গাছটা…

অভীক সরকার

গাছটা একদিন হঠাৎ মরে গেলো।

অথচ তার মরার কথা ছিলো না একটুও। আর কেনই বা মরবে? অমন সটান সতেজ গাছ আর কটাই বা ছিলো আশেপাশে? যেমন ঋজু কাণ্ড তার, তেমনই তার পাতার বাহার, দেখবার মতো। কোথা থেকে জন্মেছে কে জানে? শুধু মালকিনের দরজাটির ঠিক বাইরে দাঁড়িয়ে অবজ্ঞা আর অচেনার ধূলো গায়ে মেখে কারণে অকারণে ঠা ঠা করে হাসতো সে। পথফেরতা বাতাসিয়া আলো ভারী অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখতো তাকে। দুষ্টু পাখিরা আড়ালে আবডালে নিজেদের মধ্যে এর ওর গায়ে ঢলে পড়ে হা হা হি হি করতো, “দ্যাখ দ্যাখ লো চড়ুইখুকী, দেখলি ক্যামন বেহায়াপনা এই মিনসের? আহা, হাসবার ঢং দেখে আর বাঁচিনে।” বাকি প্রাজ্ঞ গাছেরা তাকিয়ে থাকতো তার দিকে, আর বলতো, “ইসস, অহঙ্কার দেখেছো দু’দিনের ছোঁড়ার? এত সাহস যে অনুমতি না নিয়ে দখিনা হাওয়াতে মাথা অবধি দোলায়?”

গাছটার বন্ধু বলতে ছিলো কাঠপিঁপড়ে আর নানারঙের মথেরা। তারা ভারীইই ভালোবাসতো গাছটাকে। যখন উত্তুরে ঠকঠকে হাওয়ায় গাছটা নীল আর ন্যাড়া হয়ে যেতো, তখনও তারা গাছটার কানে ফিসফিস করে বলতো, “ভয় পেও না গো দাদা, আমরা সবাই তো সঙ্গেই আছি।” আর যেদিন কালবৈশাখীর ডাইনিগুলো এসে অট্টহাস্য করে গাছটাকে নির্মমভাবে ছিঁড়েখুঁড়ে ফেলেছিলো, সেদিন তারাও কেঁদেছিলো খুব। তাদের বুকের কান্না যেদিন বসন্তের মনফকিরা বাতাস হয়ে গাছটাকে একসাগর আলোয় ধুইয়ে হাসিমুখে তার থুতনি ধরে বলেছিলো, “ওলো আমার নবীনপরাণসখা, তোমার সনে দুখ উজিয়ে আবার হলো দেখা”, সেদিন তো আকাশ অবধি উঠেছিলো লালে মেরুণে হেসে, পাখিদের ডানায় ভেঙে পড়েছিলো গোধূলি রঙের সারং। এমনকি ফিরতি পথের বিদেশিনী পরিযায়ীরাও বিশাল ডানায় নেমে এসে গাছটার গাল টিপে বলেছিলো, “এক্কেবারে মিষ্টিভুতুম তুই, ইচ্ছে করে তোকে এই চাঁদের আলোর সুতোয় বেঁধে নিয়ে যাই আমাদের দেশে। যাবি ভাই? আমাদের দেশে রাতের বেলা আকাশ ঝলমলিয়ে নেমে আসে আলোপরীরা। সেখানে বরফ পাহাড়ের কোল ঘেঁষে শুয়ে আছে কাকপক্ষীজলের হ্রদ আর তার পাশে দোল খায় মিঠেনরম গাছেরা। তারা সবাই আমাদের মিতে। রাতের বেলা দখিনা হাওয়ার তারা মায়াধোওয়া সুরটি তুলে কেমন যেন মনকেমনের গান গায়। যাবি ভাই?”

গাছটা ছিলো নিজের মনেই, কাউকে বেফাঁস কিচ্ছুটি বলেনি। মালকিনকে বলেছিলো যো হুজুর, মালীকে বলেছিলো মালিক, আমি তোমারই বান্দা। আকাশকে কথা দিয়েছিলো, হ্যাঁ হ্যাঁ, একদিন তোমার বুক চিরে লিখে দেবো সাহসের আখর, নিশ্চয়ই। পশ্চিমা বাতাসকে হাসিমুখে বলেছিলো, ভালোভাবে যেও ভাই। পরেরবার এসো, তোমাকে সাঁঝের আলোয় অলৌকিক পিলু শোনাবো। ভরা বাদলের গর্ভবতী মেঘকে সে ডেকে বলেছিলো, “সাবধানে থেকো বোন। চুপটি করে শুয়ে থাকো দেখি ওই পাহাড়বাবুর বুক জড়িয়ে…”

এত মায়া বুকে জড়িয়ে গাছটা একদিন হঠাৎ মরে গেলো। ভীড় করে এলো আকাশ ও প্রাজ্ঞ বৃক্ষপত্ররাজি, আর্দ্র বাতাসে ভর করে এলো পাখিদের পালক আর ছেঁড়া ঘুড়িদের দল। সবাই কত বাহারী শোকপ্রকাশ করলে, মৃত গাছটার ব্যাপারে ভালো ভালো কথা বললো গাছসমিতির ভাড়া করা রুদালী মানুষেরা…

একমাত্র শুধু কাঠপিঁপড়ে আর মথেদের দলই দেখলো মৃত গাছটার শুকিয়ে যাওয়া গুঁড়ি, কুঁকড়ে যাওয়া শিকড়, বাকল জুড়ে ফাটলের শিরা। তারা দেখলো গাছটার প্রতিটি পাতার বোঁটায় লেগে আছে শুষ্ক রক্তবিন্দু। তারা আরও দেখলো গাছটির ফোঁপড়া হয়ে যাওয়া কাণ্ড জুড়ে হা হা করে হাসছে পরিশ্রমের অন্ধকার দাগ, জমানো কষ্টের সালতামামি, শুকনো অশ্রুকণার লোনা আখর।

মালকিন আর মালী গাছটার মরদেহ দেখে চুকচুক করলো খানিকক্ষণ। তারপর মালী জিজ্ঞেস করলেন মালকিনকে, “ফেলে দিয়ে আসি হুজুরাইন?”
মালকিন তাঁর নিখুঁত সাজানো ঠোঁট মুচড়ে বললেন, ” তাই যা তবে। এমনিতেও কেটে ফেলতে হতোই। হাজার হোক, ফোকটিয়া মাল।”

ছবি: গুগল