আমাদের আরশি মে বসু

অদিতি বসু রায়

ফেইসবুক এর গরম আড্ডা চালাতে পারেন প্রাণের বাংলার পাতায়। আমারা তো চাই আপনারা সকাল সন্ধ্যা তুমুল তর্কে ভরিয়ে তুলুন আমাদের ফেইসবুক বিভাগ । আমারা এই বিভাগে ফেইসবুক এ প্রকাশিত বিভিন্ন আলোচিত পোস্ট শেয়ার করবো । আপানারাও সরাসরি লিখতে পারেন এই বিভাগে। প্রকাশ করতে পারেন আপনাদের তীব্র প্রতিক্রিয়া।

কবিদের পাল্লায় পড়লে জীবন শেষ। তাদের যে এমন কাব্য-আখড়া থেকে অপারেশন থিয়েটার অব্দি বিচরণ – তা আগে কে জানত! ব্যাপার ঘোরালো । খোলসা করে দি! চার তারিখ কলম্বিয়া এশিয়ায় ভর্তি। সকাল পাঁচটায় উঠে স্নান সেরে যাব ভেবেছিলাম। কিন্তু সেদিনই বছরের সেরা ঠাণ্ডা পড়ে গেল! রিনি’দি জানিয়েছিল, আগামি দু’সপ্তা স্নানের গল্প থাকবে না। তবু কিছু করার নেই। ডাক্তারবাবু বারবার বলেছেন, ঠান্ডা যেন না লাগে! নি-লেন্থ জিন্স আর পিঙ্ক-লাল স্লিটের কুর্তা চড়িয়ে ঠিক সাতটায় হাজির হয়ে গেলাম নার্সিং হোমে। এর মধ্যেই একচোট ঝগড়াও হয়ে গেল। এই প্রথম দেখি, বাপ্পাবাবু চুপ করে বিনা প্রতিবাদে ফুলটশ বল সব ছেড়ে দিচ্ছেন।
আমি ততক্ষনে নিশ্চিত যে ঠিক মরে যাব। সোনাঝুড়ি রোদভরা সকাল, ইংলিশ চ্যানেলের মত স্বচ্ছ ভি আই পি রোড, ঝুলন দিনের মত উপনগরীর পথ পেরিয়ে গেল আনমনে। আতঙ্কে অস্থির আমি। তবে কিনা মৃত্যুভয়েও জলাতঙ্ক কাটে নি। এক অকুতোভয় মহিলা দেখি একমাথা ভেজা চুল নিয়ে( ১০০% স্নান করে এসেছেন) ওই ভোরে খুবই ব্যক্তিত্বের সঙ্গে রিসেপসন ডেস্কে হইচই করেছেন। তাঁরও আমার মতই অবস্থা! সেদিনই সি-সেকশন হবে। কিন্তু মেজাজ একেবারে ৯০ ডিগ্রিতে।
এদিকে আমি এতদিনের শার্দুলনীর ইমেজ হারিয়ে একেবারে মিনমিনে বেড়াল! এই নশ্বর দুনিয়ার কিছুতেই আর কিছু এসে যায় না। এই কয়েক দিন ভারি উদাস হয়েই ছিলাম। ভয় – অনিশ্চয় নিয়ে জ্বালিয়ে মেরেছি ঐত্রেয়ী, রাকা,শ্বাশতী, বিশাখা,স্ম্রাজ্ঞী, সুপর্ণা, এপ্রিলকে। বাকিরা যথাযথ আদর দিয়ে মাথায় তুলেওছে। অফুরন্ত ঘ্যানঘ্যান করে মাথা খেয়েছি সক্কলের। তবে কিনা হাতের পাঁচটা আঙুল কি আর সমান হয় ? ঐত্রেয়ীকে যখন বলেছি, “আমি ঠিক মরে যাব বুঝলি।” সে যম উত্তর দিয়েছে, ” তোমার কবিতার খাতাটা কি বাপ্পাদার কাছে আছে?”
-” হ্যাঁ। কেন?”
-“না মানে, বাই চান্স মরে যাও যদি ‘অগ্রন্থিত অদিতি’ ছাপবে ঋত।”
এরম বন্ধু হলে শত্রুর দরকার থাকে না মানুষের। যাক গে, ক্ষমাই পরম ধর্ম ! আর তো কয়েক ঘণ্টা!
এরপর হাতে চ্যানেল করতে গিয়ে নার্স দু-দুবার ফেল! চিৎকার – সকাল দশটা পিছিয়ে বেলা ১১টা ৪০শে ওটিতে এন্ট্রি। ব্যস! একসঙ্গে গোটা তিনেক কবির হাতের মধ্যে পড়ে যেতে হল। যিনি অ্যানাস্থেশিয়া করলেন, তিনি কবিতা লেখেন। উবু হয়ে বসিয়ে মিনিট তিনেক ধরে শিরদাঁড়ায় ইঞ্জেকশন দিলেন। একেবারেই লাগল না। সবার নাকি লাগে? নিজেকে রজনীকান্ত ভাবতে ভাবতে মহা পুলকিত হয়ে ক্রশবিদ্ধ যীশুর পোজে শুয়ে পড়তেই ঝপ করে সবুজ পর্দা নেমে এল সামনে আর ওমনি শুরু হল শ্বাসকষ্ট। অসহ্য বুকে যন্ত্রণা। ডাক্তারবাবুকে বলতেই অক্সিজেন মাস্ক লেগে গেল নাকে। চশমা খুলে নেওয়ার কথায় প্রবল আপত্তি জানাতে, সেটা রক্ষে পেল। মিনিট পাঁচেকের মধ্যে ব্যথা খতম! আমার সার্জেন কি সব করছেন টের পাচ্ছিলাম। কিন্তু নো পেন। শুয়ে শুয়ে শুনছি – পেডিয়াট্রিশিয়ান এসে গেছেন। তিনি আক্ষরিক অর্থে খ্যাত কবি। ডাক্তারবাবুরা নিজেদের মধ্যে কথা বলছেন। জুনিয়র ডাক্তারবাবুদের মধ্যে কারা যেন কবিতা লেখেন।
কোন ভয়-টয় করছে না – বরং মহা ফুর্তিতে ভাবছি, এত্ত সহজ কেসটা! তাহলে তো তিন-চারটে ছানা হতেও কোন অসুবিধা নেই। সারা শরীর অবশ। লোকে যে কেন এত্ত ভয় পায় কে জানে! এর মধ্যে আবার অন্যান্য ডাক্তারবাবুদের কাছে কার কোথায় কবিতা ছাপা হয়েছে শুনে আমার গাইনোকলজিস্ট-সার্জেন খুব হীনমন্যতায় ভুগতে শুরু করেছেন। কারণ তিনি কবিতার ধারকাছ দিয়ে যান না (ভাগ্যিস)। হঠাৎ শুনি তিনি বলছেন, ” এই যে অদিতি -ওর হাসব্যাণ্ড শোভনসুন্দর ,ও-ও তো কবি”। ফিকফিক করে হাসছি দেখে, অ্যানাস্থেশিয়ার ডাক্তারের উবাচ- ” বর কবিতা লেখে শুনেই কষ্ট কমে গেল?” বল, আদালত কিছু বলবে কি এরপর?
তক্ষুনি শাঁখ বেজে উঠল চরাচর জুড়ে। কে যেন বললেন,” আপনার মেয়ের দেখুন মাথাভর্তি চুল”। চোখের সামনে এল সেই পুতুল খুকি। ঠিক একদিন পরে যার বাবা, ওকে ডাকবে ‘বাবুই’। যার ডাকনাম পদ্য। ইমন যার নাম রাখবে ‘বুইয়া’, শ্রবণা ‘আকাশি’, শুভ্রা ‘আহেলি’, অরণিকা ‘পেখম’, সুপর্ণা ‘গোল্লা’, প্রতীতি ‘সোনা মা’, সৌনকের ‘শরণ্যা’, এলোমেলো টুম্পার ‘কাব্যি’, ঐত্রেয়ীর ‘ ঘঞ্চু’, এপ্রিলের ‘মে’। আমাদের আরশি।
সব্বাইকে ভালবাসা।

ছবি: লেখকের ফেইসবুক থেকে