গোমতীর বাঁশরী কুমিল্লা

 

মেহেরুন্নেছা

ধেয়ে চলেছে জীবন। কত সুখ-দুঃখ, কত হাসি-কান্না, কত আশা-আকাঙ্ক্ষা, কত ঘৃণা-ভালোবাসাকে পেছনে রেখে ছুটে চলেছি এক শহর থেকে আরেক শহরে। সঙ্গী হয়েছে স্বপ্নেরা। আবার ব্যথিত করেছে স্বপ্ন-ভঙ্গেরা। যদি প্রশ্ন করা হয়…  কোন শহরটি আমার? উত্তরটা ঠিক এরকম… জীবন যখন যেখানে এসে দাঁড়িয়েছে, ঠিক সে মুহুর্তে সেটিই আমার শহর। শৈশব, কৈশোর আর যৌবনের মানসিক টানা-পোড়েনের সময়টা কেটেছে চট্টগ্রাম শহরে। খন্ড খন্ড প্রথম স্মৃতিপটের বেশিরভাগ জুড়েই রয়েছে চট্টগ্রাম। তারপরেও সব পিছুটানকে ঝেড়ে ফেলেছি। এক যুগেরও অধিককাল ধরে ভোরের রবির প্রথম দীপ্তির পরশ নিচ্ছি কুমিল্লা শহরেই।

কর্মজীবনের শুরুটা কুমিল্লাতেই। এখন পর্যন্ত কুমিল্লাতেই রুটি-রোজগার চলছে। নির্দ্বিধায় কুমিল্লা শহর করেছে জীবনকে প্রশান্তিময়। স্কুল- কলেজ, কর্মস্থল, মার্কেট, হাসপাতাল, বাজার…সবই কাছাকাছি। যানজট নেই বললেই চলে।যেটুকু আছে তা নিমিষেই পায়ে হেঁটে অতিক্রম করে ঝামেলা এড়ানো যায়। বেঁচে থাকার ছন্দ
খুঁজে পেলাম কুমিল্লা শহরে। ধীরে….! বলা যায়
অতি সন্তর্পনে কুমিল্লার ইতিহাস, ঐতিহ্য, স্মৃতি
সর্বোপরি এই শহরের মানুষগুলো আমায় ভালোবাসার অমিয় ধারায় প্রতিদিনই আপ্লুত করে যাচ্ছে। এখান থেকে আমি রাজধানীর আবহটা নিতে পারি।  কোনো কোনো ক্ষেত্রে কুমিল্লা যেনো রাজধানীর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ছুটে।
সবচেয়ে বড় কথা রাজধানী ঢাকা শহর থেকে কুমিল্লা শহর মাত্র ১০০ কিলোমিটার দূরে দক্ষিণ-পূর্ব দিকে অবস্থিত। কুমিল্লার প্রধান তিনটি নদী মেঘনা, গোমতী ও ডাকাতিয়া। তবে শহরটি গোমতী নদীর তীরে।  কুমিল্লা ছিলো প্রাচীন সমতট অঞ্চলের অধীনে। ১৭৯০ সালে যে জেলাটি ছিলো ত্রিপুরা সেটি ১৯৬০ সালে কুমিল্লা নাম ধারন করে। ঐতিহাসিক গ্রান্ড-ট্রাঙ্ক রোডের বর্ধিতাংশ কুমিল্লা কোর্ট রোড যা চট্টগ্রাম বন্দরের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষায় ব্যবহৃত হয়।

কুমিল্লা শহরের প্রাণকেন্দ্রে রয়েছে গণপাঠাগার ও নগর মিলনায়তন। এটি “টাউন হল” নামে পরিচিত। এ টাউন হলে পদধূলি দিয়েছেন মহাত্মা গান্ধী, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস, মওলানা ভাসানী, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।  ৬৩ টি আলমারিতে সজ্জিত আছে ৩০ হাজার বই। ত্রিপুরা জেলার চাকলা রোশনাবাদের জমিদার নরেশ মহারাজ ‘ বীরচন্দ্র মানিক্য বাহাদুর’ নিজস্ব অর্থায়নে টাউন হল ভবন করে দেন। সময়টা ছিলো ১৮৮৫ সালে। কুমিল্লার খাদি কাপড় -বাটিক কাপড় এবং
রসমলাই এর সুনাম ও জনপ্রিয়তার কথা বলাই বাহুল্য। জেলা শহর হলেও এখানে আছে একটি সরকারী মেডিকেল কলেজ এবং বেশ কয়েকটি প্রাইভেট মেডিকেল কলেজ। আছে ছায়াঘেরা পাহাড়ী পরিবেশে একটি বিশ্ববিদ্যালয় যা কুমিল্লা
বিশ্ববিদ্যালয় নামে পরিচিত।

ময়নামতি

আমার কর্মস্থল কুমিল্লার সবচেয়ে পুরাতন এবং এতিহ্যবাহী কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ যা ১৮৯৯
সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। রায় বাহাদুর আনন্দ চন্দ্র রায় রাণী ভিক্টোরিয়ার নামে এটি প্রতিষ্ঠা করেন।
আনন্দ চন্দ্র রায় ছিলেন পেশায় ঠিকাদার এবং প্রচন্ড শিক্ষা-অনুরাগী। ভিক্টোরিয়া কলেজ প্রতিষ্ঠার পর ব্রিটিশ সরকার তাঁকে “রায় বাহাদুর” উপাধি প্রদান করেন। এখনো তাঁর স্মৃতি বহন করছে ভিক্টোরিয়া কলেজের ইন্টারমিডিয়েট শাখায় প্রধান ফটকে একটি সাদা রঙ্গের ভাস্কর্য যেটি আনন্দ চন্দ্র রায়ের স্মৃতিকে করেছে অম্লান।  কুমিল্লা শহরের তাল পুকুরের দক্ষিণ পাড়ে ছিলো এই মানুষটির বসবাস।এই কলেজের প্রথম অধ্যক্ষ ছিলেন শ্রদ্ধেয় সত্যেন্দ্রনাথ বসু। আরো কত গুণীজনের পদচিহ্ন পড়েছিলো এই কলেজে যাঁরা ভিক্টোরিয়া কলেজের ছাত্র হিসেবে কলেজকে করেছেন গৌরবান্বিত। যেমন কুমার শচীন দেব বর্মনের কথা না বললেই নয়।

“শোনগো দখিনো হাওয়া, প্রেম করেছি আমি
লেগেছে চোখেতে নেশা দিক ভুলেছি আমি..!”

শচীনের এই গান আর আয়েশী ভঙ্গিতে এক কাপ চা —- আম-কাঁঠালের তরুর পাশে আমার নীড়খানির চিরচেনা বারান্দায় কিছুক্ষণ হারিয়ে যাওয়ার মূহুর্তটা যেনো একটি ব্যস্ত দিনের শুভ-সূচনা করে দেয়।

শচীন দেব বর্মন যিনি এসডি বর্মন নামে পরিচিত।  মীরা দেব বর্মন ছিলেন শচীনের প্রথমে ছাত্রী এবং পরে সহধর্মিনী । মীরাও ছিলেন বিখ্যাত গীতিকার। এই দম্পতির পুত্র রাহুল দেব বর্মণ যিনি ভারতের বিখ্যাত সঙ্গীত পরিচালক ও সুরকার। শচীন দেব বর্মনের পিতা হলেন নবদ্বীপচন্দ্র বর্মন। এই বিখ্যাত শিল্পীর পিতাও ছিলেন একজন সেতারবাদক ও ধ্রুপদী সঙ্গীতশিল্পী। তিনি ত্রিপুরা রাজ্যের মহারাজ হলেও পারিবারিক দ্বন্দ্ব-কলহ-ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে নিজের প্রাণ বাঁচাতে রাজবাড়ির কর্মকর্তা শ্রী কৈলাস সিংহের পরামর্শে সপরিবারে কুমিল্লায় চলে আসেন এবং কৈলাসের পরামর্শে সিংহাসনের দাবীও ছেড়ে দিয়েছিলেন। এই কৈলাস সিংহ হলেন বিখ্যাত “রাজমালা” গ্রন্থের লেখক যা কুমিল্লা টাউন হল পাঠাগারে রক্ষিত আছে। কুমিল্লা শহরের চর্থায় মহারাজ বাড়ি নির্মান করেন ব্রিটিশ আদলে ; কিন্তু সেটি রাজপ্রাসাদের মত ছিলোনা। এহেন বাবার পুত্রই হলেন শচীন দেব বর্মন। আমার বর্তমান বাসস্থানের কাছাকাছি থাকতেন এই কিংবদন্তীতুল্য ও জনপ্রিয় সংগীত শিল্পী … ব্যাপারটি আমাকে বেশ পুলকিত করে।

নজরুল ইনস্টিটিউট কেন্দ্র

বলা হয়ে থাকে … কুমিল্লার মাটি ধন্য; কবি নজরুলের জন্য। দ্রোহের কবি-প্রেমের কবি নজরুলের রয়েছে কুমিল্লা শহর কিংবা কুমিল্লাবাসীর সঙ্গে অটুট বন্ধন।

” আমি চিরতরে দূরে চলে যাবো,
তবু আমারে দেবোনা ভুলিতে….!”

চিরভাস্বর এই বাণী আজো প্রতিধ্বনিত হয় কুমিল্লায়। কুমিল্লার মুরাদনগর উপজেলার দৌলতপুরে কেটেছিলো কবির যৌবনের কিছু উজ্জ্বল সময়। সেথায় এক নারী দূরন্ত কবির জীবনের গতিপথটাই পাল্টে দিলো। এই নারীকে কবি আদর করে ডাকতেন ‘নার্গিস’ নামে। নার্গিসের সঙ্গে বিবাহ-বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন বটে; কিন্তু কোনো এক অজ্ঞাত কারনে বিয়ের রাতেই তিনি দৌলতপুর ছেড়ে চলে যান। নজরুলের দ্বিতীয় বিয়ে হয় কুমিল্লার কান্দিরপাড় এলাকার মেয়ে আশালতা সেনগুপ্তা প্রমীলার সঙ্গে। প্রমীলার সঙ্গেই ছিলেন আমৃত্যু।
কুমিল্লা শহরের ঝাউতলার রাস্তা থেকে ১৯২২ সালের ২০ নভেম্বর নজরুল গ্রেফতার হন। ধূমকেতু পত্রিকায় ” আনন্দময়ীর আগমনে” শীর্ষক কবিতাখানির জন্য কবিকে গ্রেফতার করা হয়।

পুরো কুমিল্লা জুড়ে এই কবির স্মৃতিচিহ্ন। ঐতিহ্যবাহী ভিক্টোরিয়া কলেজ সংলগ্ন রাণীর দিঘীর পশ্চিমপাড়ে কৃষ্ণচূড়া গাছের নীচে তিনি  তরুণদের নিয়ে বসতেন। চলতো জমজমাট আড্ডা ও কবিতা-গানের আসর। প্রমীলার কাছে লিখতেন গান ও চিঠি। সে স্থানে এখনো রয়েছে নজরুলের একটি মহিমান্বিত স্মৃতিফলক। ধর্ম সাগরের পশ্চিম পাড়ে বসেও নজরুল গান ও কবিতা লিখতেন।

ত্রিপুরা থেকে কুমিল্লা…এই নামকরনের ধর্মীয় ইতিহাসটি না বললেই নয়। হযরত শাহজালাল (রঃ) তাঁর মামা আহমেদ কবীর এর কথামত এক মুঠো মাটি নিয়ে চতুর্দশ শতকে ধর্ম প্রচারে বের হন। উনাকে বলা হয় ধর্ম প্রচার শুরু করতে হবে ঠিক সেই জায়গা থেকে যেখানকার মাটি এই মাটির সঙ্গে মিলে যাবে। বহুস্থান ঘুরে অবশেষে কুমিল্লাতেই মিললো সেই মাটির মত মাটি। মাটি খু্ঁজে পাওয়ার আনন্দে হযরত শাহজালাল বলে উঠেন … ‘কোহমিলা’ অর্থাৎ ‘কাঙ্ক্ষিত মাটি’।
মনে করা হয় তখনকার সেই ‘কোহমিলা’
থেকেই আজকের ‘কুমিল্লা’ নামকরন হয়েছে। আর এখান থেকেই শুরু হয় হযরত শাহজালাল(রঃ) এর ধর্ম প্রচার।

ধর্মসাগর পাড়ে অবস্থিত রাণীর কুঠি

একটি শহর শুধু শহর নয়। একটি শহর মানে ইতিহাস। একটি শহর মানে ঐতিহ্য। ইতিহাসের
পরতে পরতে আপনি হাঁটুন আর নিজের জানার পরিধিটা সমৃদ্ধ করুন। কুমিল্লার ইতিহাসের আরেক উজ্জ্বল নক্ষত্র উপমহাদেশের একমাত্র নারী নবাব ফয়জুন্নেসা চৌধুরাণী। তাঁর বাবা ছিলেন জমিদার আহমদ আলী চৌধুরী ও মা আরফান্নেসা। এই দম্পতির তিন কন্যা ও দুই পুত্র সন্তানের মধ্যে ফয়জুন্নেসা ছিলেন প্রথম সন্তান।
সে সময়ের জমিদার বাড়ি ছিলো কঠোর পর্দাপ্রথার অধীন ও চরম রক্ষণশীল। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা না থাকলেও অদম্য স্পৃহা ও গৃহ শিক্ষকের কল্যাণে তিনি আরবী, ফার্সী, বাংলা ও সংস্কৃত ভাষায় দক্ষতা অর্জন করেন।
তিনি বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন কুমিল্লার ভাউকসারের জমিদার মোহাম্মদ গাজী চৌধুরীর সাথে। তাঁদের ছিলো দুজন কন্যা সন্তান। কথিত আছে নওয়াব ফয়জুন্নেসা বিয়ের সতের বছরের মাথায় জানতে পারেন তিনি তাঁর স্বামীর দ্বিতীয় স্ত্রী। এই মহিয়সী নারী কোনোভাবেই তা মেনে নিতে পারেন নি। ফলে গাজী চৌধুরীর সঙ্গে বিচ্ছেদ হয়ে যায়। তারপর তিনি লাকসামের পশ্চিমগাঁওয়ে নিজ জন্মস্থানে পিতা-মাতার কাছে ফিরে আসেন। তাঁরা ছিলেন মোগল রাজত্বের উত্তরসূরী। জমিদার পিতা-মাতার প্রথম সন্তান হওয়ার সুবাদে তিনি পশ্চিমগাঁও এর জমিদারি লাভ করেন। মায়ের মৃত্যুর পর মাতুল সম্পত্তিরও উত্তরাধিকারী হন।

সংস্কারমুক্ত সমাজ গঠন, শিক্ষা, সমাজকল্যাণ ও সেবাব্রতে এই ঐতিহাসিক নারীর অবদান অনস্বীকার্য। তিনি বেগম রোকেয়ার জন্মের ৪৬ বছর আগে ১৮৩৪ সালে জন্মগ্রহণ করেন। আবার বেগম রোকেয়ার জন্মের সাত বছর আগে নারী শিক্ষার অগ্রগতির লক্ষ্যে উচ্চ ইংরেজী বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দূঃসাহস দেখিয়েছিলেন। তাঁর বহু দূঃসাহসের একটি কুমিল্লা শহরের বাদুড়তলায় প্রতিষ্ঠিত ফয়জুন্নেসা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়। ১৯৩১ সালের ১৪ ডিসেম্বর সুনীতি চৌধুরী ও শান্তি ঘোষ নামে দুই ছাত্রী গুলি করে ম্যাজিস্ট্রেট মিস্টার স্টিভেন্সকে হত্যা করে।। সেটাই ছিলো স্বাধীনতা আন্দোলনে কোনো নারীর প্রথম অংশগ্রহণের ঘটনা।

লাকসাম নওয়াব ফয়জুন্নেসা সরকারি কলেজটিও এই মহিয়সী কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত। প্রায় বছরখানিক ডাকাতিয়া নদীর পাড়ের  ঐতিহ্যবাহী কলেজটিতে চাকুরীর সৌভাগ্য হয়েছিলো। অপূর্ব কলেজের প্রাকৃতিক শোভা।
এখনো মনে দাগ কেটে আছে শ্রেণীকক্ষ থেকে দৃশ্যমান নদীর অপরূপ দৃশ্য। যদিও নদীটি তার নাব্যতা হারিয়েছে। কূলকূল ধ্বনি আর শোনা যায়না। তথাপি নদী দিয়ে চলছে দিনমান অসংখ্য নৌযান। কলেজের পাশেই নওয়াব ফয়জুন্নেসার ঐতিহ্যের ধারক বাসস্থান। রক্ষনাবেক্ষনের অভাবে এসবই ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে।

তিনি নির্মান করেন বহু পুল, ব্রীজ, কালভার্ট, মসজিদ ও দাতব্য চিকিৎসা কেন্দ্র। শিক্ষা বিস্তারের পাশাপাশি তিনি ছিলেন একজন সাহিত্যপ্রেমী। তাঁর রচিত কাব্যগ্রন্থের নাম ‘রূপজালাল’। এছাড়াও ‘সঙ্গীত সার’ ও ‘সঙ্গীতলহরী’ নামে দুটি কবিতার বই প্রকাশিত হয়।

ধর্মসাগর পাড়

তাঁর শিক্ষানুরাগ, পৃষ্ঠপোষকতা ও সেবাব্রতের কথা বলে শেষ করা যাবেনা। অসাধারণ উদ্যমী ফয়জুন্নেসাকে বৃটেনের রাণী ভিক্টোরিয়া ‘বেগম’ উপাধি দেন। ‘বেগম’ স্ত্রীলিঙ্গ বলে তিনি এই উপাধি প্রত্যাখান করেন। পরে ১৮৮৯ সালে রাণী ফয়জুন্নেসাকে ‘নওয়াব’ উপাধি দেন। তিনি প্রথম মুসলিম মহিলা জমিদার হিসেবে ভারতবর্ষে ‘নওয়াব’ খেতাবে ভূষিত হন।

 

কুমিল্লা শহরের ইতিবৃত্ত মানে কুমিল্লার ইতিহাসের
বর্ণাঢ্য উপস্থাপন। টাকডুম টাকডুম স্বরে বাংলাদেশের ঢোল এখান থেকেই শচীন দেব বর্মণের কণ্ঠে বেজে উঠেছিলো। এই কুমিল্লা শহরের দক্ষিণ পাশ দিয়ে টমছম ব্রীজ নামক স্থানের উপর দিয়ে কর্কটক্রান্তি রেখা চলে গিয়েছে। কি অদ্ভূত!  অথচ সেই ঐতিহাসিক পৃথিবীবিখ্যাত স্থানটিতে টমছম ব্রীজের অস্তিত্ব
খুঁজে পেতে আপনার দৃষ্টির অনুশীলন বহুক্ষণ ধরে চালাতে হবে। অবশেষে নয়ন যুগলের কসরত শেষে মিলবে ছোট একটি কালভার্ট সদৃশ ব্রীজ। এটাই কুমিল্লা শহরের বিখ্যাত ‘টমছম ব্রীজ’।

কুমিল্লা শহর থেকে ১০ কিলোমিটার পশ্চিমে ‘বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন একাডেমী’ বা ‘বার্ড’ অবস্থিত। এটি একটি স্বায়ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠান যার মূল পরিকল্পনাকারী ড. আখতার হামিদ খান।
এ প্রতিষ্ঠানটি পল্লী অঞ্চলের মানুষের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন তথা পল্লীর দারিদ্র্য বিমোচনে নিরলস সহায়তা করে যাচ্ছে। এ লক্ষ্যে এখানে চলে প্রশিক্ষণ, গবেষণা ও প্রায়োগিক গবেষণা।

কুমিল্লা ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানের জন্য
বিখ্যাত। এগুলোর মধ্যে লালমাই, ময়নামতি, শালবন বিহার, ওয়ার সিমেট্রি, ধর্মসাগর উল্লেখযোগ্য।

অষ্টম শতাব্দীতে রাজা বুদ্ধদেব শালবন বিহার
নির্মাণ করেন। এ বিহারের কক্ষগুলোতে বৌদ্ধ
ভিক্ষুরা থাকতেন। সেই সঙ্গে জ্ঞানার্জন ও ধর্মচর্চা
করতেন। এখানে ১১৫ টি কক্ষ, প্রশস্ত চত্বর ও মধ্যখানে ক্রুশাকারের মন্দির অবস্থিত। মন্দিরের একমাত্র প্রবেশপথটি উত্তর দিকে মুখ করা যা অনেকটা পাহাড়পুর মঠের মত। পাশেই রয়েছে ময়নামতি যাদুঘর। ৭ম ও ৮ম শতাব্দীর ঐতিহাসিক নিদর্শণ; যেমন … তাম্রফলক, স্বর্ণ ও রৌপ্য মুদ্রা, ব্রোঞ্জের তৈরি মূর্তি, পাথরের ভাস্কর্য ও পোড়া মাটির ফলক এই যাদুঘরে সংরক্ষণ করে রাখা আছে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নিহত সৈনিকদের ৯ টি সমাধিক্ষেত্র রয়েছে বাংলাদেশ, আসাম ও মিয়ানমারে। তবে বাংলাদেশে আছে ২ টি… একটি চট্টগ্রামে এবং অপরটি কুমিল্লাতে। কুমিল্লার ওয়ার সিমেট্রি প্রচুর গাছ-গাছালি সমৃদ্ধ এবং প্রশান্তিময় যেথায় মোট ৭৩৬ টি কবর বিদ্যমান।

কুমিল্লা শহরের একেবারে মধ্যস্থলে অপূর্ব প্রকৃতিক সৌন্দর্যমন্ডিত একটি দীঘি রয়েছে যা ধর্মসাগর নামে পরিচিত। ১৪৫৮ সালে ত্রিপুরার অধিপতি মহারাজা প্রথম ধর্ম মানিক্য এই ধর্মসাগর খনন করেন। মূলত এই অঞ্চলের মানুষের জলের কষ্ট নিবারণার্থে দীঘিটি খনন করা হয় এবং মহারাজা ধর্মমানিক্যের নামানুসারে এর নামকরন করা হয়। কত উপাখ্যান আর উপকথা ছড়িয়ে আছে এই দীঘি নিয়ে। শহরবাসীর নিকট দীঘিটি কাঙ্ক্ষিত বিনোদন কেন্দ্র। সারাদিনের কর্মব্যস্ততার সকল গ্লানি ধুয়ে-মুছে দেয় এখানকার নির্মল বাতাস। ধর্মসাগরের
উত্তর কোণে রয়েছে রাণীর কুঠির, পৌরপার্ক
এবং নজরুল ইনস্টিটিউট। পূর্বপাড়ে কুমিল্লা স্টেডিয়াম ও কুমিল্লা জিলা স্কুল এবং পশ্চিম পাড়ে বসার ব্যবস্থা আছে। দীঘিপাড়ের স্বর্ণচাঁপার সারি এবং অন্যান্য বৃক্ষ আপনাকে নিয়ে যাবে এক অচেনা ভুবনে। হেথায় শীতে আগমন ঘটে অতিথি পাখির।

যাপিত জীবনের স্থানিক রং ও স্থানিক পরিবেশবিধৌত কুমিল্লা এতোক্ষন ধরে আমায় নিয়ে গেলো এক অতিন্দ্রীয় ঐশ্বরিক মায়ার জগতে। পৃথিবীটা মায়ার সমুদ্র। নিরন্তর মানবকে  কেবলি মায়া আচ্ছন্ন করে রাখে। অবশেষে কুমিল্লা হয়ে গেলো মায়ার শহর… প্রাণের শহর…
আমার শহর। কুমিল্লার ইতিহাসের মর্মর ধ্বণিতে বাজে এক টুকরো বাংলাদেশ। জীবনের এই বেলায় ‘আমার শহর… কুমিল্লা’ ছেড়ে আর কোথাও যাওয়ার ইচ্ছে একদমই মনের গহীনে উঁকি দিয়ে সুবিধা করতে পারছেনা।

রায় বাহাদুর আনন্দ চন্দ্র রায়!

মনে পড়ে গেলো জীবনানন্দের রূপসী বাংলা।

“তোমার যেখানে সাধ চলে যাও…
আমি এই বাংলার পারে,
রয়ে যাব; দেখিব কাঁঠাল পাতা
ঝরিতেছে ভোরের বাতাসে।”

সেই বারান্দা; সেই এক কাপ চা; সেই শুকনো কাঁঠাল পাতার ঝংকার… এখনো কুমিল্লায় মিলে
ভোরের বাতাসের সঙ্গে সেই কল্পলোকের অনির্বাণ সুর।

হায় কুমিল্লা! হায় চিরচেনা বাংলা! হায় জীবনানন্দ!

“ভোরের দোয়েল পাখি—
চারিদিকে চেয়ে দেখি পল্লবের স্তুপ;
জাম-বট-কাঁঠালের-হিজলের-
অশ্বত্থের করে আছে চুপ;”

আজিকে হৃদয় মন্দিরে নবীন ধান্যের পুলক আনিছে আমার এই শহর। হেথায় কাশের বনে দুলিছে মম হিয়া। ওগো!  আজিকে শ্রাবণঘন বরিষণমুখর হর্ষ নিয়ে এলো এই শহর। এই শহরে
কত ঝড়ের রাতে অভিসারে মত্ত ছিলুম পরাণ সখার সঙ্গে। নিবিড় ছায়া কিনারায় ছলোছলো করিছে এ কোন নদীর ধারা!

হ্যাঁ গো হ্যা!  এ যে সেই শহরঘেঁষা গোমতীর ধারা! সেই নদীটির পাড়ে গহন দ্বারে বাজিছে নজরুলের
অমোঘ বাণী …

” আজো মধুর বাঁশরী বাজে,
গোমতীর তীরে পাতার কুটিরে,
আজো সে পথ চাহে সাঁঝে…!”

ছবি: লেখক

(সহকারি অধ্যাপক, উদ্ভিদবিজ্ঞান, কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজ।)