শীতের উষ্ণতা

রুদ্রাক্ষ রহমান

একদা, একসময় ঠিকঠাক ঋতু বেয়ে বেয়ে শীত নামতো এই শহরে, সারা দেশে। বইয়ের পাতায় এখানো আছে প্রাচীন বয়ান-‘পৌষ-মাঘ এই দুই মাস শীতকাল’। পৌষের মাসের ২৮ তারিখ সকালবেলা, যখন হচ্ছে এই লেখা, তখন দূর কুয়াশার জাল ছিড়ে দিয়ে রোদ উকি-টুকি দিচ্ছে শহরজুড়ে। শহর এবং দেশময় শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে তাই এমন শীত। দু’দিন আগে আরো তীব্রছিলো; তাপমাত্রা বেড়েছে। মাঘের মাঝামাঝি আরো কটি শৈত্যপ্রবাহ আসবে, পূর্বাভাস দিয়ে রেখেছে আবহাওয়াবিদরা। শীতে অনেক মানুষের কষ্ট হচ্ছে, শীতের প্রকোপে রোগ-বালাইতে ধরছে অনেককে; এসবতো আর নতুন কিছু নয়। তবে এটাতো ঠিক যে এখন আর গরমকাপড়ের অভাবে শীতে কষ্ট পায় না মানুষ। দিনে দিনে দেশতো একটা জায়গায় পৌঁছেছে! আর পুঁথিতে যতই বলা হোক পৌষ-মাঘ শীতকাল; প্রমাণসত্য হলো, এতো লম্বা শীত আর কেউ খুঁজে পায় না এই শহরে। গৈ-গেরামে এখনো গাছ আছে, পালা আছে, আছে ফাঁকা ভূমি; তাই শীত নেমে আসে আলগোছে। আর শহরে দু-এক দফায় শীত বেড়াতে আসে শৈত্যপ্রবাহের রথে চড়ে।
ঠিক এসময়টা কেমন বর্ণময় পোশাকের নগরী হয়ে ওঠে আমাদের ধুলো আর ট্রাফিকজ্যামের এই ঢাকা শহর! শহরে হয়তো নয়, গ্রামে গ্রামে একটা কথা এখনো খুব চলে-‘মাঘের শীতে বাঘ কাঁপে’। গত কয়েক বছর বাঘের শীতে বাঘতো দূরের কথা মানুষও কাঁপেনি এই শহরে। রাতে একটু শীত, সকালে একটু শীতের হাওয়া আর সারাদিন চৈত্রমাসের মতো গরম ছিলো ঢাকা শহরে। শীত যে নানা কারণে একটা মজার সময়, উপভোগের কাল, অনেক গল্পবলার, অনেক কাছাকাছি হওয়ার সময় এটা ভুলিয়ে দেয়ার ঘটনা ঘটছে কয়েক বছর ধরে।
শীত নিয়ে পৃথিবীময় এবং এদেশেও অনেক অনেক গল্প আছে। আছে শীতকালের অনেক অনেক উৎসব। পৃথিবীর আরেক প্রান্ত আমেরিকা-কানাডায় এখন বরফজমানো শীত নেমে এসেছে। নায়াগ্রা জলপ্রপাত জমে তুষার। আবার অস্ট্রেলিয়ার বাতাস বইছে দাবদাহ নিয়ে। বাংলাদেশ সেই যে নাতিশীতোষ্ণ; না শীত না গরম। তবে এবার দেশের উত্তরের জেলা পঞ্চগড় ৬৮ বছরর শীতের রেকর্ড ভেঙেছে। পৌষ মাসের ২৫ তারিখ সেখানে তাপমাত্র রেকর্ড করা হয় দুই দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এই রেকর্ড দেখে মার্কিন মুলুক, কানাডা বা ইউরোপের দেশে দেশে থাকা বাঙালিদের কেউ কেউ পাশফেরানো হাসি হাসতে পারেন; কিন্তু দেশের উত্তরের মানুষের জন্য এটা একটা নিদানকালই, বিশেষ করে দিনআনা দিন খাওয়া অতি সাধারণ মানুষের জন্য। তারা বলতেই পারেন,‘শীত তুমি দূর হও’।
তবে, এই আমি ভীষণকরে শীতাকাঙ্ক্ষী বাংলা ভাষার অন্যরকম তেজের-মেজাজের কবি ভাস্কর চক্রবর্তী। তিনি শীত আকাঙ্ক্ষা করে(হয়তো) লিখেছেন- ‘শীতকাল কবে আসবে সুপর্ণা’। এখন শীতকাল আসলেই এই কবি, তার কবিতার কথা আমাদের মনে পড়ে যায়। শীত নিয়ে অনেক বন্দনা হয় লেখায়-কবিতায়। শীত আসছে এই ভরসায় শহরের তাপমাত্রা একটু একটু করে কমতে থাকে। প্রাণহীন শহর শীতে ভর করে হয়ে ওঠে উৎসবের নগরী। আবার শীত এলে এই শহরের অনেক মানুষ পর্যটনে যায় দূর পাহাড়, সমুদ্র এবং কেউ কেউ পরদেশে। শীতের উষ্ণতা গায়ে মাখতে কেউ কেউ বরফনগরীও দেখতে যায়! আর শীতের বাতাসে এখনো ভেসে আসে পিঠার ঘ্রাণ, কুয়াশার সঙ্গে মিশে যায় পিঠার শরীর থেকে বের হওয়া ধোয়া।

‘শীত- রাত ঢ়ের দূরে, অস্থি তবু কেঁপে ওঠে শীতে!
শাদা হাত দু’টো শাদা হয়ে হাঁড় হয়ে মৃত্যুর খবর
একবার মনে আনে, চোখ বুজে তবু কি ভুলিতে
পারি এই দিনগুলো! আমাদের রক্তের ভিতর
বরফের মতো শীত, আগুনের মতো তবু জ্বর!

শীত-রাত বাড়ে আরো, নক্ষত্রেরা যেতেছে হারায়ে,
ছাইয়ে যে আগুন ছিল সেই সবও হয়ে যায় ছাই!
তবুও আরেকবার সব ভস্মে অন্তরের আগুন ধরাই!’
কবি জীবনানন্দ দাশ, যিনি শিশিরের শব্দ এঁকেছেন কবিতায়, তিনি কবিতায় কবিতায় এমনি করে শীতের বন্দনা করেছেন।
শীতের লাবণ্যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর গেয়ে উঠেছেন,
‘ শীতের হাওয়ার লাগল নাচন আমলকির এই ডালে ডালে।
পাতাগুলি শিরশিরিয়ে ঝরিয়ে দিল তালে তালে।।’
আর ওই যে শীত সকালের রোদ! সুকান্ত ভট্টাচার্য শীত সকালের রোদকে বলেছিলেন সোনার চেয়েও দামি। তিনি শীতের সূর্যেও কাছে আলো আর উত্তাপ প্রার্থনা করেছিলেন রাস্তার ধারের উলঙ্গ ছেলেটার জন্য। বিশ্বযুদ্ধোত্তর কলকাতা শহরে তখন পথের ধারের মানুষ, উলঙ্গ ছেলের জন্য শীত আটকানো ছিলো বড় যুদ্ধ। দিন পাল্টেছে। বদলে যাওয়া সময়ে শীতের রঙ-রূপ-ঘ্রাণও বদলে গেছে। তাই বদলে যাওয়া বাঙলার শীতের কাছে আমরা নতুন করে উষ্ণতা খুঁজে ফিরি। শীতের সূর্যের কাছে চাই অন্যরকম আলো, ভিন্নরকম উত্তাপ।

লেখক: গল্পকার
ছবি: আমিনুল ইসলাম, সম্রাট ও সেতু