মেয়েরা প্রেমের চিঠি লেখে না

প্রেমপত্র নিয়ে এক সময় আলোচনার অন্ত ছিলো না। এখন হাতের আঙুলের ডগায় মোবাইল ফোন আর ইন্টারনেট। যন্ত্রের আগ্রাসনে প্রেমপত্র কবে প্রেমিক-প্রেমিকাদের পাড়া ছেড়ে পালিয়েছে। কিন্তু বছর তিরিশ আগেও প্রেমপত্রের জয়গানে মুখর ছিলো মানুষ। প্রেমপত্র লেখেনি এমন বাঙালী পুরুষ অথবা নারী বোধ হয় খুঁজে পাওয়া যাবে না। আর শুধু বাঙালী-ই বলছি কেনো, সম্রাট নেপোলিয়ন থেকে শুরু করে পৃথিবী বিখ্যাত পুরুষেরা প্রেমপত্র লিখেছেন। সেইসব চিঠি আজো তোলপাড় করে রেখেছে ইতিহাসের গলি, রাজপথ। কিন্তু তোলপাড় করা প্রেমের চিঠির গল্পে নারীদের লেখা প্রেমপত্র নেই কেনো? তল্লাশী চালিয়ে বিখ্যাত নারীদের লেখা প্রেমপত্রের নমুনা খুব বেশী পাওয়া গেলো না। তাহলে কি নারীরা প্রেমপত্র লেখে না? নাকি তাদের প্রেমপত্রের গুণগত মান যথার্থ মূল্য অর্জন করতে ব্যর্থ হয়েছে ইতিহাসের পৃষ্ঠায়?

প্রাণে বাংলায় এবারের প্রচ্ছদ আয়োজন নারীদের লেখা প্রেমপত্র নিয়ে।

কোনো নারী ভালোবাসার চিঠি লেখেনি এমন বক্তব্য মেনে নেয়া কঠিন। কাঁচা অথবা পাকা হাতে লেখা যাই হোক না কেনো নারী যুগ যুগ ধরেই প্রেমপত্র লিখেছে। পুরুষের ভালোবাসার প্রস্তাবের চিঠির জবাবে তাদের লেখা পত্রও পৌঁছেছে ভালোবাসার ঠিকানায়।কিন্তু সেসব চিঠি বলা যেতে পারে আলোচনায় বিস্তারিত নয়।

রবীন্দ্রনাথের লেখায় আছে ‘‘প্রেম আমাদিগকে ভিতর হইতে বাহিরে লইয়া যায়, আপন হইতে অন্যের দিকে লইয়া যায়, এক হইতে আরেকের দিকে অগ্রসর করিয়া দেয়। এইজন্যই  তাহাকে পথের আলো বল’’। তবে সেই পথের আলোর মতো ভালোবাসা কি নারী পুরুষকে দেখায়নি? প্রশ্নের উত্তর হচ্ছে, অবশ্যই দেখিয়েছে। ভালোবাসার চিঠির উত্তরে তারা চিঠি লিখেছে। প্রকাশ করেছে তাদের ভালোবাসার একান্ত নিজস্ব প্রতিক্রিয়া।

প্রেমপত্রের ইতিহাস বলে নেপোলিয়ন, স্যার উইনস্টন চার্চিল, বিটোফেন, মোৎসার্ট, জন কিটস, অস্কার ওয়াইল্ড, কাফকাসহ এমনি আরো সব বিখ্যাত মানুষদের প্রেমপত্রের গল্প এখনো আলোচনার টেবিলে গরম গরম পরিবেশিত হয়। কিন্তু সেই আলোচনায় নেই বিখ্যাত নারীদের প্রেমপত্র।পুরুষ কি তাদের প্রেমপত্রের জয়গান ধরে রাখতে নারীর সেইসব আবেগাক্রান্ত চিঠিগুলোকে ছায়ার ভেতরে ঠেলে দিতে চেয়েছে কিছুটা? এমন প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছে অনেক আলোচনায়। সম্প্রতি একটি মার্কিন পত্রিকায় চিঠি বিষয়ের আলোচনায় উত্থপিত হয়েছে এই প্রসঙ্গ। সেখানে ইঙ্গিত করা হয়েছে, পুরুষরা তাদের দ্বিতীয় অথবা আরো অনেক প্রেমে জড়িয়ে যাবার কারণেই সম্ভবত অতীতের ভালোবাসার মানুষটির চিঠিকে ধামাচাপা দিতে চেয়েছে।

বিজ্ঞানী মেরি কুরি জীবনে প্রেমপত্র তৈরী করেছিলো জটিলতা।পৃথিবী বিখ্যাত এই নারী বিজ্ঞানী স্বামী পেরির মৃত্যুর পর জড়িয়ে পড়েছিলেন তরুণ বিজ্ঞানী পল ল্যাংভিনের সঙ্গে। গভীর সেই ভালোবাসা ছিলো গোপন। কারণ মেরী কুরির মতো বিজ্ঞানীর প্রেম মানেই তো সংবাদের বিষয়। আড়াল বজায় রেখে দুই বিজ্ঞানীর প্রেমের তরণী তরতর করে এগিয়ে চলছিলো। মেরী কুরি সেই তরুণ প্রেমিককে নিয়মিত চিঠি লিখতেন। সেইসব প্রেমময় সংলাপের উত্তরও আসতো পলের কাছ থেকে। কিন্তু পল ল্যংভিন ছিলো বিবাহিত। তার স্ত্রী জেনে ফেলে স্বামীর ভালোবাসার অস্তিত্ব। এক পেশাদার চোরকে টাকা দিয়ে স্ত্রী চুরি করায় পল ল্যাংভিনকে লেখা কুরির ভালোবাসার চিঠি।পরের ইতিহাস আরো বিব্রতকর। ল্যাংভিনের স্ত্রী রেগে গিয়ে কুরির লেখা সব চিঠি প্রকাশ করে দেয় একটি ট্যাবলয়েড পত্রিকায়। সমালোচনার ঝড় ওঠে কুরিকে নিয়ে।তখন পরিস্থিতি এমন জায়গায় গিয়ে ঠেকেছিলো যে, সে বছর সুইডিশ একাডেমী দ্বিতীয়বার কুরিকে নোবেল পুরস্কার নিতে আসতে প্রায় নিষেধ করেই দিচ্ছিলো।মেরি কুরিও সংশয়ে পড়ে গিয়েছিলেন পুরস্কার গ্রহণের ব্যাপারে। পরে আইনস্টাইনের পরামর্শে তিনি পুরস্কার নিতে হাজির হন।

খ্যাতিমান নারীর লেখা প্রেমের চিঠি নিয়ে এমন ঘটনার দৃষ্টান্ত ইতিহাসে কম চোখে পড়ে। সাধারণ যে কোনো নারীর প্রেমের চিঠির তো প্রকাশ্যে আসার সম্ভাবনাই নেই। তাহলে বিখ্যাত সব ভালোবাসার চিঠি লেখার কৃতিত্ব হয়ে থাকবে একান্তই পুরুষের? নাকি এমনটিই পুরুষ শাসিত সমাজে প্রধান্য কেড়ে নেয়ার পন্থা?

নারীদের চারটি প্রেমের চিঠির মধ্যে তিনটাই ছেঁড়া। শুধু ১৮৪৫ সালের জানুয়ারী মাসে লেখা চিঠির মর্ম উদ্ধার করা গেছে পরবর্তী সময়ে। সেই চিঠিতে নারীটি লিখছেন, ‘‘আমি যখন ব্রাসেলসে আপনার ছাত্রী ছিলাম তখন আপনি আমার প্রতি সামান্য একটু আগ্রহ দেখিয়েছিলেন। আমি আজও সেই আগ্রহটুকুকে অবলম্বন করে আছি। যেভাবে অবলম্বন করে আছি জীবনক’’।এই কাতর চিঠিটা লিখেছিলেন ‘জেন আয়ার’ উপন্যাসের লেখিকা শার্লট ব্রন্টি তাঁর অধ্যাপক কনস্টান্টিন হেজারের উদ্দেশ্যে। অধ্যাপক হেজার ব্রন্টি আর তাঁর বোন এমিলিকে স্কুলে ফরাসী ভাষা পড়াতেন। বয়সে অনেক বড় সেই অধ্যাপকের প্রেমে পড়েছিলেন ব্রন্টি। আর তাই জন্ম নিয়েছিলো এইসব পাগলপারা চিঠি।তবে সেই কঠোর হৃদয় অধ্যাপক অবশ্য ছাত্রীর প্রেমের আহ্বানে সাড়া দেননি।

জুলিয়েট ড্রুয়েট

শার্লট ব্রন্টি

যেটুকু জানা যায়, এরকম বিখ্যাত নারীদের প্রেমপত্র সবসময়ই বিষন্নতা আর বেদনায় পূর্ণ। প্রেমিকের উপেক্ষার প্রান্তে দাঁড়িয়ে তারা লিখেছেন প্রেমময় চিঠি। এমনি অনেক চিঠি লিখেছিলেন প্রখ্যাত কবি টি.এস এলিয়টের স্ত্রী ভিভিয়েন। ভিভিয়েনকে এলিয়টের সাহিত্যিক বন্ধুরা বলতেন ‘ওমেন অফ রিভার’। মানসিক স্থিতি হারিয়েছিলেন ভিভিয়েন। গবেষণা বলে, এলিয়টের উপেক্ষাই তাঁকে ঠেলে দিয়েছিলো বিষাদের আাঁধারকোণে। তাই এলিয়ট যখন অন্য নারীর প্রেমে মশগুল হয়ে ছিলেন তখন ভিভিয়েন কবিকে লিখেছিলেন প্রেমপত্র। সেসব চিঠি সাহিত্যের গবেষণায় এতোদিনে আলোর মুখ দেখেছে।

ভিক্টর হুগোকে প্রায় ২০ হাজার প্রেমপত্র লিখেছিলেন জুলিয়েট ড্রুয়েট! চমকে ওঠার মতো কথাই। কিন্তু ইতিহাস বলছে তথ্য সঠিক। পেশায় অভিনেত্রী জুলিয়েট প্রেমে পড়েছিলেন হুগো‘র। ১৮০০ সালের মাঝামাঝি শুরু হয় তাদের প্রেমপর্ব। চলতে থাকে পত্র বিনিময়। এমনিই প্রেমে ডুবেছিলেন জুলিয়েট যে শেষে নিজের পেশাই ছেড়ে দিয়ে ভিক্টর হুগোর সঙ্গে বসবাস করতে শুরু করেন। হুগো শ্যানেল আইল্যান্ডে অজ্ঞাতবাস নিলে জুলিয়েট তাঁকে এই চিঠিগুলো লেখেন।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নিজে প্রচুর চিঠি লিখেছিলেন। তবে সেগুলো প্রেমপত্র নয়। প্রেমে উন্মাতাল হয়ে চিঠি লিখতেন কাজী নজরুল ইসলাম। কিন্তু যাদের লিখতেন তারা সেসব চিঠির উত্তরে কি লিখেছিলেন তার হদিস পাওয়া যায়নি কখনোই। আর রবীন্দ্রনাথের কাছে নারীদের চিঠি? ভালোবাসার নিবেদন? এমন বহু চিঠি কবি গ্রহণ করেছেন। কিন্তু সেসব ছিন্নপত্রের দিশা আমরা খুব একটা পড়তে পাইনি।কবি শঙ্খ ঘোষের‘ নির্মাণ আর সৃষ্টি’ বইটা ঘাঁটতে গিয়ে হঠাৎ চোখে পড়লো রবীন্দ্রনাথকে লেখা এক নারীর আকূল শব্দাবলী। কেমন ছিলো সেই নিবেদনের ভাষা? স্পেন দেশ থেকে সেই এক বিদেশিনী লিখছেন, ‘এই চিঠি যে তোমাকে লিখছি আমি, আমার স্বামীকে তা জানাবো না। কেননা উত্তর যদি না পাই তবে সমস্ত হতাশা আর বিষাদ কেবল আমারই জন্য রেখে দিতে চাই; আর পেয়ে যাই যদি উত্তর, তবে তা আনন্দ তখন ভাগ করে নেব দুজনে।’

এই বিদেশিনীর স্বামী ছিলেন স্পেনের বিখ্যাত কবি হুয়ান রামোন হিমেনেথ। আর জিনোবিয়া ছিলেন হিমেনেথের স্ত্রী। কিন্তু মজার ব্যাপার হচ্ছে এই চিঠির উত্তর দেননি রবীন্দ্রনাথ। শুধু এই চিঠি কেনো, জেনোবিয়া তাঁর পরের চিঠিগুলোরও উত্তর পাননি। সেই নারী কি তাহলে কবিকে বোঝাতে পারেন নি তার সেই স্বতন্ত্র্য, গাঢ় অনুরাগ?তবে প্রণয় প্রকাশের জন্য রবীন্দ্রনাথের কথা সাহিত্যের চরিত্ররা কিন্তু আশ্রয় নিয়েছে চিঠির। আর সেখানে নারীরাই চিঠি লিখেছে প্রেমে অথবা অপ্রেমে। ‘চোখের বালি’ উপন্যাসের বিনোদ বৌঠান তার ভালোবাসার ঠাকুরপোকে লিখেছিলো, ‘‘ঠাকুরপো, ভয় করিয়ো না, আমি তোমাকে প্রেমের চিঠি লিখিতে বসি নাই। তুমি আমার বিচারক, আমি তোমাকে প্রণাম করি। আমি যে পাপ করিয়াছি, তুমি তাহার কঠিন দণ্ড দিয়াছ; তোমার আদেশমাত্র সে দণ্ড আমি মাথায় করিয়া বহন করিয়াছি। দুঃখ এই, দণ্ডটি যে কত কঠিন, তাহা তুমি দেখিতে পাইলে না। যদি দেখিতে, যদি জানিতে পাইতে, তাহা হইলে তোমার মনে যে-দয়া হইত তাহা হইতেও বঞ্চিত হইলাম। তোমাকে স্মরণ করিয়া, মনে মনে তোমার দুইখানি পায়ের কাছে মাথা রাখিয়া, আমি ইহাও সহ্য করিব…এইটুকু দুঃখের কথাই জানাইলাম। আর যে-সব কথা মনে আছে, বলিবার জন্য বুক ফাটিয়া যাইতেছে, তাহা তোমাকে জানাইব না প্রতিজ্ঞা করিয়াছি–সেই প্রতিজ্ঞা রক্ষা করিলাম।

তোমার

বিনোদ-বোঠান।’’

প্রশ্ন উঠতেই পারে লেখার দর্পনে রবীন্দ্রনাথ কার মুখ দেখেছিলেন? নিজের জীবনে ঘটে যাওয়া অনেক নিভৃত, গোপন ঘটনার ছিটেফোঁটা কি এসব লেখার মধ্যে উঠে আসেনি?

সম্প্রতি ইংল্যান্ডের এক গবেষণা প্রতিষ্ঠানের গবেষণায় দেখা গেছে সেখানকার ৭৭ শতাংশ নারী প্রেমপত্র পেতে পছন্দ করেন। তারা সেসব চিঠির উত্তর দিতেও ভালোবাসেন। কিন্তু শেষ পর্য্ন্ত ই-মেইল আর মেসেঞ্জারের যুগে তাদের চিঠি পাওয়ার সৌভাগ্য হয় না। মিতালি করতে হয় কবি সুনীল গঙ্গোপাধ্যাযের ‘সাদা পৃষ্ঠা তোমার সঙ্গে’।

এমন কত যে সাদা পৃষ্ঠার অপমৃত্যুর গল্প ঘুরেফিরে আসে মনের বারান্দায়। জানাচেনা কত নারী চিঠি লিখে গেছেন তাদের প্রেমিকের উদ্দেশ্যে। সে চিঠি হয়তো পৌঁছেছে নিদিষ্ট ঠিকানায়। তারপর? তারপর সব গোপনীয়তার সিন্দুকে বন্দী। হয়তো সেসব চিঠি কোনো এক কালে ডাকবাক্স পর্য্ন্ত যেতেই পারেনি।

নারীবাদী বৃটিশ নারী গ্রেমিয়ান গ্রি ১৯৭৬ সালে তার প্রেমিকের উদ্দেশ্যে লিখেছেন ৩০ হাজার শব্দের প্রেমপত্র। কিন্তু সে চিঠি কোনোদিন ডাকবাক্সের আনুকূল্যই পায়নি। পোস্টই তো করেননি তিনি চিঠিটা।কারণ প্রেমিক উপন্যাসিক মার্টিন এমিস তখন আরেক লেখিকা জুলি কাভাংয়ের প্রেমে মত্ত। অতিসম্প্রতি সেই চিঠিটির কিছু অংশ ইংল্যান্ডের পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে।

নারীদের প্রেমের চিঠির সলিল সমাধি অথবা পাদপ্রদীপের আলোয় অনুপস্থিতির গল্পটাই  সত্যি।নারীরা প্রেমের চিঠি লিখেছেন, চিঠির উত্তরও দিয়েছেন। তবে সেসব চিঠি হারালো কোন বসন্তের হাওয়ায়?

ইরাজ আহমেদ
তথ্যসূত্রঃ ইন্টারনেট
ছবিঃ গুগল