আমাদের পুরুলিয়া ভ্রমন…

মৃত্তিকা মৃত্যুঞ্জয় ব্যানার্জী, কলকাতা থেকে

২০১৩ সালের পর থেকে আস্তে আস্তে কখন যেন বড় করে ঘুরতে যাওয়া বন্ধ হয়ে গেল…..প্রধান কারণ বিবস্বান অবশ্যই…… তো যাই হোক, বিবস্বানজনিত কোনো কারণে আমি প্যানপ্যানানি পছন্দ করিনা, আর কেউ যদি এরকম কিছু করতে যায় সহানুভূতি দেখিয়ে তাহলে তার সঙ্গে ওঠা বসা খাওয়া সমস্ত ইহজাগতিক কাজকম্মে রাশ টেনে দিই…….সবসময়…….তাতে কারো কিছু এসে যাক ছাই না যাক…..

টুকটাক এদিক ওদিক আগাম পরিকল্পনা ছাড়া বেড়িয়ে আসি সময় সুযোগ করে…… গত বছরের শেষে একদিন সক্কাল সক্কাল ঘুম ভেঙে দেখি উত্তুরে হাওয়া দিচ্ছে, আমার শোবার ঘরের জানালার পাশে কচি নিমের পাতাগুলি তিরতির করে কাঁপছে সেই হাওয়ায় আর একরাশ সোনাগলা রোদ আমার বিছানায় দামাল ছেলের মতন লুটোপুটি খাচ্ছে….

সায়ন্তন সকাল আটটা বেজে দশ মিনিটেও মধ্যরাতের মতন নাসিকাগর্জনে আকাশ বাতাস আলোড়িত করে চলেছে দেখেও তিন সত্যি বলছি একটুও ঝগড়া পেলোনা….. ঠেলেঠুলে উঠিয়ে বললাম,”রোদের রঙ দেখ….”, তিনিও রোদের রঙ দেখে কাঁচা ঘুম ভেঙ্গে যাওয়ার দুঃখ বিস্মৃত হলেন, পিঁচুটি চোখে, বাসিমুখে দৌড়ে বেরিয়ে পড়লেন ট্রাভেল এজেন্সীর খোঁজে….. গন্তব্য ঠিক হল পুরুলিয়া….

কিন্তু বিফল মনোরথ হয়ে ফিরে এলেন কিছুক্ষণের মধ্যেই….কোথাও এই বর্ষশেষের সময় হোটেল ফাঁকা নেই, না আছে ট্রেন ফাঁকা….বটুয়া ঘেঁটে, চোরাগোপ্তা জায়গা থেকে যে ক’টা দু হাজারের নোট পাওয়া গেল তাও খুব একটা অন্যরকম সাহসী পদক্ষেপ নেওয়ার পক্ষে যথেষ্ট নয়….

আমরা দুই সুখ দুঃখের সাথী ছেঁড়া কাঁথায় শুয়ে লাখের স্বপ্ন দেখতে ওস্তাদ,তাই করতে লাগলাম….সাতাশ তারিখ রাত্রে সব আশা জলাঞ্জলি দেওয়ার আগে শেষবারের মতন সাত পাঁচ না ভেবেই ফেবুতে পোস্টালাম,”পুরুলিয়ার কেউ আছেন???ইনবক্স করুন তাহলে। একটু দরকার আছে।” …..

এবং বিশ্বাস করতে বাধ্য হলাম, যার কেউ নেই, তার অরূপদা আছে….অরূপ মুখার্জ…..সেই যে তিনি, যিনি পুঞ্চায় শবর শিশুদের জন্যে একটা ইসকুল চালান, রেসিডেন্সিয়াল স্কুল….কলকাতা পুলিশে চাকরি করেন আর নিজের বেতনের সমস্তটুকু দিয়ে চালান ঐ স্কুল যেখানে একশো বারোটা বাপ মায়ে খেদানো বা অনাথ,অসহায়,দরিদ্র শবর শিশু আশ্রয় পেয়েছে….ইলেকট্রনিক মিডিয়া এবং প্রিন্ট মিডিয়ার দৌলতে অরূপদাকে ভারতবর্ষের অনেকেই এখন চেনেন…..অরূপদার স্কুল নিয়ে অন্য সময় আলাদা করে লিখব…এখন অন্য গল্প…

অরূপদার সঙ্গে ফোনে কথোপকথন শুরু হওয়ার দশ মিনিটের মধ্যেই বুঝে গেলাম পুরুলিয়া যাওয়া হচ্ছে…তবে পুরুলিয়া শহর থেকে পঞ্চান্ন কিলোমিটার দূরে পুঞ্চায় থাকব আমরা…বাসের টিকিটও কনফার্মড হয়ে গেল। অরূপদার রেফারেন্সে ডনবাবুকে ফোন করতেই….ফোনে অবশ্য ,”হ্যালো ডনবাবু??” বলতে গিয়ে হেসে খুন হয়ে,বিষম খেয়ে টেয়ে চরম কান্ড….

তল্পিতল্পা গুটিয়ে পরদিনই যাত্রা শুরু…দুজনের পিঠে দুটো রুকস্যাক,আমার হ্যান্ডব্যাগে আমার সম্পত্তি আর ফয়েল পেপার বক্সে গরম গরম মাখনে ভাজা নরম তুলতুলে রুটি, আলু, বিন্স মটরশুঁটি টোম্যাটো দিয়ে শুকনো সবজি, পাঁচফোড়ন আর লাল লঙ্কা ফোড়ন সহযোগে,আচার, দুখানা ধবধবে সাদা,মখমলের মতন মসৃণ ডিমসেদ্ধ ইনক্লুডিং ফেলু মোদকের চারখানা মাত্র নতুন গুড়ের সন্দেশ….আহা,জিভে জল এসে গেল….

বাড়ির গাড়ি এসে ধর্মতলায় নামিয়ে দিয়ে গেল রাত নটায়,এস বি এস টি সি বাসস্ট্যান্ডে খুঁজে পেতে বের করা গেল মোনালিসা বাস…কন্ডাক্টরকে অরূপদার নাম করতেই ভি আই পি ট্রিটমেন্ট, গার্ড অব অনার দিয়ে তিনটে বড় বড় মুসকো মতন গুঁফো লোক সিট দেখিয়ে দিয়ে গেল…

বাসে উঠেই আরেক কান্ড, আমার পেটমোটা ব্যাগ বাঙ্কে ঘুষছেনা, সায়ন্তন ওটাকে ডিকিতে দেবে বলে নাছোড় হয়ে টানাটানি করতে লাগল…ওর মধ্যে আমার সাধের লঙ ড্রেস,কুর্তি,শাড়ি,পারফিউম,লেগিনস,কটর মটর লজেন্স–আমিও ওটাকে আঁকড়ে ধরে প্রাণপণে চেঁচাতে লাগলাম….

শেষে পিছনের সিট এর দাদু এসে মীমাংসা করে দিলেন,কিছু প্যাকেট নরমাল ডেলিভারি করে বাইরে বের করতেই ব্যাগ চুপসে গেল,ব্যাগের সদ্যোজাত বাচ্চারা ব্যাগের পাশেই অবহেলায় গড়াগড়ি দিতে লাগল….. মা ব্যাগ বাঙ্কে ঢুকে গেল লক্ষী মেয়ের মতন….বাস ছেড়ে দিল….

আমি ভাবতে লাগলাম,”অরূপদা কে??চিনি তো না…একবার বললো আর তাতেই চলে যাচ্ছি….পুলিশের লোক,না জানি কেমন, কত লম্বা চওড়া…”….ঘুম এসে গেল…স্বপ্নে দেখলাম সায়ন্তনের সিক্স প্যাক অ্যাবস হয়েছে, লো ওয়েস্ট জিন্স পরে সায়ন্তন সাক্ষাৎ কুস্তিগীর এর মতন নানান পোজ দেখিয়ে সিডিউস করতে চাইছে আমার পাশে বসা তন্বী মুন্সি কে……রাগের ঠেলায় ঘুম ভেঙ্গে দেখি বারোমাসের পিলের রোগে ভোগা আমার প্রিয় সায়ন্তন মুখ হাঁ করে নিদ্রামগ্ন….

“চল, খেয়ে নিই” বলতেই লাফিয়ে উঠল আমার অরণ্যদেব বর….সাঁ করে এর ওর মাথার উপর দিয়ে ব্যাগ নামিয়ে আনল কেরামতি দেখিয়ে….খেয়ে দেয়ে,কানে হেডফোন গুঁজে ,”You fill up my senses..” শুনতে শুনতে ঘড়িতে দেখলাম সময় হয়েছে রাত বারোটা বেজে পাঁচ মিনিট…..

ভোর না বলে রাত চারটেই বলি….বাস নামিয়ে দিয়ে গেল অচেনা একটা জায়গায়, নাম তার পুঞ্চা…তারপর বিকট হর্ন দিতে দিতে অদৃশ্য হয়ে গেল কুয়াশার চাদরে…

একটা মিষ্টির দোকানের ওপরে ছোটমতন একটা লজ(মনে রাখতে হবে,এটা গ্রাম)…বাইরে দিয়ে উপরে যাওয়ার লোহার ঘোরানো সিঁড়ি…সায়ন্তন মুখ দিয়ে ধোঁয়া বের করে দরজা ঠকঠক করে বিকট চেঁচাতে লাগলো,”কোই হ্যায়???দরজা খুল দিজিয়ে….”….

হ্যাঁ, সায়ন্তনের এটাই অভ্যাস…. যেখানে সেখানে বাজে,উৎকটভাবে হিন্দি বলা….লজে ঢুকেই ‘পপাত বিছানাতলে’…সকালে সাতটা নাগাদ ঘুম থেকে উঠে আমার জমিদার বর(আমার বাবা অবশ্য বলেন,”রাজার ব্যাটা কেরাসিনতেলওয়ালা”) হাঁক পাড়ল,”হামে চান করনেকে লিয়ে গরম পানি চাহিয়ে…ভেজ দিজিয়ে…একঠো কম্বলমে বহৎ যাদা শীত করতা হ্যায়,কম্বল ভি চাহিয়ে….এক্সট্রা”….এখানে আমি সন্দেহ করতে গিয়েও থেমে গেলাম ,যাই হোক…মাধ্যমিক অব্দি “এক্সট্রা”-র একরকম মানে ছিল, আর এখন….না থাক,প্রসঙ্গান্তরে গিয়ে লাভ নেই…লজের মালিক অমরবাবু অমায়িক হেসে বললেন,”আমার ছেলেরা বাংলাতেই কথা বলে”….

সেজেগুজে অরূপদাকে ফোন লাগালাম,যার জন্যে যাওয়া তাঁকেই দেখতে পাইনি তখনও….অরূপদা এলেন,আলাপ হল….আমার অশান্ত মন শান্ত হল….এত সুন্দর করে যিনি হাসতে পারেন তিনি আর যাই হোন না কেন কিডন্যাপার নন….

অরূপদার বাইকের পিছনে বসে অরূপদার স্কুলে গেলাম…এই স্কুল নিয়ে পরে লিখব…শবর মেয়ে কাজলিকে সামনা সামনি দেখলাম,ভালবাসলাম,কোলে নিলাম,কথা বললাম….কাজল অরূপদার আবাসিক স্কুলের সর্বকনিষ্ঠ সদস্যা….অভাবক্লিষ্ট বিধবা মা অনটনের তাড়নায় পুড়িয়ে মারতে গিয়েছিল ওকে, অরূপদা খবর পেয়ে নিজের স্কুলে নিয়ে আসে ওদের তিন ভাইবোনকেই…

কিছুক্ষণ ওখানে কাটিয়ে অরূপদার বাহনের পিছনে বসে সোজা অরূপদার বাড়ি….সেখানে সবার সঙ্গে আলাপ সেরে দিদার হাতে তৈরী গরম গরম ফেনাভাত,আলুপোস্ত,পালংশাকের চচ্চড়ি,মাছভাজা আর টোম্যাটোর চাটনি দিয়ে সাড়ে এগারোটার সময় লাঞ্চ সেরে রওনা হলাম গাড়িতে করে….গন্তব্য জঙ্গলমহলের শবরগ্রাম বাঁশকানালী….খাতরা, রানিবাঁধ হয়ে বাঁকুড়ায়….

অরূপদার এই গ্রামের শবরদের কম্বল আর পুরানো পোষাক দেওয়ার কাজ ছিল….পথশোভা অনবদ্য…রাস্তার দুইপাশে কখনও উন্মুক্ত প্রান্তর,হলুদ সর্ষেক্ষেত আবার কখনো শাল,পলাশ,মহুয়া,সোনাঝুরি গাছের জঙ্গল….আমার চিরটাকাল এই পথচলাটুকুই বড় প্রিয়….গন্তব্য নয়….ঐ গ্রামে কাজ শেষে,শবর বাড়িতে চা খেয়ে রওনা হলাম মুকুটমনিপুরের উদ্দেশ্যে….সেখানে পৌঁছে বিস্তর হাঁটাহাঁটি এবং ফটোসেশন শেষে বাঁধাকপির পকোড়া,লেড়ো বিস্কুট আর চা সহযোগে পেটের ইঁদুরগুলোকে বশ করা গেল….এবার সেদিনের মতন ঘরে ফেরার গান … (চলবে)

ছবি: লেখক