লুৎফুল হোসেনের ৫টি কবিতা

ধরো মাতিসের আঁকা ছবি

এমন প্রসাধনহীন ভেজা চুলে
চোখ বেশি ভালো কথা বলে
রঞ্জিকাবিহীন ওষ্ঠপুট
তুমুল উপন্যাস হয়ে ওঠে

আর যদি – ওভাবে তাকিয়ে থাকো
দৃষ্টি জুড়ে বিষ মাখা আশ্চর্য তূণ রাখো
মৃতদের সাথে ভীড় করে থাকে
মন্ত্রমুগ্ধ অনুরাগী মিছিলেরা

চুম্বন স্বাদ জুড়ে জিভ গোলাপ অপভ্রংশে
বেহিসাবি ইচ্ছেদের যতনে তুলে রাখে
উন্মুল শরীরময় নকশাদার লতাগুল্মে
বিধ্বংসী আলিঙ্গন উন্মুখ হয়ে থাকে।

লাইসেন্সড টু কিল

চুড়ো করে রাখা চুলে
বাঁধছো বুকের সিম্ফনি
চাহনিতে যে খুন হচ্ছি
খুব নিশ্চিত জানি

নিরাভরণ ওষ্ঠে তোমার
কিসের গল্প লিখো !
বুঝি রঞ্জিকা নয় তাতে
আমার সাধের কেচ্ছা –
ইচ্ছেমৃত্যু পরোয়ানা
রোজ যতনে মাখো !

রোদরঙা শাড়ি সবুজ পত্রালি

ভেবেছো আমি বুঝি রোদ
আর সূর্যরঙ শাড়িতে বেশ
সকাল সকাল বাজবে সরোদ
অথচ চারপাশ ঘিরে সবুজে
সখ্যের তেষ্টা মাপতে মাপতে
পাতায় পাতায় বৃক্ষের কথা ছিলো
মগ্ন নৈকট্যে গোপনে ফিসফিসিয়ে
তাদের জন্যে বুঝি রোদ মাখিয়ে
পরেছিলে তুমি এক টুকরো অরণ্য
বিটোভেন আর বাঁশির যুগল মূর্ছনা
সেতার-সানতুর উত্থিত অপূর্ব লহরী
সাক্সোফোন সব হয়ে উঠছিলো নগন্য

আঁচল জুড়ে গোলাপরঙা ফুলগুলো
সেই অরণ্যে ছড়িয়ে থেকে শুনলো
বুকের ধুকপুকানো খোল করতাল
তোমার – আর আমার শুধু মনে হলো
এমন একটা মিষ্টি রোদের সকাল জুড়ে
জীবন বুঝি কিচ্ছুটি নয় সাধের অপার
স্রেফ ত্রস্তে বাজা চঞ্চল এক পারকাশান
বুকের ভিতর মোচড় দেয়া তুমুল তুফান


আগুনেই সব রেখেছি বন্ধক

আগুনের চেয়ে লেলিহান
হতে পারে প্রজ্বলন্ত বুকের প্রবাল
ছাইভস্মের ভাস্কর্য উৎসর্গের মহাল
জরুল জননে ফুলের নকশায়
ধাবমান শৈল্পিক আঙুলখান
হতে পারে উত্তুঙ্গ স্পর্শের বিদ্যুৎ
জল ও জঙ্গলের সমর্পণে
মুখোমুখি নগন্য এক বিকাল
শিশিরের চুমু মেখে পাশাপাশি
অপসৃয়মান রহস্য সকাল
হতে পারে স্পর্শনাগাল সীমানায়
মুখ থুবড়ে পড়া অহল্যা কালাকাল
অথচ আগুনেই আঁকবো ছবি
এমন স্বপ্নে দিব্যি নাইছি দিনমান


দূরত্বে দমেনি দ্রিমিক

জানি বলবে –
দেখা হয়নি সাত জনমে,
বাড়ি ঘর ঠিকানা ঠিকুজি
এসবের কিচ্ছুটি
জানা নেই একরত্তি;
বলতে তুমি পারো।

তবু ঠিক ঠিক টের পাই
আঁচলের গায়ে লেগে থাকা
ভাতভাঁপ, চন্দন শরীর গন্ধ;
টের পাই কখন কেমন বাতাস
ছুঁয়ে গেলে আচম্বিতে
মুদে আসে নির্ভার দুচোখ তোমার।

কেউ বিশ্বাস করুক চাই না করুক
আমি জানি ঠিক কেমন গল্পে এখনো
আবেগ কাঁটা তোলে রোমকূপে রোমকূপে,
কি অভিমানে কথারা আড়ষ্ট হয়,
কণ্ঠার বাঁক খাওয়া সীমান্তে
থমকে থাকে ট্রাফিক সিগনালে আটকা সব
দ্রুতগামী মোটরগাড়ীর মতোন ;
জানি বলে শাড়ী বোনা সূতাগুলোর মতোন
গভীর টের পাই রোজ, তোমাকে,
এই আলোকবর্ষ দূরত্বে বসে থেকে।

বলি – ভালবাসা কি সেই দুরন্ত কিশোরের মতোন
কেবলি দূরত্বের সীমানা পাঁচিলে
পা ঝুলিয়ে বসে থাকে !
নাকি দাবী দাওয়া শান্তিপূর্ণ স্মারকে লেখে সে
ইচ্ছের বাঁধাই ফ্রেমে সেঁটে
সাধের হাতে তুলে দ্যায় সাধ্যিকে !

বলো আর কি কি ভ্রান্ত ধারণা আছে তোমার …
আমি কিন্তু দিব্যি জানি
ঠোঁটের পাশে তিলটির মতোন
কতোটা দুর্বোধ্য চাঁদ বসবাস করে
তোমার চোখের তারায় তারায়,
কতোটা মেঘ, কতোটা উদ্বায়ী জলকণা জুড়ে
আবেগের দিঘী ধারণ করো ওই
বুকের অন্তপুরে !

পাপড়ির মিছিল জুড়ে তোমার চোখে
এখনও কি খেলা করে
দ্বিধার মেঘাচ্ছ্বন্ন সংকোচ,
ঘোরলাগা ছায়াময় আড়ষ্টতা !
নষ্ট দুপুর ঠেলে দ্যায় অলৌকিক স্পর্শে,
পোড়ায় বজ্রপাতের মতো !
সন্ধ্যার আলো আঁধারিতে এখনও কি
আঙুল বুলিয়ে খোঁজো সেই স্পর্শের ক্ষত !
বলো, বলো সকল স্মৃতিমেদুরতা
নিউরনে জমানো সব শব্দ-কল্প কথা;
মিলিয়ে দেখি নিত্য মেঘে আমিও
সেইসব জলকণাদের সবটুকু ধারণ করি নাকি।