মিস করি পাত্র-পাত্রী সেইসব কাকা-জেঠুদের

 

প্রিয়ম সেনগুপ্ত, সাংবাদিক,ব্লগার, মিউজিশিয়ান (পশ্চিমবঙ্গ)

লোক খাওয়ানো একটা শিল্প। না সরি, ভুল বললাম, লোক খাওয়ানো একটা বিলুপ্তপ্রায় শিল্প। আর শিল্পীর সংখ্যা দিনে দিনে কমছে।
আগেকার বিয়েবাড়িগুলো ছিল অন্যরকম। মেনকোর্স মেরে দেওয়ার ধান্দা নিয়ে ওয়েটাররা চিকেন পকোড়ার নামে বেসনে ভাজা ছাঁট মাংস নিয়ে সামনে ঘুরঘুর করতেন না। ‘‌পকোড়া খাও, ক্ষিদে কমাও’‌ মন্ত্রে তখনকার ক্যাটারাররা বিশ্বাস করতেন না। আর ছিল না বুফে। অনেকেই বুফে খেতে ভালবাসেন। তাঁদের মতটা হল, নিজের যে জিনিসটা পছন্দ, সেটা নিজের মতো নিয়ে খাওয়া যায়। আমার আবার উল্টো। ব্যাচ কে ব্যাচ বসে খাওয়ানোর ব্যাপারটাই ভাল লাগে। মেনুকার্ড মিলিয়ে মিলিয়ে ‘‌আচ্ছা দেখি তো এরপরে কী’‌, সেই থ্রিলটা বুফেতে নেই। তার ওপরে আমাদের সোসাইটিতে বেশিরভাগ লোকেরই সিভিক সেন্সের অত্যন্ত অভাব। এরা বুফের কাউন্টার থেকে খাবার নিয়ে সেই কাউন্টারের সামনেই গ্যাঁট হয়ে দাঁড়িয়ে খেতে থাকে। আরও যে লোক আসবে, তাদের জন্য যে জায়গা ছেড়ে একটু দূরে গিয়ে দাঁড়াই— এই সাধারণ সেন্সটাই এদের মধ্যে নেই। এদের জন্য আমি একটাই কাজ করি। নিজের প্লেটটা নিয়ে খাবার ঢেলে ফেরার সময় ইচ্ছা করে আলতো একটা ধাক্কা লাগাই। আর খাবার হাল্কা করে ছলকে পড়ে তাঁদের জামা বা শাড়িতে। তাঁরা রাগলেও মৃদু হেসে বুঝিয়ে দিই দোষ তো আপনারই। আপনি কেন কাউন্টারের সামনে দাঁড়িয়েছেন।
আগেকার দিনে ক্যাটেরারের ছেলেদের মধ্যে একটা বেসিক রসবোধ ছিল। সার্ভ করতে করতেই তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ বুঝে নিতেন চলতি ব্যাচে কে কে খাদ্যরসিক। কতবার হয়েছে, আমার খাওয়া দেখে পরিবেশনকারী দাদাটি ‘‌নাও নাও আর দুটো ঠিক পারবে’‌ বলে এক্সট্রা মাটন ঢেলে দিয়েছেন। এই রসবোধ, এই আতিথেয়তা আপনি কোনও বুফের কাউন্টারে পাবেন?‌ কী চাই বলে দিলে অভিব্যক্তিহীন যন্ত্রের মতো তাঁরা হাতায় করে নিয়ে প্লেটে খাবার ঢেলে দেন মাত্র। তারমানে এই নয় যে বসিয়ে খাওয়ান যাঁরা, তাঁদের দিকে সব ঠিকঠাক। বিগত কয়েকবছর ধরে বিয়েবাড়ির সিজনে দুটো ট্রেন্ড দেখতে পাচ্ছি।

১.‌ দুটো আইটেম সার্ভ করার মধ্যে যে ফাঁকটা, সেটা কমিয়ে দেওয়া হচ্ছে। মানে, খাইয়েকে একটু প্রেশারে রাখা আর কী। সময়ের মধ্যে শেষ করতে হলে কম খাও।

 ২.‌ একটা নতুন কায়দা এরা বাগে এনেছে। আপনাকে দেখিয়ে এরা হাতায় তুলবে অনেকখানি। তারপরে শেন ওয়ার্ন যেমন বল করার সময় একরকম গ্রিপ ব্যাটসম্যানকে দেখিয়ে সকলের অলক্ষ্যে কব্জির হাল্কা মোচড়ে গ্রিপ পাল্টে নিতেন, এরাও সেরকম কব্জির হাল্কা মোচড়ে কিছুটা খাবার ফের পাত্রে ফেলে কমিয়ে নিয়ে তবেই আপনার প্লেটে ঢালবে। যার সারমর্ম, যতটা আপনাকে দেখানো হচ্ছে, ততটা দেওয়া হচ্ছে না। আর সব থেকে বিরক্তিকর হল, যেই আপনি খেতে বসবেন, অমনি ভিডিও ক্যামেরার লোকটি এসে আপনার মুখের সামনে চোখ ধাঁধানো আলো এনে ফেলে রেকর্ড করতে শুরু করবে। 
এসব দিনে দিনে বাড়বে বই কমবে না। সেসব নিয়েই বিয়েবাড়ি যেতে হবে এবং খেতে হবে। তবে সব থেকে মিস্‌ করি কাদের জানেন?‌
আগে, মানে বুফে নামক ব্যাপারটা আসার আগে যখন ব্যাচ সিস্টেম ছিল, তখন পাত্র বা পাত্রীর কাকা বা জেঠু টাইপের কেউ পরীক্ষার হলে গার্ড দেওয়ার মতো তৎপরতা নিয়ে ঘুরতেন। দেখতেন, সবাই ঠিক করে খাচ্ছে কি না। যিনি হয়তো একটু হলেও লজ্জা করে খাচ্ছিলেন, তার দিকে তাকিয়ে হুংকার দিয়ে বলে উঠতেন, ‘‌আরে এইটুকু ছেলে, তার আবার লজ্জা কী রে। তোদের বয়সে আমরা গোটা পাঁঠা হজম করে ফেলতাম। ওরে কে আছিস, এখানে আর চারটে রসগোল্লা দে তো.‌.‌.‌’‌
মিস করি, এই লোকগুলোকেই সবচেয়ে বেশি মিস করি।

ছবি: গুগল