতে থাকি একান্ত নিজের সময়টুকু প্রায় বেহিসেবি ভাবে!! বেশকিছু সময় লেখকের লেখার সঙ্গে নিজের কল্পজগতের বিচরণ শেষ করে ছেলে আর আমার জন্য একগুচ্ছ বই নিয়ে ঘরে ফিরি।

এবার বলি নিউইয়র্কে বাংলাভাষাভাষীদের কথা। নিউইয়র্কে তাদের গুরুত্ব অভূতপূর্ব! নিউইয়র্কের বেশকিছু পাবলিক স্কুলে বাংলা ভাষাকে একটি বিষয় হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এমন কি নিউইয়র্ক বোর্ড অফ এডুকেশনে যে কোন নির্দেশিকা পর্যন্ত বাংলায় পাওয়া যায়। আর নিউইয়র্কের স্কুলগুলোতে বাঙালী ছাত্রছাত্রী সব সময় উল্লেখযোগ্য ভাবে ভাল করছে। নিউইয়র্ক সিটির প্রায় সব সরকারী চাকুরীতে বাংলাভাষীদের বলতে গেলে একচ্ছত্র অবস্থান দেখা যায়!! নিউইয়র্কের লাগোডিয়া কলেজে স্থায়ীভাবে তৈরী হচ্ছে শহীদ মিনার। সত্যি বলতে নিউইয়র্ক কে বাংলা জয় করেছে প্রায় সব অর্থেই। আর বাঙালি হয়ে পরবাসে বাংলার এই জয়গান আমাকে উদ্বেলিত করে খুব। আমি গর্বিত হই যখন কোন ভিনদেশী আমাকে বলে, ” ইওর নেটিভ ল্যাঙ্গুয়েজ ইজ ভেরী সুইট, ইউ পিপল আর ভেরি রিচ ইন লিটারেচার।” আমি মাথা নেড়ে মুখে হাসি ছড়িয়ে চোখের জল আড়াল করে বলি,” ইয়েস, উই আর!” একটা ছোট্ট ঘটনা বললেই বোঝা যাবে নিউইয়র্কে বাংলার অবস্থান। আমার ছেলের স্কুলে কিছুদিন আগে হয়ে গেল “বেঙ্গলী কালচারাল ডে”। সেদিন অডিটোরিয়ামে বিভিন্ন দেশের বাচ্চারা যখন “আমার সোনার বাংলা” গেয়ে অনুষ্ঠান শুরু করলো তখন আমার চোখ ভিজে উঠছিলো বারবার!! সাদা, তামাটে, পিচ বর্ণের সবাই একসঙ্গে গাইছে আমার জাতীয় সংগীত। দাঁড়িয়ে আছে আমার পতাকাকে সম্মান জানিয়ে! এ সময়ের অনুভূতি শুধু অনুভূত হয়, ভাষায় বর্ণিত করা যায় না।

ছবিঃ গুগল