শরৎচন্দ্রের দাড়ি ছিলো , খেতেন সিগারেট

কথাশিল্পী শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়।পাঠকদের কাছে নামটি উচ্চারিত হতেই সৌম্য চেহারার একজন মানুষের সাদাকালো ছবি ভেসে ওঠে। তাঁর খুব বেশী ছবি আমরা পাঠকরা দেখতে পাই না। কিন্তু যদি শোনা যায় সেই শরৎচন্দ্র দাড়ি রেখে ঘুরছেন সেই সময়ের রেঙ্গুন শহরের রাস্তায়, মিশছেন অন্ধকার জগতের মানুষদের সঙ্গে, ঘন ঘন সিগারেট খাচ্ছেন, আসক্ত হচ্ছেন অফিমে, খেলছেন দাবা- তাহলে যে কোনো পাঠকই চমকে উঠবেন। এমন শরৎচন্দ্রকে চেনাই দুষ্কর। কিন্তু তখন এমন অদ্ভূত ঘটনা সত্যি সত্যি ঘটেছিলো তাঁর জীবনে।
শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় পরিবারের মানুষ, বন্ধু কাউকে কিছু না জানিয়ে চলে গিয়েছিলেন তখনকার বার্মা (এখন মিয়ানমার)। তখন বহু মানুষ ভাগ্যের অন্বেষণে ছুটছিলো বার্মায়। আর সেখানেই এক অদ্ভূত জীবন যাপন করেছিলেন তিনি।সে জীবনের গল্প একেবারেই ভিন্ন স্বাদের। বার্মায় নেমেই শরৎচন্দ্র পড়েছিলেন ‘কোয়ারেন্টা্ইন’-এর আওতায়। সেই সময়ে কোনো বন্দরে অথবা শহর এলাকায় সংক্রামক ব্যাধি দেখা দিলে বিদেশী জাহাজকে বন্দর থেকে কিছুটা দূরে আটকে রাখা হতো যাত্রীসহ। রেঙ্গুন শহর তখন প্লেগ রোগের দাপটে কম্পমান। বার্মার তখনকার বৃটিশ শাসকরা ধরেই নিয়েছিলো এই রোগের উৎস হচ্ছে ভারতের তৎকালীন বম্বে শহর থেকে জাহাজে আসা শ্রমিকরা। তাই তখন সেখানে ছিলো কোয়ারেন্টাইনের ব্যবস্থা। শরৎচন্দ্রও জাহাজের শ্রমিক আর অন্য যাত্রীদের সঙ্গে আটকা পড়লেন বন্দরের কাছে এক জঙ্গল ঘেরা জায়গায়। সেখানেই তাকে কাটাতে হয়েছিলো সাত দিন।
শরৎচন্দ্র বার্মায় গিয়েছিলেন তাঁর মেসোমশাই অঘোরনাথ চট্টোপাধ্যায়ের কাছে। ভদ্রলোক তখন রেঙ্গুন শহরের প্রখ্যাত উকিল। কিন্তু মজার ব্যাপার হচ্ছে শরৎচন্দ্র সেই আত্নীয়র বাড়ির ঠিকানাও জানতেন না। কোয়ারেন্টাইন পর্ব শেষ হওয়ার পর রেঙ্গুন শহরে ঢুকে তিনি তখন একমাত্র বাঙালী হোটেলে গিয়ে মেশোমশাইয়ের ঠিকানা খুঁজে বের করেন।
শরৎচন্দ্রের বার্মা বা মিয়ানমার সফর সফল হলে আমরা হারাতাম বাংলা সাহিত্যের এক অসাধারণ শিল্পীকে।পড়তে পারতাম না ‘চরিত্রহীন’, ‘দেবদাসৎ ‘গৃহদাহ’-এর মতো সব উপন্যাস। বার্মায় গিয়ে মেশোর পরামর্শে উকিল হওয়ার জন্য তৈরী হলেন শরৎচন্দ্র। কিন্তু শেষে উকিল হওয়া হলো না তাঁর। আটকে গেলেন বর্মি ভাষার পরীক্ষায়। ফেল করলেন তিনি।আর তাতেই ওকালতির ভবিষ্যত কবরস্থ। কিন্তু উকিল না-হয়েও বার্মায় ১৩ মাস কাটিয়ে দিলেন তিনি। সে এক অদ্ভূত অভিজ্ঞতা। কখনো বৌদ্ধ ভিক্ষুদের সঙ্গে ঘুরে বেড়িয়েছেন, কখনো মিশেছেন চোর-ডাকাতদের সঙ্গে।
সেই বিচিত্র জীবনে শরৎচন্দ্রকে তাড়া করে ফিরেছিলো ভেঙ্গে যাওয়া প্রেমের যন্ত্রণা। তখন সেই হারানো ভালোবাসার কষ্ট ভুলতে তিনি মদ্যপান করতেন। খেতেন আফিম। মদ্যপান ত্যাগ করতে ধরেছিলেন আফিম।তাঁর নিয়মিত যাতায়াত ছিলো রেঙ্গুনের নিষিদ্ধ পল্লীতে। শোনা যায় তখন শরৎচন্দ্রের গান শুনে মুগ্ধ হয়ে নবীনচন্দ্র সেন তাঁকে ‘রেঙ্গুন রত্ন’ উপাধিও দিয়েছিলেন।
মানুষকে সাহায্য করতেন শরৎচন্দ্র। রেঙ্গুনে গিয়ে তার এই সুখ্যাতি আরো ছড়িয়ে পড়েছিলো। সাধারণ মানুষদের সঙ্গে মিশে তাদের নানা সংকটে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতেন তিনি। অসুখের সময় বিতরণ করতেন হোমিওপ্যাথী অষুধ।
শরৎচন্দ্র রেঙ্গুনে যে বাড়িতে থাকতেন সেখানে গড়ে তুলেছিলেন একটি লাইব্রেরী। কাঠের তৈরী বাড়িটি তিনি কিনেছিলেন এক ইংরেজ ভদ্রলোকের কাছ থেকে। সেই বাড়ি একদিন আগুন লেগে পুড়ে গেলো। সেই আগুনে পুড়লো ‘চরিত্রহীন’ উপন্যাসের পান্ডুলিপিও। শরৎচন্দ্র নিঃস্ব অবস্থায় পথে এসে দাঁড়ালেন। সঙ্গী তখন পোষা কুকুর আর কাকাতুয়া পাখি। ঠিক ওই সময়েই শরৎচন্দ্র অসুস্থ হয়ে পড়েন। হাত-পা ফুলে যাচ্ছে। তখন তিনি রেঙ্গুনে ছোট একটি অফিসে চাকরি করতেন। অসুস্থতার সময় ছুটি না পাওয়ায় রাগ করে চাকরি ছাড়লেন। ফিরে এলেন কলকাতায়। কিন্তু প্রত্যাবর্তনের পর আচমকাই বদলে গেলেন মানুষটি। দাড়ি কাটলেন। ছাড়লেন সব আসক্তি। জন্ম হলো এক নতুন শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের। শুরু হলো এক অনন্য লেখককের জীবন।

প্রাণের বাংলা ডেস্ক
তথ্যসূত্রঃ আনন্দবাজার পত্রিকা
ছবিঃ গুগল