মনে রবে কি না রবে আমারে

মনে রবে কি না রবে আমারে? শাশ্বত এক প্রশ্ন। সবাই চায় জীবন নির্বাপিত হবার পর অন্যদের মনে এক টুকরো স্মৃতির পাথর রেখে যেতে। চায় সে পাথর তার বিদায়ের অনেক পরেও আওয়াজ তুলুক শূণ্যতায়। কিন্তু তাই কি হয়? এ পৃথিবীতে অল্প কেউ প্রবল কল্লোল, অল্প কেউ প্রবল সংবাদ। এই অল্প সংখ্যক মানুষকে মনে রাখে পৃথিবী। ইতিহাসের পাতায় তাঁদের ঠাঁই হয়। মানুষ তাদের নাম মনে করে হয় ঘৃণায় থুতু ফেলে অথবা উল্লাসে ফেটে পড়ে। আর বাকী সব অনালোকিত কোণে পড়ে থাকে মুখ থুবড়ে।

ইতিহাস কাকে মনে রাখে আর কাকে ফেলে দেয়-এ এক জটিল প্রশ্ন। অ্যাকিলিস থেকে মেরিলিন মনরো, মনরো থেকে বিটলস কাদের মনে রাখবে ভবিষ্যতের ইতিহাস? এমন অনেক জীবন আছে যাকে আমরা মনে রেখেছি বহু যুগ ধরে। আবার বহুকে ভুলে গেছি চোখের নিমেষে। যুগে যুগে তলোয়ার রক্ত-লাঞ্ছিত করে আলোচিত হয়েছে কেউ কেউ। কেউ আবার শুধু ভালোবেসেই তৈরী করেছে স্মৃতির তাজমহল। কেউ রূপে ভুলিয়েছে কেউ রূপোয়। কারো লেখনী তৈরী করেছে আকাশচুম্বি জনপ্রিয়তা আবার কারো দর্শন তৈরী করেছে ইতিহাসের বইতে আলাদা অধ্যায়। কিন্তু সময়ের সেইসব মানুষও হারিয়ে গেছে বিস্মৃতির অন্তরালে।

তাহলে মানুষকে কেন মনে রাখে সময়? কতদিন মনে রাখে অথবা ভুলে যায়? এই প্রশ্নের সমাধান করতে ইতিহাসবিদরা রীতিমত গবেষণায় নেমেছেন। মেলাতে চেয়েছেন নানা সমীকরণ।

প্রাণের বাংলার এবারের প্রচ্ছদ আয়োজনেও সেই শাশ্বত প্রশ্ন-মনে রবে কি না রবে আমারে? ইতিহাসবিদেরা ভাবতে শুরু করেছেন আগামী এক হাজার বছরে পৃথিবীর মানুষ কাদের মনে রাখবে, কাদের ভুলে যাবে। সেসব নিয়েই নিয়েই কথার সূত্রপাত।

থমাস হ্যারিসন প্রাচীন যুগের ইতিহাস পড়ান সেন্ট এন্ড্রুজ বিশ্ববিদ্যালয়ে। ইতিহাসে রক্ত, রণ আর খ্যাতি অর্জনের পেছনের ব্যাখ্যাটা তাঁর কাছে একটু ভিন্ন। অধ্যাপক সাহেব মনে করেন, পৃথিবীতে বিভিন্ন সময়ে সামরিক নেতারা তাদের খ্যাতি ধরে রাখার জন্যই গোটা দেশকে যুদ্ধের দিকে পরিচালিত করতেন।তাঁর গবেষণা বলছে, হাজার বছর আগে হোমার লিখেছিলেন, ইলিয়াডের মহাকাব্য।সে যুদ্ধের অন্যতম নায়ক অ্যাকিলিস। বীর অ্যাকিলিস মায়ের ভবিষ্যত বাণী শুনে ট্রয়ের যুদ্ধে যোগ দেয়। তার দেবী মাতা বলেছিলো এই যুদ্ধ অ্যাকিলিসের প্রাণ সংহার করবে কিন্তু ইতিহাস তাকে মনে রাখবে। অ্যাকিলিস যুদ্ধে নিহত হয় পায়ের গোড়ালিতে তীরবিদ্ধ হয়ে। বলা হয়ে থাকে ট্রয়ের সেই যুদ্ধ-কথা ইতিহাসে উল্লেখ আছে। আর অ্যাকিলিস মরে গিয়েও রয়ে গেছে মানুষের মনে। রয়ে গেছে ‘অ্যাকিলিস হিল’-এর দৃষ্টান্ত।হ্যারিসন বলছেন, একই ভাবে সম্রাট আলেকজান্ডারের প্রসঙ্গও রয়ে গেছে ইতিহাসে। রোমান সম্রাট জুলিয়াস সিজারের মতো এই গ্রীক সম্রাটও আত্নপ্রচারণা ভালোবাসতেন। জাহির করতে পছন্দ করতেন নিজের বীরত্বের কথা আর সামরিক অভিযানের গল্প। ওই সময়ে একদল ইতিহাসরচনাকারী আলেকজান্ডারের অভিযান আর লড়াইয়ের কাহিনী রচনায় নিযুক্ত ছিলো। হ্যারিসন মনে করেন এসব কারণেই আলেকজান্ডার আর সিজার পরবর্তী হাজার বছরে টিকে যাবেন ইতিহাসের পাতায়।

ইতিহাসের গবেষকরা বলনে, দর্শন এবং দার্শনিকরা সময়ের যাত্রায় সবচাইতে টেকসই। হাজার বছর পরেও তাদের প্রচারিত দর্শন আর জীবনকথা মানুষ মনে রাখবে। সেক্ষেত্রে গ্রীক দার্শনিকদের নামই রয়েছে তালিকার প্রথমে। ২০১৩ সালে একদল গবেষক পৃথিবীর সবচাইতে প্রভাবশালী শিক্ষাবিদদের নামের তালিকা তৈরী করতে নেমেছিলেন। আর সেই তালিকা যখন প্রকাশিত হলো দেখা তালিকার প্রথম নামটি কার্ল মার্কসের।

আইজ্যাক নিউটন না গ্যালিলিও কে বেশী উজ্জ্বল হয়ে থাকবে মানুষের স্মৃতিতে হাজার বছরের দীর্ঘ যাত্রায়? অনেকেই ভাবতে পারেন নিউটনের নাম। কিন্তু মজার ব্যাপার হচ্ছে গবেষকরা জানাচ্ছেন, এই যাত্রায় টিকে থাকবে পঙ্গু বিজ্ঞানী স্টিফেন হকিংসের নাম। কারণ বিজ্ঞানের গবেষণার প্রতি পদে নিউটন, গ্যালিলিওকে প্রয়োজন হলেও মানুষ আসলে দেখতে চায় বিজ্ঞানীর নির্দিষ্ট কোনো আবিষ্কার। আর ব্ল্যাক হোল থিওরি হকিংসকে সেই অমরত্ন দিয়ে ফেলেছে ইতিমধ্যেই।

সঙ্গীতের দুনিয়াতেও সর্বকালে বেশী জনপ্রিয় জন লেনন আর তার বিটলস হলেও শেষ বিচারে বলা হচ্ছে লেননও বিপদে আছেন। সম্ভবত কোনো মহাকাশযানের যাত্রী শেষ পর্য্ন্ত জন লেননের গান শুনতে চাইবেন না। জরিপ তাই বলছে।

ইতিহাস ভীষন নির্মম। এইমাত্র যাকে উজ্জ্বল আলো বলে মনে হচ্ছে চোখের নিমেষে সে হয়ে যেতে পারে বিস্মৃতি।তবে বলা হচেছ, রাজনীতিকরা হচ্ছেন ইতিহাসের সবচাইতে ধারাবাহিক মানুষ।নানা ঘটনা, রক্তপাত আর মেরুকরণ তাদের বাঁচিয়ে রাখে মানুষের মনে। কিন্তু ইতিহাসবিদদের গবেষণায় দেখা যাচ্ছে জুলিয়াস সিজার অথবা উইনস্টন চার্চিলের স্থান নেই সেখানে। নিজেদের মানুষের অধিকারের জন্য সংগ্রাম আর বৈপ্লবিক কর্মকান্ডের জন্য আব্রাহাম লিংকন, মহাত্না গান্ধী আর নেলসন ম্যান্ডেলাই এগিয়ে আছেন ভোটে। ইতিহাস আর ইতিহাসের পাঠক আগামী এক হাজার বছর মনে রাখবে এই তিনজনকে।

ইতিহাসে কোনো মানুষকে অমর করে রাখতে প্রচারণা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে বলে বলছেন ইতিহাসবিদরা। এই প্রচারণার প্রভাব পড়েছিলো তুতেনখামেনের মমির ওপরে। মাত্র ১৮ বছর বয়সে ফ্যারাও সাম্রাজ্যের এই সম্রাট ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয়ে মারা যায়। তার মৃত্যুরহস্য নিয়ে অনেক গবেষণা করেছে বিজ্ঞানী ও নৃত্বাত্ত্বিকরা। আর এই গবেষণার প্রচারণাই তরুণ সম্রাটকে অন্যদের চাইতে এগিয়ে রেখেছেন স্মৃতির খাতায়। তুতেনখামেনের মতো চীনা সম্রাট কুইন শি হুয়াংও গ্রেট ওয়াল তৈরী করে হয়ে গেছেন ইতিহাসের অবিচেছদ্য অংশ। তেমনি হয়ে আছেন বিখ্যাত মঙ্গল সম্রাট চেংগিস খান।

আগামী এক হাজার বছরে স্মরণীয় হয়ে থাকার তালিকায় বেশ কয়েকজন নারী চরিত্রের নামও উঠে এসেছে।তাদের মধ্যে অন্যতম সুন্দরী শ্রেষ্ঠা ক্লিওপাট্রা। তার যৌবনের আগুন যেন এই চরিত্রটিকে খোদাই করে রেখেছে মানুষের মনে। ইতিহাসবিদরা বলছেন তাদের পরিচালিত জরিপে বেশী মানুষ ভোটও দিয়েছেন এই নারীকে।তবে আধুনিক যুগে চিরস্থায়ী হয়ে থাকার ব্যাপারটা একটু অন্যরকম বলে বলছেন তারা। এখন একটি বিশেষ পারফিউমও অনেক বছর ধরে কোনো খ্যাতিমান নারীকে মনে রাখতে সহায়তা করে। তবে এ ক্ষেত্রে বেশ আলাদা অবস্থানে আছেন অভিনেত্রী মেরিলিন মনরো।লাস্যে, যৌন আবেদনে এই নারী মানুষের মনে দাগ কেটেছেন গভীর ভাবে। আর এই দাগ টিকে থাকবে আরো অনেক বছর এমন অনুমানই করা হচ্ছে।পাশাপাশি ইতিহাসবিদরা মনে করেন, মনরো যদি আত্নহত্যা না-করতেন তাহলে অপেক্ষাকৃত কম মানুষ তাকে মনে রাখতো।

তবে এ কথা মানতেই হবে ইতিহাসের পাতায় খল নায়কদের জয়জয়কারই বেশী। হিটলার, আইভান দ্যা টেরিবল অথবা ধারাবাহিক খুনী জ্যাক দা রিপার-যার নামই উচ্চারিত হোক না কেনো তারা সবাই তাদের কুকর্মের জন্য ব্যাপকভাবে আলোচিত। জুলিয়াস সিজারকে খুন করে বিখ্যাত হয়ে আছে ব্রুটাস চরিত্রটি। বিশ্বাসঘাতকতার অপর নামই এখন ব্রুটাস। এই খল নায়কদের মাঝে হিটলারের নামই এখন সামনের সারিতে। তাকেও ঘৃণার সঙ্গে মনে রাখবে ভবিষ্যত প্রজন্ম। তবে মজার ব্যাপার হচ্ছে, গায়ক জন লেননকে খুন করে মার্ক ডেভিড চ্যাপম্যান কিন্তু এই তালিকায় প্রথমদিকেই আছে।এই চ্যাপম্যান মন্তব্য করেছিলো, ইতিহাসে বিখ্যাত হওয়ার জন্য ইতিহাস খ্যাত কাউকে খুন করতে হয়।

প্রাণের বাংলা ডেস্ক
তথ্যসূত্রঃ বিবিসি
ছবিঃ গুগল