সেই শহরের শীতের ঘ্রাণ

ইরাজ আহমেদ

এই শহরে তাদের উচ্চকিত কন্ঠস্বরে ভর করে আর শীত আসে না। শোনা যায় না সেই ডাক-এই লেপ তোষক ধুনাইবেন। শীত আসে না মাঠাওয়ালার মিহি গলার আওয়াজে। কুয়াশা মাখা সকালের গায়ে সাইকেল ঠেস দিয়ে রেখে হকার আর গল্প করে না চায়ের দোকানে।পাড়ার মোড়ে অলস রোদে বসে গল্প করে না যুবকের দল।সেলুনের দরজায় বসে কেউ মন দিয়ে বসে পড়ে না খবরের কাগজ। শীত আর সেইসব দৃশ্যের হাত ধরে আসে না এই শহরে। যেমন আসতো অনেক বছর আগে।

অনেক বছর আগে প্রথম শীত টের পাওয়া যেতো উলের আগমন দেখে।সব বাড়িতেই সন্ধ্যাবেলা দেখা যেতো উলের কাটায় মা-খালাদের আঙুল ভীষণ ব্যস্ত ফোড় দিতে। যে সময়টার কথা বলছি তখন ঘরে হাতে বোনা সোয়েটার পড়া একরকম ট্র্যাডিশন ছিলো। শীত যে তার মৃদু পা ফেলে এসে দাঁড়িয়েছে দুয়ারে সেটা টের পাইয়ে দিতো ধুনুরীরা। সকালবেলা দুজন মানুষ বড় তুলাধোনার যন্ত্র কাঁধে গলির মোড়ে এসে হাঁক দিতো। আমাদের একতলা, দোতলা বাড়ির ছাদে অথবা উঠানে শীত আসি আসি দিনে সতর্ক মানুষেরা ধুনে নিতো ঘরের পুরনো লেপ, বালিশ আর তোষকের তুলো। তখন অক্টোবরের শেষে ঠান্ডা পড়তো। ছুটির দিনের সকালে বসে এই তুলোধোনা দেখাও ছিলো প্রিয় একটা কাজ। কেমন গন্ধ উঠতো পুরনো তুলার ভেতর থেকে।তুলোধোনার যন্ত্রে মৃদু গুম গুম শব্দ তুলে তারা কাজ করে যেত একমনে।

শীতের আগমনে পুরনো ক্যালেন্ডার খুঁজে বের করে রাখা ছিলো তখন আমাদের বড় একটা কাজ। সেই ক্যালেন্ডারের পাতা দিয়ে নতুন ক্লাসের বইয়ের মলাট হতো। আমরা খুঁজতাম বিভিন্ন জাপানী কোম্পানীর ক্যালেন্ডারের শক্ত পৃষ্ঠা মলাটের জন্য। খুঁজতাম সুন্দর ছবি।চেষ্টা করতাম নিজের বইয়ের মলাটের ছবিটা যাতে সবচাইতে সুন্দর হয়। এখন আর বইয়ের মলাট দেয়ার জন্য ছাত্র, ছাত্রীদের সেই ছোটাছুটি দেখি না। নেই ক্যালেন্ডারের পাতা জোগাড়ের তাড়না।

একদা শীতকাল এলে পাড়ায় আমরা পিকনিক করতাম। চাঁদার টাকা, ব্যান্ড গানের দল ভাড়া করা, স্পট ঠিক করা কোনো কিছুরই বালাই ছিলো না আমাদের। আশপাশের বাড়ি থেকে চেয়ে আনা হতো চাল, ডাল। নিজেদের বাড়ি থেকে তেল, মশলা। কোনো বন্ধু নিয়ে আসতো মুরগি, কেউ হয়তো  আনতো সব্জী। সব মিলিয়ে হয়ে যেতো আমাদের খিচুড়ি,মাংস আর সব্জীর পিকনিক। কারো বাড়ির ছাদ, অথবা শূণ্য বাড়ির উঠান হতো আমাদের পিকনিক স্পট।আমাদের পাড়ার মেয়ে বন্ধুরাও আমাদের সঙ্গে ওইসব পিকনিকে যোগ দিতো। রান্না করার দায়িত্ব থাকতো তাদের ওপর।  এই চড়ুইভাতির আয়োজন আমাদের মনে করিয়ে দিতো শীত এসে গেছে।

শীতকাল এলে বন্ধুরা দলবেঁধে মর্নিং ওয়াকে বের হতাম। ঢাকা শহরে তখন শীতকালে এই তৎপরতা চোখে পড়তো খুব। এখন মানুষ সারা বছরই স্বাস্থ্য চর্চায় মনযোগী। আমরা দলবেঁধে বের হয়ে চলে যেতাম রমনা পার্কে। সেখানে দৌড় বা ব্যয়ামের চাইতেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতো আড্ডা। কুয়াশার ভোরে পার্কের শিশির ভেজা ঘাসে বসে আমরা উপুড় করে দিতাম গল্পের ঝুড়ি। তখন সেই কুয়াশা আর ঠান্ডায় ঠক ঠক করে কাঁপতে থাকা ভোরে পাড়ার অন্য বাসিন্দাদের গাছ থেকে ডাব আর খেজুরের রস চুরি করে খাওয়াটাও একরকম রেওয়াজ হয়ে উঠেছিলো। এখন আর এই শহরের পাড়ায়, গলির অন্দরমহলে এরকম গল্প জমে থাকে কি না জানা নেই।তখন সেই ছদ্ম শরীরচর্চা শেষ করে বাড়ি ফেরার আগে গলির মোড়ে মাঠাওয়ালার কাছে ভীড় জমতো আমাদের।ফুটপাতে বসে চলতো মাঠা পানের আসর। তখন ঢাকা শহরের পথঘাট এতো ব্যস্ত হয়ে ওঠেনি। বাস আর গাড়ির হর্নের অত্যাচারও ছিলো না এমন। শীতমাখা প্রায় শূণ্য রাস্তা ভিজে থাকতো রাতের কুয়াশায়।হঠাৎ নৈঃশব্দকে চমকে দিয়ে ছুটে যেতো বাস অথবা গাড়ি। হকাররা আসতো সাইকেল চালিয়ে। দুধওয়ালা কাঁধে বাঁক নিয়ে বের হতো বাসায় বাসায় দুধ দিতে। গলির মোড়ের রেস্তোরাঁয় গরম সিঙ্গাড়া আর পরোটা ভাজার ঘ্রাণ ছড়িয়ে পড়তো।আর আমি তখন সেই ঘ্রান, সেই নৈঃশব্দ, সেই বন্ধুদের হাসিগল্পের মধ্যে বসে শীতকে উপভোগ করতাম। তাকিয়ে থাকতাম চেনা শহরটার দিকে। সেই ঢাকা শহরের শীতের আগমনী গান আজো শ্রবণে লেগে আছে। শীত এখনো আসে প্রকৃতির নিয়ম মেনে। শুধু শহরটাই বদলে ফেলেছে তার রিংটোন।

ছবিঃ গুগল