আমি অন্ধকারকে শ্যামার নরম গাল ভেবে চুমু খাই

শরদিন্দু ভট্টাচার্য্য টুটুল
কবি, গল্পকার,

আমি অন্ধকারে বিলীন হয়ে নীরব অভিমান নিয়ে ছুটছি। আমাকে এখন কেউ থামাতে পারবে না। কারো ক্ষমতা নেই আমকে একটু আলোর সন্ধান দেয়। আমাকে থামাবার কেউ নেই। আমি অবিরল মৃত্যুর সোনালী চিলের পাখায় ভর করে অসীম অন্ধকারে ভাসছি। আবারও বলছি আমাকে থামাবে এমন কেউ নেই। রীনা আমার মন্ত্রপড়া স্ত্রী বলে আমার কোথাও কারো কাছে বিন্দু পরিমাণ মূল্য নেই। আমি তাতে কিছু মনে করি না। কিছু মনে করার দরকার আছে বলেও মনে করি না। আমার মাঝে মধ্যে মনে হয় তার সঙ্গে আমার গভীর যৌন সম্পর্ক ছাড়া আর কিছু নেই। যা আছে, সব যান্ত্রিক। সেখানে হৃদয়ের কোন স্পন্দন নেই। সুইচে চাপ দিলে যেমন বাতি জ্বলে, টিভিতে রঙ্গীন মেয়েদের ছবি দেখা যায়, আবার সুইচে চাপ দিলে বাতি নিভে যায়। তেমন সম্পর্কই ওর সঙ্গে আমার। সেখানে প্রাণের কোন আবেদন নেই। এমন অপ্রিয় সত্য কথা কেউ বলে না। আমি বলে ফেলি। কেননা আমার মধ্যে এই বয়সেও এক ধরনের ছেলেমি কাজ করে। আমি রবীন্দ্রনাথের মতো ইচ্ছে করে জেনে শুনে বিষপান করি। আমার নিবিড় যন্ত্রণার মাঝে এক ধরনের রাবন্দ্রিীক স্টাইল থাকে। রুমা বলে জীবনানন্দ আর রবীন্দ্রনাথ আপনাকে খেয়েছে। এসব কথা আমি কানে নেই না। সব কথা কানে নিতে নেই। আমার বৃদ্ধ পিতা বলতেন, সংসারের সব কিছু ধরতে নেই। সংসারের সবকিছু ধরলে মানুষের মাঝে নিজেকে ছোট হতে হয়। বড় হতে হলে উদার হতে হয়। আমি আমার বাবার কথা কিছুটা মেনে চলতে চাই। কিন্তু সময় মতো পারি না। নীলাভ অন্ধকারকে কখনো আলোর দ্যুতি বলতে পারি না বলেই, কারো সঙ্গে আমার সম্পর্ক দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হয় না। মাঝ পথে ছেদ পড়ে যায়।
কতোদিন আমি শ্যামার মুখ দেখি না। শ্যামা আমার কেউ না। বন্ধু না। সাথী না। একদিন হয়তো কিছু ছিল। হয়তো ছিলো না। হয়তো কিছু হতে পারে। শ্যামার গোলগাল মুখটার দিকে তাকালে আমি ঠিক থাকতে পারি না। মনে হয় তাকে শুনিয়ে শুনিয়ে গাইতে থাকি ‘আমি তোমার প্রেমে হব সবার কলংক ভাগী’। আমি জানি শ্যামা আমার কথা বুঝবে না। আমার গানের সুর তার হৃদয়কে কেবল তোলপাড় করবে। আমি এটাও জানি বাইরে যাই করুক ভিতরে ভিতরে শ্যামা আমাকে ভালবাসে। মেয়েরা এমনই হয়। ভিতরের কথা কাউকে বলতে পারে না। সবাইতো আর সীমার মতো হয়না। একা পেলেই বলবে, এসো আমারা লীভ টুগেদার করি। তুমি ইচ্ছে করলে আমার মধ্যে স্নান করতে পারো। আমার স্বচ্ছ জলের ছোঁয়ায় তোমার মন প্রাণ নিবিড় আনন্দে গান গাইবে ‘প্রেমেরও জোয়ারে ভাসাবে দোহারে”। সীমা যখন আমাকে বলে এসো আমারা দু’জনে মিলেমিশে আধুনিক হয়ে যাই। এই ছোট্ট শহরে এখনো কেউ সাহস করেনি বিয়ে না করেও স্বামী-স্ত্রীর মতো বাস করতে। তখন আমি তার চোখের দিকে তাকিয়ে বলি, কী লাভ এই নিরিবিলি শহরটাকে কুকুরের খামার বানিয়ে। সে নীরব থাকে অভিমানী নারীর মতো। আমাকে কি যেন বোঝাতে চায়। আমি বুঝতে চাই না।
একদিন আকাশ ভেঙ্গে খুব করে বৃষ্টি নেমেছিল। তখন বর্ষা ছিলো না। ছিলো হেমন্তের কালো এক মেঘলা দিন। ওদের বাসায় কেউ নেই। শুধু আমি আর সীমা। সে আমকে বলে অরিন্দম তুমি ইচ্ছে করলে আমার মধ্যে স্নান করতে পারো। তাতে তুমি ঠান্ডা হবে। তুমি যে নীলকন্ঠ।
ওর কথা শুনে আমি হাসি। যেন প্রথম প্রেমের শিহরণ লেগেছে আমার শরীরে। যেন গাছেতে প্রথম রক্ত করবীর কলিটি ফুটেছে। আসলে তা নয়। আমার মধ্যে প্রথম প্রেমের শিহরণ জাগেনি। গাছেতে রক্ত করবীর প্রথম কলিটি পাঁপড়িও মেলেনি। আমি ভিতরে ভিতরে আন্দোলিত হচ্ছি কিংবা ভয়ানক ভাবে রেগে উঠছি। অথচ বাইরে থেকে কেউ তা বুঝবে না। কাউকে তা বুঝতেও দেইনা। শুধু শ্যামার কথায় রেগে উঠি। শ্যামা কিছু বললে তা আমার মধ্যে শেলের মতো বিদ্ধ হয়। কথাটা তাকে একদিন বলেছিও। কানে নেয়নি। সে আমার সব কথা শোনে। অনেক সময় কেমন পাগলামীতে পেয়ে বসে তাকে। আমার কথাই শোনে না। শ্যামার মুখ আমি কতোদিন ধরে দেখিনা। তাকে অনেক সময় মনে হয় যেন বৃষ্টিস্নাত মাধবীলতা। কখনো মনে হয় জীবনানন্দের ধূসর কবিতা। ওকে চেনা বড়োই কঠিন।
পড়ন্ত বেলার স্নিগ্ধ নরম আলো আমার মুখে এসে পড়েছে। এখন কার্তিক মাস। সন্ধ্যা হয়ে যায় খুব তাড়াতাড়ি। আমি কোথাও যেতে পারি না। অন্ধকার আমাকে নিয়ে খেলে। আমিও তমসার খেলার সাথী হই। সীমা তার মধ্যে আমাকে স্নান করতে বলেছিলো। আমি ওর কথার উত্তরে বলেছিলাম এঁটো জলে আমার স্নান করার অভ্যাস নেই। আমার কথা শুনে সে রেগে গিয়েছিল। সীমা কোথায় জানি না। কেউ বলে গাড়ীতে গাড়ীতে এখন কাপড় ফেরি করে চলে। আবার কেউ বলে সে নষ্ট হয়ে গেছে। নষ্ট হওয়া কাকে বলে? সীমা নাকি এখন হোটেলে হোটেলে তার সুন্দর শরীরটাও ফেরি করে বেড়ায়। কারো কথা আমার বিশ্বাস হয় না। আবার কারো কথা ফেলতেও পারি না। আমি যে অন্ধকারে বাস করি । অন্ধকারে নিজেকে আবিষ্কার করি। কোনো কিছু বলতে গেলেই আমার শ্যামার কথা মনে পড়ে যায়। তার লুকোচুরি খেলায় নিজেকে মিলিয়ে নিতে গিয়ে ক্লান্ত হয়ে পড়ি। শ্যামাকে আমার কাছে কখনো কখনো অচেনা আঁধার মনে হয়। যতই তার মনের পর্দা সরাতে থাকি ততই যেন ওর গভীরের পর্দাটা আরো গাঢ় হয়ে যায়। কিছুই দেখা যায় না। ও যে মাঝে মধ্যে আমার সঙ্গে অভিমান করে এটাই আমার ভালো লাগে। সে আমার সঙ্গে অভিমান করে কথা বলে না। আমি কিছু বললে উত্তর দিতে চায় না। শ্যামার তিমির অন্ধকারের মধ্যে আমি ডুবতে থাকি। সেখানে গভীর অন্ধকারে কে যেন আমাকে বলে দেয়, শ্যামা তোমাকে ভালবাসে। তুমি তাকে ধরে রাখো। বুকে না পারো, মনের মাঝে ধরে রাখো। ভোরের আলোর মাঝে আমি আধাঁর দেখি। শ্যামার মুখ যেন নতুন আবিস্কৃত কোন নক্ষত্রের মতো আমার বুকের মাঝে ঝলমল করে উঠে। আমি আলোর জন্যে চিৎকার করি। শ্যামা আমার হৃদয়ের গভীর গোপন থেকে সাড়া দেয়। ধরা দেয় না।
বিষন্ন দুপুরে আমাদের শিমূল গাছটার সঙ্গে কথা বলি আপন মনে। পাশের বাসার সুধীর কাকা বলেন, খোকা বাবুর ছেলেটা কবিতা পড়ে পড়ে পাগল হয়ে গেছে। আমি তার কথা শুনে হাসি। সুবোধ বালকের মতো হাসি। বত্রিশ দাঁত বের করে আমাকে হাসতে দেখে সুধীর কাকা রেগে যান। বলেন, কবে আর মানুষ হবি? বাড়ীর ছোট ছেলে হলেও এখন তুই আর ছোট নস। তোর বউ আছে। সন্তান আছে। তবুও আমি হাসি। কি করে উনাকে বোঝাই ফুলের ভারে নত শিমূল গাছটাকে তখন আমার কাছে শ্যামার মতো মনে হয়। শ্যামা যেমন সুন্দরের ভারে লজ্জায় অবনত থাকে। তেমনি করে আমাদের পুকুর পাড়ের শিমূল গাছটাও ফুলরে ভারে অবনত হয়ে আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। শ্যামা যেন আমাদের পুকুর পাড়ের লজ্জাবতী শিমূল গাছটার মতো নিজেকে গুটিয়ে রাখে। সুধীর কাকা তা বুঝবে কি করে? উনার কি বোঝার মতো সেই বয়স আছে?
একদিন ভোর বেলা কিংবা শেষ রাতে কিংবা তারও আগে চমৎকার একটা স্বপ্ন দেখলাম। স্বপ্নটা আর কিছু নয়। শ্যামাকে দেখলাম। আমি তাকে জড়িয়ে ধরে ঠোঁটে আলতো করে চুমু খাচ্ছি। তার মাখনের মতো নরম শরীরের স্পর্শে আমি ডুবে যাচ্ছি অতলে। এভাবে ডুবে যাওয়াকেই মনে হয় ভালোবাসা বলে। আমি একজন বিবাহিত পুরুষ। এখন ভালোবাসার রস-গন্ধের আভাস বুঝিনা। শুধু শ্যামাকে দেখলে সকল নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলি।
ঘুমের ঘোরে হয়তো কথা বলেছিলাম। রীনা অর্থাৎ আমার স্ত্রীর ডাকে আমার ঘুম ভেঙ্গে যায়। আমি রেগে উঠি। রীনা ঘুম জড়ানো কণ্ঠে বলে, শ্যামা কে। আমি ধরা পড়ার ভয়ে বলি, শ্যামা কে আমি কি করে জানবো। রীনা অভিমানের সুরে বলে, তাহলে এতোক্ষণ ঘুমের ঘোরে কাকে শ্যামা বলে ডাকছিলে। আমি আর কথা বাড়াই না। রীনা বলে, আজকাল তুমি খুব স্বপ্ন দেখ মনে হয়। তাই প্রায়ই তোমার ঘুমের ডিস্টার্ব হয়। ঘুমের মধ্যে কথা বলো। শ্যামা শ্যামা বলে চিৎকার করো। জানো আমাদের ছোট ঠাকুরমা’র নাম ছিলো শ্যামা দেবী। আমার ভয় হয় উনার আত্মা তোমার মাঝে ভর করেছে কিনা। এ যাত্রায় বেঁচে যাওয়ায় ভগবানকে ধন্যবাদ দেই। আর কোন এক কবিতার লাইন ধার করে বলি, ‘হায় পতিত পাবন হরি লোকে কি অযথা তোমাকে দয়াময় বলে।’
আজকাল প্রতিরাতে শ্যামাকে স্বপ্ন দেখি। শ্যামার সুউন্নত যুগল স্তনের আহ্বান আমাকে বিনাশী নেশার স্বপ্ন দেখায়। আমার স্খলন ঘটতে থাকে। কখনোবা একটুখানি ছুঁয়ে যাই তার কোমল হাতখানি। বিস্তৃত পিঠখানি। ওর নাভীর চার পাশে মেদ জমেছে। আমার ইচ্ছে করে তাতে মুখ রাখি। কিন্তু পারি না। ভয় নয়। আমার লজ্জা ভাঙ্গে না। মেয়েদের স্বভাবে পেয়েছে আমাকে। কোনো কিছু করতে ইচ্ছে করলেও লজ্জায় নিজেকে গুটিয়ে ফেলি। শ্যামা কি আমাকে ভালবাসে। সে কি আমাকে ঘৃণা করে। তার ঘৃণা কিংবা নিবিড় ভালবাসা এই দুটির মধ্যে একটি পেলেই হলো আমার। শ্যামা যদি আমাকে ঘৃৃণা করে তাহলে আমার সাথে কথা বলবে না। আমাকে সারাদিন মনে করবে। আমাকে অভিশাপ দেবে। তাকে আমার কথা ভাবতে হবে। যদি ভালোবাসে, তাহলে তো সকল সময় তার কোমল মাংসল বুকে আমাকে স্থান দেবে। আমাকে যত করে রাখবে ধরা না দিলেও। মেয়েরা তাদের কোমল বুকে তাদের প্রেমিক পুরুষকেই স্থান দিয়ে থাকে।
শ্যামা ব্রা পড়ে না। একবার ইচ্ছে হয়েছিল কথাটা তাকে জিজ্ঞেস করি। আবার ভাবলাম কি জানি কি মনে করে! বিপ্লব বলেছিলো, মেয়েদের এই ব্রা না পড়াটা নাকি এখন নতুন এক স্টাইল। আবার রীনা একদিন বলেছিল, কোথায় যেন শুনেছে ব্রা পড়লে নাকি ব্রেস্ট ক্যান্সার হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তাই মেয়েরা এখন অর্ন্তবাস পড়তে চায় না। রীনার কথা শুনে হেসেছিলাম। তাকে বলেছিলাম, তাহলে কি তুমিও আর অর্ন্তবাস পড়বে না। সে মুচকি হেসে বলেছিলো, না বাবা আমি ওসব পারবো না। আমার অসুখ-বিসুখের ভয় নেই। এতো সহজে মরবো না।
তারপর আমার কি হলো জানিনা। আমার মনে, হাতে, চোখে, ঠোঁটে আর লিঙ্গে পোকা বাসা করতে শুরু করলো। আমি সব ভালো জিনিস থেকে বিচ্ছিন্ন হতে থাকলাম। একদিন কবিতা লেখা ছেড়ে দিলাম। গল্প লেখাও ছেড়ে দিলাম। রাত হলেই গভীর অন্ধকার আমাকে হাতছানি দিয়ে ডাকে। অন্ধকারকে সুন্দরী নারীর শরীরের মতো ভালোবাসতে ইচ্ছে করে। আমি অন্ধকারকে শ্যামার গাল ভেবে প্রাণ ভরে চুমু খাই। মাঝেমধ্যে মনে হয় আমাদের সুধীর কাকার কথাই ঠিক। আমার মধ্যে দিনে দিনে মানসিক ভারসাম্যহীনতা প্রকট ভাবে ফুটে উঠেছে। আমি ঘৃণার গভীরে যাচ্ছি। শ্যামা আমাকে পাত্তা দেয় না। আমার এই মানসিক ভারসাম্যহীনতাকে পুলিশও বিশ্বাস করতে চায় নি। তারা ভেবেছিল আমি এক বদ্ধ মাতাল। তাই থানায় ধরে নিয়ে গিয়েছিলো। বলেছিলো কোর্টে চালান দেবে। পুলিশ যখন আমার পাছায় সজোরে আঘাত করে বলেছিলো, বল বেটা দিনে কতোবার নেশা করিস। তখন আমি তাদেরকে দ্বিধাহীনচিত্তে বলেছিলাম, আমি দিনে মাতাল হই না। আমি রাতের নিবিড় অন্ধকারকে শ্যামার মসৃন গাল ভেবে চুম্বন করি। থানার পুলিশ আমার কথা শুনে আমার পাছায় আবার লোহার ডান্ডা দিয়ে আঘাত করতে করতে বলেছিলো, শালারা কেন যে প্রেম করে! আর কেনইবা রাত্রির অন্ধকারকে তাদের প্রেমিকার মসৃন গাল ভেবে তাতে চুমু খেয়ে মাতাল হয়ে আমাদের সময় নষ্ট করে?
একদিন শ্যামা সন্ধ্যাবেলা আমাদের বাসায় এসেছিলো। শ্যামা এলে রীনা আমাকে চোখে চোখে রাখে। সে যেন কি আমাকে বলতে চেয়েছিল। রীনার জন্যে বলতে পারেনি। রাতে রীনাকে জিজ্ঞেস করি, তুমি আমাকে শ্যামার সঙ্গে কথা বলতে দিলে না কেন ? রীনা আমার দিকে তাকিয়ে বলে, তুমি তো আর ওর সঙ্গে কথা বলতে চাও না। তুমিতো কেবল তার শরীরে হাত রাখতে চাও এবং রেখেছোও। তারপরও আমি নিবিড় অন্ধকারের দিকে ছুটতে থাকি।

ছবি:গুগল