আমাদের পুরুলিয়া ভ্রমন…

মৃত্তিকা মৃত্যুঞ্জয় ব্যানার্জী

ফেরার পথে মায়াবী সন্ধ্যার স্মৃতিটুকু আলগোছে আঁকা হয়ে গেল জঙ্গলের পাশে ছোট্ট চায়ের দোকানে মাটির উনুনে বসানো কালো কেটলির ওপর কুন্ডলী পাকানো ধোঁয়ায়…রাত তার কালো ওড়নায় মুড়ে দিল চরাচর…অদৃশ্য শিল্পীর তুলি কালোর ওপর কালো পরত চাপিয়ে ঘুম পাড়িয়ে দিল মাটির বাড়ির গেরস্থালী…নিকানো উঠোনের খড়ের গাদায়,মাটির দাওয়ায়,বন্ধ দরজার ওপাশে দিনভর কর্মব্যস্ততার পর অশেষ,নিরবচ্ছিন্ন নিরিবিলি…গাড়ির ভিতর কুমার শানুর,”আব তেরে বিন জি লেঙ্গে হাম” একরাশ শৈশব,কৈশোর নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল কিছুটা ফিকে হয়ে আসা স্মৃতির ওপর…চাঁদের আলোয় মাঠ,ঘাট,প্রান্তরের নির্লজ্জ অবগাহন দেখে অভিসারে যেতে মন চাইলো…”I want to meet you in a timeless,place-less place/Somewhere out of the context and beyond all consequences” ….তাহলে কি এটাই সেই জায়গা??আমার স্বপ্নের ???যেখানে familiarity does not breed contempt…যেখানে অনন্তকাল অক্লান্তভাবে নির্নিমেষ চেয়ে থাকা যায় প্রিয়র দুই চোখে??হৃদয়ের গুলদস্তা অক্লেশে তোফা দেওয়া যায় তাকে??

সেই রাতে লজে ফিরে হাত মুখ ধুয়ে ফোন নিয়ে খুটুর খুটুর করতেই রাত সাড়ে আটটা বাজল….সায়ন্তন শীতে কাঁপতে কাঁপতে বাইরে থেকে খাবার নিয়ে এল…শালপাতায় মুড়ে গরম গরম রুটি,তড়কা,কাঁচা পেঁয়াজ,দুখানা ডবল ডিমের ওমলেট আর দুই জোড়া নলেন গুড়ের রসোগোল্লা…

ডিমটা মুখে দিয়েছি কিনা মনে নেই, অরূপদার ফোন,”বাড়িতে রান্না হয়েছে,তোমাদের কোথাও খাওয়া চলবে না…রেডি হও,আমি নিতে আসছি”….কেনা খাওয়ারগুলো দান-বীর এর মতন বিলিয়ে দিয়ে অরূপদার বাড়িতে পাত পেড়ে বসে রুটি, কষা মাংস,বাঁধাকপির সবজি,বেগুনভাজা আর নতুন খেজুর গুড় সহযোগে রীতিমতো ব্যাঙ্কোয়েট হল….ঠিক হল, পরদিন সকালে যাব অযোধ্যা পাহাড় আর বাঘমুন্ডির জঙ্গল হয়ে ফিরব…”ডি লা গ্র্যান্ডি মেফিস্টোফিলিস”…নেচে উঠল মন…

অরূপদার সঙ্গে আড্ডা দিয়ে রাত সাড়ে বারোটায় লজে ফিরেই বিছানায়…আমার আবার পাশবালিশ ছাড়া ঘুম হয়না…তাই অগত্যা মানুষ পাশ বালিশ নিয়েই রাত কাটলো…তবে এই পাশবালিশ নচ্ছার,মাঝে মাঝেই বিদ্রোহ করে আমার পদযুগলকে আছাড় মারছিল বিছানায়…কিন্তু ঐ যে হুমায়ূন আহমেদ বলে গিয়েছেন,”দুঃসময়ে অপমান গায়ে মাখতে নেই”…

পরদিন সকাল সাড়ে আটটায় বিনোদভাই গাড়ি নিয়ে হাজির….অরূপদার ইসকুলে গিয়ে কাজলিকে একটু আদর করেই যাত্রা শুরু হল…ঘন্টা দুয়েকের পথ…পথের মাঝে ব্রেকফাস্ট হল জব্বর…গরম গরম কচুরি, আদা আর হিংফোড়ন দিয়ে আলু মটরশুঁটি ফুলকপির সবজি,লাল মুচমুচে জিলিপি আর সবশেষে ঘন দুধের স্পেশাল মালাই চা…সকালটা জমে গেল..আমার মা কেন বলেন,”জীবনের সমস্ত সুখ খাওয়া দাওয়ায়” তা স্পষ্ট হল আরও একবার….

বিনোদ ভাই স্থানীয়,তিন মেয়ে এক ছেলের বাবা…সায়ন্তন বিতর্কিত মন্তব্য করল,”ছেলে নিশ্চয়ই সবার ছোট??”…..বিনোদভাই হেসে মাথা নাড়িয়ে সায় দেওয়ার আগেই সায়ন্তনের পেটে রাম চিমটি কেটে দিলাম….দুই কন্যারত্ন সহ আমার বাবা সারাজীবন শুনে এলেন,”ব্যানার্জীদা আপনার ছেলে নাই??”….তা বলি পৃথিবীটা কি শুধু ব্যর্থতার গল্পেই ছেয়ে থাকবে??….বিনোদভাই সাকসেসফুল,আমার বাবার মতন করুণার পাত্র নন মোটেই…সে কথা আমার ওনাকে কোন শালা বোঝায়??…

সোনাঝুরি,মহুয়া,নিম,শালগাছে ঘেরা পিচের রাস্তাটা লালমাটির হয়ে গেল কখন যেন…দূর থেকে দেখা পাহাড়ের কোল বেয়ে পাকদন্ডী পথ ধরে হিলটপে চলে এলাম…উপর থেকে দেখলাম দিগন্ত বিস্তৃত সর্ষেখেত আর সূর্যমুখী ফুলের খেত…বিবস্বানের নরম উষ্ণ ছটায় মন প্রাণ ভরে গেল….আপার ড্যাম আর বামনী ফলস হয়ে নেমে এলাম বাঘমুন্ডীর পথে…রাস্তার দুপাশের ঘন জঙ্গলে দিনের বেলায় ঝিঁ ঝিঁ পোকার ডাক…জনমনুষ্যহীন…

সমতলে এসে পিছনে ফেলে আসা পাহাড়কে ফিরে দেখলাম….দূরত্ব ,একমাত্র দূরত্বই বাঁচিয়ে রাখে মানুষকে,বাঁচিয়ে রাখে তার একচক্ষু হরিণের মতন একাগ্র ভালোবাসাকে–আরও একবার বুঝলাম যা কিছু কাছের, তাই আমায় অন্ধ করে,স্বার্থপর করে…ফেরার পথে লাঞ্চ সারলাম মোটা চালের ভাত,লাউএর সুক্তো,মুসুর ডাল,আলুভাজা,ফুলকপি পনিরের ডালনা,কাবলি চানার সবজি,রুটি,স্যালাড,টকদই,পেঁপের চাটনি আর পান্তুয়া সহযোগে,রাজকীয়ভাবে….

অনেকদিনের শখ ছিল সায়ন্তনের সঙ্গে খেতখামারে ঘোরার,সেই বিয়ের আগে থেকেই…কত্তবার ভেবেছি বর্ষায় তরতর করে বেড়ে ওঠা সবুজ পাটখেতের মাঝে শুয়ে শুয়ে দুজনে আকাশ দেখব,বৃষ্টি ভিজব….শুধু মা বাবাকে হারাতে চাইনি তাই পারিনি….রাজ সিমরন ইস্টাইলে সর্ষেখেতে ঘোরার সেই শখও মিটল…সূয্যিমামা পাটে যাওয়ার আগেই অরূপদার ইস্কুলে গিয়ে বাচ্চাগুলোর সঙ্গে নাচ গান ছড়ায় মেতে উঠলাম..

সন্ধ্যা হতে না হতেই অরূপদার বাড়ি…কাঁচালঙ্কা,পেঁয়াজ,বাদাম,ধনেপাতা দিয়ে মুড়িমাখা খেতে খেতে বাড়ির সদস্যদের সাথে আড্ডা চলল….রাতে খেলাম রুটি ,মাংস,আলু সোয়াবিনের সবজি,চমচম আর খেজুর গুড়…পরেরদিন সকালের গন্তব্য ঠিক হল কাছাকাছির মধ্যে কাঁসাইনদীর তীর আর নির্ভয়পুর শবর গ্রাম…

সকালে ঘুম থেকে উঠে স্নান সেরে গেলাম চরণপাহাড়ি কালীমন্দির দর্শনে…সিঁড়ি বেয়ে উঠে বেশ খানিকটা উপরে শিব, কালী আর বজরংবলীর মন্দির…..মন্দিরের পিছনে ধু ধু খেত…মন ভালো করা,আলো করা একটা দিনের সুন্দর শুরুওয়াত…..

এরপর একটা লোকাল অটো ধরে গেলাম পুঞ্চা শ্মশান….নদীর তীরে নিরিবিলিতে…বাঁশের মাচা,চিতার ছাই মনে করিয়ে দিল দিন ফুরোবার কথা…বেঁচে থাকাটাকে আরও নিবিড়ভাবে ভালোবাসার কথা…. মনে হল খেলাঘর ভেঙ্গে যাবে, তার আগে আরও একটু বিশ্বাসে,আস্থায়,প্রেমে,বন্ধুত্বে বেঁধে বেঁধে থেকে,কৃত্রিমতার নির্মোক ছেড়ে বেরিয়ে এসে বেঁচে নেওয়ার এই শেষ সুযোগ….আজ থেকে একশ বছর পর কোথায় আমি আর কোথায়ই বা আমার জীবন জুড়ে থাকা ঘাত প্রতিঘাত,যন্ত্রণারা??…”আমি বহু বাসনায় প্রাণপণে চাই,/ বঞ্চিত করে বাঁচালে মোরে”….

এরপর অরূপদার বাইকে চড়ে কাঁসাই নদীর তীরে….নদীর বুকে চরা,কিন্তু রূপবত্তায় খামতি নেই বিন্দুমাত্র….মহাশ্বেতাদেবীর স্কুল আর গরীব শবরদের গেরস্থালী দেখে বিদায় নিলাম দুপুরের খাওয়ার ডাক আসায়…ভাত,মুসুর ডাল,কুমড়ো আলুর ঘ্যাঁট,শীতের সবজি দিয়ে পাঁচ মিশালি তরকারি আর ধনেপাতা দিয়ে মাছের ঝোল…জম্পেশ খাওয়া শেষে বেরোলাম রবিবারের স্থানীয় হাট দেখতে…সবজি,জামা,জুতো,গামছা,চাদর,সাজের সরঞ্জাম – কিছুই অমিল না সেখানে….

সন্ধ্যাবেলায় দিদা বসল মাটির উনুনে,কাঠের আগুনে আসকে পিঠা ভাজতে…নতুন খেজুর গুড় সহযোগে রাতের মেনু ওটাই….কাজলিকে আদর করে, দুদিন আগেও না চেনা মানুষগুলোর জন্যে একরাশ মনখারাপ নিয়ে,আবার আসার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ফিরে এলাম লজে….পরদিন ভোরেই যে পুরুলিয়াকে বিদায় জানাতে হবে!!….

আসলে, দূরে চলে গেলে ফিরে আসা যায়….বারবার,অনেকবার…..নতুন করে পাওয়া হয় চেনাজানার আস্তরণে চাপা পড়ে যাওয়া যা কিছু ,তাকে…গ্রামবাংলার সহজ সরল রূপের খনি ছেনে যে মুহূর্তরা উঠে এল তারাই সুখস্মৃতি হয়ে রয়ে যাবে আজীবন….মনের বাগানে ফুল হয়ে ফুটে থাকবে…

ছবি: লেখক