স্বজনের মাঝে আমি এখন

শেখ রানা (নিউবুরি পার্ক, লন্ডন)

শাহজাহানপুরে স্বজনদের সঙ্গে সকালের নাস্তা সেরে রিকশায় উঠে বসি। শহরে তখন আরামদায়ক শীতের সকাল। হাইকোর্ট এর মাজার গেট পার হয়ে টি এস সি আসতেই রিকশা থামে।

শহীদ মিলন ভাস্কর্য পার হয়ে হাঁটা পথে মনে পরে পদ্ম-কে। হাকিমের চা দোকানে রঙ চা খেতে খেতে গান নিয়ে আড্ডা হতো আমাদের। হাঁটতে হাঁটতে পর্যটক মনে হয় নিজেকে, নস্টালজিক পর্যটক। আমি কোনদিন ছবি তোলায় আনন্দ পাইনি। এবার ফিরে এসে স্মৃতিকাতর জায়গাগুলো, পরিচিতি স্বজন-সবার সঙ্গে নিজেকে ফ্রেম বন্দী করতে ইচ্ছে করে। ভাবনার এই অদ্ভুত বৈপরিত্যে আমি মনে মনে খানিক চমকাই। আমি কী বদলে গেছি?

জাদুঘর এর সামনে আসতেই আমার সামনে দৃশ্যমান হয় পাঁচ ফেব্রুয়ারী, একটা দুপুর। কিছু তীব্র অনলের আঁচ ছুঁয়ে যায়। দ্রোহ আর কালো ফেট্টি দেয়া কপাল, জয় বাংলা আর দ্বিধা, পরিচিত কিছু মুখ-এইসব মুহূর্ত থমমে দেয় আমাকে। আমি ছবি তুলতে গিয়েও মোবাইল পকেটে রেখে দেই। হৃদয় খুড়ে তবু আমি বেদনা জাগাতে ভালোবাসি।

শাহাবাগ ধরে আজিজ মার্কেট পার হই। উর্ধ্বনেত্রে দেখি আজিজ এর দোতলায় অসম্ভব সুবেশ কিছু মানুষ রেলিং ধরে নির্বিকার দাঁড়িয়ে আছে। কারো মাথায় চুল নেই। অনুপল! ভ্রম কাটে। ম্যানিকুইন। আমরা পরস্পর দৃষ্টি বিনিময় করি।

কাঁটাবন আসতেই কনকর্ড লেখা বিল্ডিং। অনুপ্রাণন এর একটা শো রুম আছে এখানে, আমার মনে ছিল। কুয়াশা সকাল তখন মাত্রই যাই যাই করছে। খোলা পাবো কী না দোলাচলে গিয়ে দেখি সারি সারি বই সাজানো। উপন্যাস/ ভ্রমণ কাহিনী লেখা শেলফে যত্ন করে রুল টানা খাতা। দেখে আমার মনে একটা শান্ত চড়ুই উড়ে আসে। ছটফট করে না এতটুকু। শান্ত চড়ুই পৃথিবীর শান্ততম প্রাণী। হামীম এর উপন্যাসেও চোখ আটকে যায়। সুন্দর হলুদ মলাটের হিমু যেন মলাটবন্দী হয়ে আছে ঠায়।

দুটো রুল টানা খাতা কাঁধব্যাগে নিয়ে রাস্তায় আসতেই আমি চিন্তা করি কোথায় যাবো! ঠিক এই মুহূর্তে আমার কোনো পরিকল্পনা নেই। আমি মোবাইল বের করে টাইম মেশিন এপ্লিকেশন এ গিয়ে একটা টাইম মেশিন এ ক্লিক করি। সাত মিনিট পরে টাইম মেশিন ড্রাইভার সমেত হাজির। উঠে বসতেই জিজ্ঞাসু দৃষ্টির সামনে বলি, ‘ডিসেম্বর, নব্বই। হাইকোর্ট কম্পাউন্ড।’

বিনা বাক্য ব্যয়ে টাইম মেশিন আমাকে নিয়ে চলে পুরোনো কাঙ্ক্ষিত দিনে। সকাল কুয়াশা রোদে আলিঙ্গন করে আর একটু ওম দিয়ে। খুব কম সময়ের পরিভ্রমণ শেষে আমি গন্তব্যে পৌঁছাতেই দেখি জাফর ভাই, রানা, বাবু, শরীফ, পলাশ, টগর, হীরা ভাই-সবাই টেনিস বলে ক্রিকেট খেলার তোড়জোড় করছে। মাত্রই দল ভাগ হবে। যথারীতি হীরা ভাই ভালো খেলোয়ারদের নিজ দলে নিয়ে নিচ্ছে। আমি তাহলে ঠিক সময়েই এসেছি।

এ রকম হলে ভালো হতো। কিন্তু সব ভালো আমার পাঞ্জাবীর পকেটে কখনই ছিলো না। মোবাইল এপ্লিকেশানে নতুন শেখা উবার এ ক্লিক করতে একটা টয়োটা করোলা চলে আসে। আমি অল্পতে অবাক হই। ‘স্যার, কোথায় যাবেন?’-শুনে কুন্ঠিত হই যুগপৎ। আমি কুন্ঠিতও হই অল্পতেই। সেই অল্প-স্বল্পের সমাহার নিয়ে মিরপুরের দিকে ফিরতে থাকি। ধানমন্ডিতে সময় করে নতুন বন্ধুর সাথে দেখা করা হলো না আজও।কবেই বা সময়ে আমি জানান দিয়েছিলাম নিজের উপস্থিতি।

ছবি: লেখক