নিলয়’দাকে মনে পড়ে…

শেখ রানা (নিউবুরি পার্ক, লন্ডন)

দিন তারিখ মনে রাখতে পারি না।

পারলে নিলয় দা’র সঙ্গে দেখা হবার তারিখটা স্মৃতির জার্নালে টুকে রাখতাম। সেই দিনটা ফিরে ফিরে এলে নিলয় দা’র ‘আকাশ কত বিশাল যদি দেখতে’ অথবা ‘কত যে খুঁজেছি তোমায়’-এই প্রিয় দুইটা গান গাইতাম। অবশ্যই রাসেলকে খুঁজে বের করে।
নিলয়দা কে চাইলেও আর খুঁজে বের করা যাবে না। নিখোঁজ সংবাদ এর বিজ্ঞাপন দিলেও না।

নিলয়’দার সঙ্গে আমার পরিচয় রাসেল এর সুত্রে। পরিচয় পর্ব পরেই নিলয়’দার সঙ্গে আমার সখ্য হয়েছিল। মুগ্ধতার রেশ ছাপিয়ে আমরা দল বেঁধে চা খেতে গিয়েছিলাম মিরপুর-২ নাম্বারে। সনি সিনেমা হলের পেছনের গলিতে। সেদিনও নিলয়’দার কাঁধে গিটার ছিল। সম্ভবত সেদিন বৃহস্পতিবার। গুলশানের নিম্ফাস হোটেলে ঐ একদিন গান গাইতো দাদা।

আমি তখন নিদারুণ দিন কাটাচ্ছি। বছর দুয়েক। গান লিখে জীবনযাপনের এক অসম্ভব ঘোরের ভিতর ঘুরপাক খাচ্ছি। সেই সময়ে নিলয়’দার সঙ্গে গানে গানে আড্ডা শুরু। দাদারও খুব অনুকূল সময় ছিল না তখন। কিন্তু মানুষটাকে জোয়ার-ভাটা নিয়ে কখনই চিন্তিত দেখিনি। দেখা হলেই মুখ ভর্তি হাসি। তারপর বেরিয়ে পড়া।

বছর দুয়েক পর আমি সিঙ্গাপুর চলে যাই। বোহেমিয়ান জীবন এর একটা বাঁক আসে আমার। সেই বাঁক ধরে ছুটিতে ফিরে আসি ঢাকায়। নিলয়’দা, আমি, রিকো মিলে রাজশাহী ঘুরতে যাই। রাসেল কি এক কারণে মিস করে যায় সেই আনন্দ সফর। রাজশাহী উপশহরে রিকোর বাসায় উঠে সারা রাত আড্ডা। আমি আর নিলয়’দা। আড্ডা দিতে দিতে হঠাৎ গিটার হাতে নিলয় দার টুংটাং।

এমন না যে সামনা সামনি নিলয়’দার গিটার বাজানো দেখিনি। কিন্তু রাজশাহীর সেই আড্ডা রাতে নিলয়’দার বাজানো শুনে আমার অদ্ভুত অনুভূতি হয়েছিল, মনে আছে। মনে হচ্ছিল সারা ঘর জুড়ে একাধিক গিটার বাজছে। সত্যি সত্যি এ রকম মনে হয়েছিল! এ রকম অন্যকিছু ঘটেছিল বলেই বাজানো শেষে নিলয়দার সেই ধুন এর উপর গান লিখতে বলার কথাও মনে আছে বিলক্ষণ। সেই গিটার ধুনটা আজ এত বছর পরেও আমার মাথায় আছে। আমি এখনও শব্দ খুঁজছি সেই ধুনে বসাবো বলে।

সিঙ্গাপুরে ফিরে কিছুদিন পরেই রাসেল এর ফোন পেয়ে জানতে পারি নিলয়’দা মৃত্যুকে বরণ করেছেন। ঢাকায় ফিরলে আর নিলয়’দাকে খুঁজে পাওয়া যাবে না। না গিটারে, না হাসিতে, না মিরপুরের সেই চা এর দোকানের আড্ডায়। কি তীব্র হাহাকার! কি সরল সত্য!

চায়ের কাপে পুড়ছে যে ছাই
আধারের রঙে সুরগুলো চাই
গিটারের তারে আঙ্গুলের ছোঁয়ায়
তুমুল বিষাদ উঠতো

এই গানটা বিরহের গান হতে পারত
গিটারের তারে অলক্ষ্যে যদি
নিলয় দাস থাকতো…

দশ বছর চলে গেছে। অনেকগুলো গান আর বিরহী গান হয়নি শেষমেশ।

নিলয়’দা, আপনাকে মিস করি অনেক। মনে পড়ে গেলে,১১ জানুয়ারিতে সবচেয়ে বেশি।