নিউইয়র্কে শীত যেন জাঁকিয়ে বসেছে

স্মৃতি সাহা

রোদ রোদ মায়ার দিনগুলোতে যখন একনিষ্ঠ অনুগামী ছায়ার গল্প হতে থাকে অন্তহীন, শেষ দুপুরের খাঁ খাঁ যখন নিস্তব্ধতায় নিজেকে মুড়িয়ে নেয়, অল্প একটু অবসর যখন সারাদিনের ব্যস্ততার হিসেব কষে, ঠিক তখন খুব সন্তর্পনে মন হাঁটতে চাই স্মৃতির উঠোনে, অলিন্দ পেরোয় মায়াময় হাতছানিতে। কড়া রোদের গন্ধমাখা দুপুরগুলোর গল্প হুড়মুড়িয়ে প্রকটভাবে আভাস জাগায় মাঝেমাঝেই ! মন তখন জুড়োতে চায় ফেলে আসা দিনের পলকা বাতাসে। এমন সব কড়া রোদের শেষদুপুরের অধিকারে থাকতো ঠাকুরমার ঝুলি, ছোটদের রামায়ণ – মহাভারত, সিলিং ফ্যানের ঘটাং ঘটাং, আর ভাতঘুমের নিস্তব্ধতা তাড়িয়ে ক্লান্ত কাকের একঘেয়ে কা কা! এমন দুপুরগুলো কখনো কখনোও নিয়মের শেকল ভাঙ্গার ডাক দিত খুব। পরিশ্রান্ত মা ঘুমিয়ে পড়লেই ছোটো ছোটো পা ফেলে ঘরের বাইরে। এরপর একছুট… কয়েকবাড়ি পরে সমবয়সী মেয়ে বন্ধুর ঝোপঝাড়ে ঘেরা পুরাতন বাড়িতে। জানি না সেই বাড়িটি আমায় এত টানতো কেন! তবে পুরাতন বাড়িটির আধাভাঙ্গা কয়েকটা ঘরের মতন জায়গা জুড়ে লেবু গাছের ঝাড় আর নাম না জানা সাদা ফুলের গাছ। সবুজ পাতার বুকজুড়ে সেই শুভ্রমায়া আমাকে খুব টানতো। হাত বাড়িয়ে গাছের ডাল টেনে ফুলগুলো করায়ত্ত করা। এরপর তার বুনোগন্ধেই শেষদুপুর গল্প আঁকতো। মিইয়ে আসা রোদের বিকেলগুলোও মিশে যেত সেই বুনোগন্ধে। এখনো হঠাৎ করেই পথিমধ্যে যখন সেই শেষদুপুরের শুভ্রাংশু মনে করিয়ে দেয় অদেখা কোথাও হতে ভেসে আসা বুনোগন্ধ , তখন আপ্লুত আমি আরোও একবার সেই বুনোগন্ধে একটা দিনের নাম লিখি, আঁজলা ভরে অতীত ফিরিয়ে আনি শুভ্র জ্যোৎস্নার মায়া জড়িয়ে।
কিন্তু কতক্ষণ আর অতীতে যাপন করার সুযোগ হয়। অতীতের ঝাঁপি যত্ন করে বন্ধ করে ফিরি বর্তমানে। যে বর্তমানে অনুগামী ছায়ার গল্প নেই, নেই শেষ দুপুরের খাঁ খাঁ। সূর্যহীন দিন যেখানে আরোপিত মনে হয় না বরং ঝলমলে রোদ হাসা দিন যেন বেখাপ্পা বলে ভ্রম হয়। প্রায় মধ্য জানুয়ারি চলে এসেছে। নিউইয়র্কে শীত যেন জাঁকিয়ে বসে, নিজের রূঢ়তার ছবি আঁকতে বেশি স্বচ্ছন্দ্য এখন। মাঝেমধ্যে তো নিজের প্রায় শত বছরের ছবি মুছে ফেলে আঁকছে নতুন ছবি। তাপমাত্রা হিমাঙ্কের নীচে প্রায় বেশ কিছুদিন। যদিও এটা নিউইয়র্কের প্রতি শীতের পরিচিত ছবি। তবে যে ব্যাপারটা নতুন তা হলো হিমাঙ্কের ঠিক কতটা নিচে শীতের পারদ নামছে বা নামবে তার অনুমান করা। নতুন বছর বরণ করেছে নিউইয়র্ক শীতল তাপমাত্রার নতুন ইতিহাস গড়ে।
৪ঠা জানুয়ারি নিউইয়র্ককে প্রায় অচল করে দিয়ে আগমন ঘটে তুষারঝড় ” বম্ব সাইক্লোন”-এর। এই ঝড়ে কার্যত অচল হয়ে যায় নিউইয়র্ক। নিউইয়র্ক সিটির স্কুলগুলো বন্ধ ঘোষণা করা হয়। অবিচ্ছিন্নভাবে দীর্ঘসময় তুষারপাত আর তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল প্রচণ্ড গতির বাতাস যার গতিবেগ ছিল ঘন্টায় ৪০ মাইল। সেই বাতাসে ঘূর্ণাকারে যখন তুষারগুলো উড়ছিল তখন চারপাশ সাদা হয়ে দৃষ্টিসীমা কমে আসছিল অস্বাভাবিক ভাবে। এই ঝড়ে তুষারপতনের পরিমাপ নিউইয়র্কের কোথাও কোথাও ১৫”। আর সেই ঝড়ের পথ বেয়েই এসেছে হাড়হিম করা ঠান্ডা। তাপমাত্রা নেমে গেছে অনেকটা। এসময় তাপমাত্রা হিমাঙ্কের প্রায় ২০ ডিগ্রী ফারেনহাইট নিচে। যে পরিস্থিতিকে এখানে বলা হয় ‘ফ্রিজিড কোল্ড’। অসম্ভব কষ্টদায়ক সে ঠান্ডা। ঘরের বাইরে একটু বেশি সময় অতিবাহিত করলে হাত আর পায়ের আঙুল সাড়হীন হয়ে যায়। আর এর সঙ্গে ওয়াক সাইডে পাহাড় সমান বরফের স্তুপ এখানকার সবার স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে দারুণভাবে ব্যহত করে। এই অবস্থা থেকে পরিত্রাণের একমাত্র উপায় বৃষ্টি, ঝমঝম বৃষ্টি। বৃষ্টিই পারে পাহাড়সমান বরফের এই স্তুপকে চোখের পলকে উধাও করতে। তাই সকল নিউইয়র্কবাসীর সঙ্গে আমিও প্রার্থনা করছি আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নামুক!

ছবিঃ লেখক