শীতের শব্দে ঘুম আসে না…

ইকরাম কবীর-গল্পকার

ওই সকালটুকুই শুধু। পাখি ডাকারও আগে, তারপর সূর্য তার পূর্ণ অবয়বে নিজেকে সঁপে দিয়ে যখন ধরনীর বুকে উত্তাপ ছড়াতে থাকে, ওই পর্যন্তই।এটুকু সময় শহরের বাতাসের একটি হিম-হিম স্পর্শ থাকে।ইট-কাঁচের জানালার ধারে বসলে শীতের ছোঁয়া একটু বোঝা যায়। ধারণা করা যায় যে ইচ্ছে থাকলেও নিজরূপে আসতে পারছেনা। তবে কয়েক দিনের জন্যে আসবে তা বোঝা  যায়।সারা বছর রৌদ্রতাপে পুড়ে এ শহরের মানুষ তারই অপেক্ষায় থাকে।

দেরীতে হলেও আসে। তবে শহরের শীতের কোন শব্দ থাকেনা; শুধু হিম-ঠান্ডা থাকে। শহরতলীতে বা শহরহীন পরিবেশে শিশিরের একটি প্রকান্ড চাদর যখন সারারাত নিজেকে লোকালয়ে বিছানোর জন্যে জমিনে নেমে আসে, তখন শীতাচ্ছন্নতার একটি শব্দ হতে থাকে।ঠিক তখনই মেঠো-রেলপথ দিয়ে একটি রেলগাড়ি হুস-হুস করে ঘন কুয়াশা ভেদ করে হুইসেল দিতে দিতে গড়গড়িয়ে যায়, তখন একটি অন্য রকম আবহ তৈরী হয়।এ চিত্রটি ঠিক বলে বোঝানো যায়না।

মনে পড়ে শহরের বাইরে থাকার দিনগুলোর কথা।সেই কবেকার কথা।কতদিনআগে!শীত নিয়ে মায়ের ব্যস্ততা শুরু হত সেই জুলাই মাসের গোড়া থেকেই। চলে যাওয়া বছরের সোয়েটারগুলো আর তাঁর সন্তানদের গায়ে লাগবে না। নানা কাজের ফাঁকেই চলতো তাঁর ছেলে-মেয়ের জন্যে সোয়েটার বোনা। গেল বছরের গরম কাপড়গুলো তাঁর বাড়ির কাজে সহকারীদের সন্তানদের দিয়ে দেবে সে। সেপ্টেম্বর নাগাদ তাঁর বেশ কয়েকটি বোনা হয়ে যেত। সেই মাসেই সে শুরু করতো ফ্লানেলের কাপড় কেনা। সেপ্টেম্বর-অক্টোবর তাঁর ছেলে-মেয়েদের ফ্লানেলের তৈরী জামা পড়েই চলে যাবে।

বাবা কাপড় কিনে আনলে, মা আমাদের মাপ নিয়ে বসে যেত সেলাই করতে। বেশিরভাগ সময় দুপুরে আর রাতে। সেলাই মেশিনে একটা ঘুট-ঘুট শব্দ হয়।পড়াশোনা শেষ করে আমরা সবাই গোল হয়ে তাঁর পাশে বসে থাকি।তাঁর মেশিনের শব্দটি বন্ধ জানালা দিয়ে বেরুতে পারে না।পারলে, ওই রেলের শব্দের সঙ্গে মিলে আরো একটি অন্যরকম শব্দের সৃষ্টি হতে পারতো।

মায়ের সেলাই চলে, আমরা বসে থাকি চারপাশে গোল হয়ে।ফ্লানেলের কাপড় তৈরী হলে চেহারা-ভরা সুখ নিয়ে গলিয়ে দেয় আমাদের গায়ে।তাকিয়ে থাকেন তাঁর ছেলের দিকে, মেয়ের দিকে।সেই সুখ-সুখ চাউনির তুলনা নেই।মা সুখে তাকিয়ে থাকে আর আমরা বেরিয়ে যাই উড়তে-উড়তে মায়ের তৈরী জামা পরে।তাঁর বানানো পোষাক গায়ে গলিয়ে খেলতে যাওয়া আমাদের জন্য তীর্থযাত্রা। কোন ঠান্ডাই আর আক্রমন করতে পারে না।মা গায়ে কাপড় চড়িয়ে দিয়েছে।

ফ্লানেলের কাজ পার করে মা বসে সোয়েটারগুলোতে শেষ স্পর্শ দিতে।শেষের বুনোনগুলো বেশ ধীরে-ধীরে করতে হয়।একেবারে ছোট বোনকে সোয়েটার গায়ে চড়িয়ে, তারপর আরো বড়দের দিকে মন দেয় সে।এক-এক করে সব শেষ হলে মা আমাদের বাবার সোয়েটার নিয়ে ব্যস্ত হয়।বাবার সোয়েটারটি বুনতে অনেক সময় লাগে।তাঁরটিই সবচেয়ে ভাল বুনতে হবে।বাবাকে কেন যেন আমাদের চেয়েও বেশী ঘন-ঘন কাছে ডাকেন মাপ নেয়ার জন্য।তখন বুঝতামনা।আজ এতো বছর পর বুঝি বাবার কাছে ঘেঁষার কারন।আমি ভাবতাম, বাবা’তো বড় হচ্ছেন না, শরীরেও বাড়ছেন না, তাঁর জন্যে কেন বছর-বছর শীতবস্ত্র মা বানাবে? এটিও তখন বুঝিনি, এখন বুঝি।

আমার ছেলেবেলায় আমার পরিবারের শীতের ব্যাস্ততা এমনই ছিল।

আমাদেরকে নিয়ে আমারদের বাবা-মা বাস করতেন ঝিনাইদাহ মহকুমার একটি গ্রামের মাঝে।তাকে গ্রাম বললে একটু ভুল হবে।ঝিনাইদহ ক্যাডেট কলেজের ক্যাম্পাসে।গ্রামের মাঝে একটি ফুটফুটে শহর-রূপীগ্রাম।গ্রামের সব আচরণই সেই ক্যাম্পাসে  ছিল।চারদিকে সবুজ আর সবুজ।তার মধ্যে সাদা ও হলুদ বাসভবন।আমাদের বাড়ির রঙ ছিল হালকা হলুদ।ক্যাডেটরা থাকতো খালের ওপারে – সাদা রঙের হাউসগুলোতে।

এপার থেকে কুয়াশাচ্ছাদিত ভোরে তাদের হাউসের দিকে তাকালে সবকিছু ঝাপসা লাগতো।কুয়াশা ভেদ করে তাদের অবয়ব চোখে পড়তো।আমার মা সেই পাখি-ডাকা ভোরে আমায় নিয়ে খালের পাড়ে ক্যাডেটদের দেখাতে নিয়ে যেত।ঘুম-ঘুম আমি।আমার ভাই-বোনেরা তখনও ঘুমুচ্ছে।মা’র সঙ্গে আমি এপারে।বাবা হয়তো গিয়েছেন সাইকেল চড়ে ডিউটি মাস্টারের কাজ করতে। তিনি গিয়েছেন ক্যাডেটদের সময়মত ঘুম থেকে তুলতে আর ঘন কুয়াশার মাঝে পিটি বা প্যারেড করানোর জন্য সারিবদ্ধ করে দাঁড় করাতে।

বাবা যখন সেই ভোরে সাইকেল চেপে ক্যাডেটদের হাউস-পানে ছুটে যেতেন তখন আমি বুঝতামনা কিসের টানে তিনি যাচ্ছেন – তাও’বা এই ঝিনাইদাহ’র  ঠান্ডাকে উপেক্ষা করে।

শীতে লোকালয়ের কৃষক চাচা-কাকা’রা ক্ষেতে ছোলা বুনতেন।ক্যাডেট কলেজের পশ্চিম পাড়ে কুষ্টিয়া-ঝিনাইদাহ বড়-রাস্তার ওপারেই ছিল ক্ষেত।সবই ছিল।ঋতুভেদে বিভিন্ন ফসল।পাট, আঁখ, বেগুন – আরো কত কি! তবে শীতে সরিষা আর ছোলা। একদিকে হলুদ রঙ!আরেক দিকে ঘনসবুজ। কাঁচাছোলার গাছ দেখতেই অন্যরকম। সন্ধ্যার ঠিক আগে-আগে। কৃষকচাচা-কাকা’রা তখনো ক্ষেত থেকে বাড়ি ফিরে যাননি। তাঁদের সায় নিয়েই কয়েক গোছা ছোলার গাছ উপড়ে এনে, আইলের ওপর রেখে, আশ-পাশ থেকে খড় যোগাড় করে, আগুন দিয়ে, মিনিট-খানেক পুড়িয়ে তাড়াহুড়ো করে নিভিয়ে ফেলা।

সে এক অভিজ্ঞতা!

তারপর একটা-একটা করে খোসা সরিয়ে সিদ্ধ কাঁচা ছোলা টপ্-টপ্ করে মুখে ভেতর ছুঁড়ে দেয়া। ততক্ষনে কুয়াশার কম্বলের ঝাঁপি দপ্ করে মাথার ওপর নেমে এসেছে। এখন বাড়ি ফিরে যেতেই হবে। মায়ের বকুনি খাওয়া যাবে না। প্রকৃতিই আমাদের মায়ের আদুরে চোখ রাঙ্গানি থেকে বাঁচিয়ে দেয়। ঠান্ডা আমাদের ঠেলে বাড়ি পাঠিয়ে দেয়। কাকাদের সালাম জানিয়ে দেই দৌড়।

হাত-পা ধুয়েই পড়তে বসার আয়োজন। ওদিকে বাবা দাঁড়িয়েছেন জায়নামাজে – সুরা পড়ার শব্দ আসে। হেসেঁল ঘর থেকে মায়ের ডাক। ‘সবাই এসো, স্বরুই পিঠা খেয়ে যাও’। বইপত্তর ফেলে আবারও দৌড়, আবারও মাকে ঘিরে গোল হয়ে বসা –হাপুস-হুপুস দুধে ভেজানো পিঠা খাওয়া। এখন এই শহরে বসে ভাবলে মনের ভেতর কেমন যেন এক অজানা বাঁশী বেজে ওঠে।

পিঠা খাওয়া শেষ হলেই বাড়ির পেছনের মাঠ থেকে গলার আওয়াজ শোনা যায়। পাড়ার ছেলে-মেয়েরা জমা হয়েছে হাতে তৈরী তারাবাজীর উৎসব করবে বলে। তাদের বাবারাও আছেন সঙ্গে। নামাজ সেরে আমাদের বাবার মনটা নরম হয়ে আছে। মাঠে যাওয়ার অনুমতি চাইলেই পেয়ে যাই। তিনিও চলেন আমাদের সঙ্গে। সন্ধ্যা তখন রাত হয়েছে – রাতের চেয়েও বেশি রাত। আমাদের মাঠটির কোন নাম নেই। কেন নাম ছিলনা ছেলেবেলায় কখনও মনে প্রশ্ন আসে নি।

আমাদের তারাবাজী তৈরী হয় খেজুর গাছের ‘শর্ফা’ দিয়ে।খেজুর গাছের ডালের গোড়ায় এক ধরনের গাঢ় বাদামি রঙের জাল থাকে যা দিয়ে ডালটি গাছের গায়ে নিজেকে লেপটে রাখে। এটিই আমরা ‘শর্ফা’ বলে ডাকি। সেটি ছিঁড়েই গাছি গাছের গা কেটে রস-প্রপাতের স্থান তৈরী করেন। কাটার পর ডালগুলো নীচে এলোমেলো পড়ে থাকে। আমরা তা কুড়িয়ে শর্ফা ছাড়িয়ে এনে জড়ো করি। তারপর একটি বড় মানকচুর পাতা খুঁজে বেড়াই। এটি পাওয়া বেশ কষ্টসাধ্য। মানকচুর পাতা কেটে ফেললে কচু আর বড় হয়না।এই পাতায় খেজুর-কাঁটা দিয়েই ছোট-ছোট ফুটো করা হয়। তারপর শর্ফা গুলোয় আগুন ধরাই। পুড়ে গিয়ে শর্ফা যখন লাল টকটকে হয় তখন সেগুলো পাতার ওপর ঢেলে, পাতাটি ঠোঙ্গার মত মুড়ে, একটি বড় দড়ির এক প্রান্ত দিয়ে ভাল করে বেঁধে, অন্যপ্রান্ত ধরে একজন মাথার ওপর ধরে জোরে-জোরে ঘোরাতে থাকবে। চারিধারে বৃত্তাকারে হলদে-লাল আলোর ফুলঝুরি ঝরে পড়তে থাকে। আমাদের আনন্দ বাঁধ ভাঙ্গে। সবাই যখন আনন্দে লাফায়, আমার কানে একটি শব্দ বেজে ওঠে – আলোর ফুলঝুরির শব্দ। এই শব্দটি কে আমার কাছে শীতের শব্দ মনে হয়।কেমন যেন অলীক এক শব্দ।

বাড়ি ফিরে পড়তে বসি। কিছুই মাথায় ঢোকেনা। পড়া না শেষ করেই রাতের খাবার খেয়ে ঘুমুনোর সময় হয়। মা এসে শুইয়ে দেয়। আলো নিভিয়েও ঘুম আসেনা। বাইরে তখন অমোঘ শীত। আরো একটি শব্দ বন্ধ জানালা দিয়ে নিবিড় করে ভেসে আসে। রাতের বাতাস তখন গায়ে কুয়াশা মেখে সাদা রঙ নিয়েছে। অন্ধকারেও সেই সাদা দেখা যায়। শব্দটি ওখান থেকেই আসে। বিন্দু-বিন্দু গড়িয়ে আসা শব্দ।

অনেকটা সময় এই শব্দ থেকে আমি অনেক দূরে। এখন সময়ের যাত্রার ধ্বনি শুনতে পাই, শীতের শব্দটি আর পাই না। তখন শীতের শব্দে ঘুমুতে পারতাম না, এখন এই শব্দহীনতায় ঘুম আসে না…

ইকরাম কবীর নিজেকে গল্পকার ভাবতে ভালবাসেন।