সেই শহরের কুকুরগুলো

ইরাজ আহমেদ

তখন আমরা পাড়ার অনেক বাড়িতেই কুকুর পুষতাম। কুকুর পোষার খুব চল ছিলো বাড়িতে বাড়িতে। অনেক বছর আগের কথা বলছি। তখন ফ্ল্যাট কালচার, এই গজিয়ে ওঠা সংস্কৃতি আলিঙ্গন করেনি আমাদের। ফ্ল্যাটের ভেতরে দামী কুকুর ছানা পোষার সুযোগও নেই। ছোট নিরিবিলি পাড়ায় ছোট ছোট বাড়ি, সামনে কারো একটু খোলা জায়গা। সেখানেই কুকুর পোষার জায়গা। কোনো কোনো বাড়ির দরজায় তখন লেখা থাকতো ‘কুকুর হইতে সাবধান’। বাড়িতে কুকুর পোষা তখন খুব সাধারণ ব্যাপার ছিলো। তবে আমাদের সবার কুকুরই ছিলো খাঁটি দেশী প্রজাতির। এদের তকন বরা হতো ন্যাড়ি কুকুর। মাঝে মাঝে খুব বনেদী কোনো বাড়িতে বিদেশী কুকুরের দেখা মিলতো। পাড়া কাঁপিয়ে মাঝে মাঝে শোনা যেত তাদের হুংকার।

আমরা দেশী কুকুরগুলোকে কুড়িয়ে নিয়ে আসতাম পথ থেকে।ছোট ছোট কুকুরছানা রাস্তার ধারে বালির স্তুপে, ফুটপাতে খেলা করতো। চোখে পড়লেই কোলে নিয়ে সোজা বাড়ি।এরা আমাদের বাড়ির ভেতরে বাইরে ঘুরে ফিরে বড় হয়ে উঠতো।
এই উটকো ঝামেলা বাড়ি বয়ে আনার জন্য বহু গঞ্জনা শুনতে হয়েছে। মনে আছে এভাবে জমাতে জমাতে আমাদের বাড়িতে এক সময় ছয়টা কুকুর বসবাস করতে শুরু করলো। আমার দাদু ভীষণ রেগে গেলেন। ভদ্রমহিলা এদের সবকটার দুইবেলা খাবারের ব্যবস্থা করতেন আবার আমাদের দুই ভাইয়ের ওপর রেগেও যেতেন। কিন্তু তাতে অবশ্য আমাদের কুকুর আমদানী কমেনি।
তখন রাতে পাড়ায় চোরের উপদ্রব ছিলো খুব। সেই কুকুররাই তখন হয়ে উঠতো আমাদের ভরসাস্থল।তবে আমার প্রয়াত অনুজ একবার এক কুকুর ধরে নিয়ে এসেছিলো। সেটা বাড়ির উঠানে চোরের আগমন টের পেলেই ভয়ে এক লাফে বিছানায় উঠে পড়তো।
তখন এই কুকুরগুলোর নামও ছিলো অদ্ভূত-টমি, ভুলো, জিমি, ল্যাংড়া, আঠা, বিজলী, কী সব নাম! এই আধুনিক সময়ে কুকুরদের নাম হয় টিনটিন, লাইকা, শার্লক, বিলি। টমি নামে আমার নিজের একটা কুকুর ছিলো। বেশ অনেক বছর সেই বিশালদেহী পশুটি আমার সঙ্গে ছিলো। তার ঘ্রাণশক্তি, বোঝার ক্ষমতা আর প্রভুভক্তি আজো আমাকে বিস্মিত করে।রাতের বেলা আমাদের পুরো পাড়াটাকেই আগলে রাখতো টমি একাই। আমার সাংবাদিক পিতা কাজের সূত্রেই বাড়ি ফিরতেন একটু রাত করে। সেই সময়টা ছিলো রাত এগারোটা থেকে সাড়ে এগারোটা। টমি তখন ঠিক বাবার ফেরার সময়ে বের হয়ে যেতো বাসা থেকে। সোজা গিয়ে বসে থাকতো গলির মোড়ে। বাবাকে হেঁটে অথবা রিকশায় ফিরতে দেখলে তার পেছন পেছন হেঁটে বাড়ি ফিরে আসতো। এটা সে করতো বছরের প্রায় প্রতিটা দিন। আমাদের পাড়ায় নিয়মিত চোরদের মহাশত্রু ছিলো টমি। তারাও কুকুরটাকে মারার জন্য বহুবার চেষ্টা করেছে। তাদের ধারালো অস্ত্রের আঘাতে মাঝে মাঝে ক্ষত বিক্ষত হয়ে টমি ফিরতো বাড়িতে। আমার দাদু তখন সেই রাতেরবেলা চুন আর হলুদ মিশিয়ে গরম করে ওর ক্ষতস্থানে লাগিয়ে ব্যান্ডেজ বেঁধে দিতেন। তখন টমিকে চেপে ধরে রাখার দায়িত্ব ছিলো আমার। আমাদের সিদ্ধেশ্বরী পাড়ার সব মানুষ তাকে পছন্দ করতো। সবাই খাওয়াতো টমিকে। সকালবেলা মুদির দোকানের সামনে আমার বন্ধুদের কোছ থেকে পাউরুটি খাওয়া ছিলো ওর বাধা একটা কাজ। শেষ পর্য্ন্ত টমিকে কেউ বিষ খাইয়ে মেরে ফেলে কেউ।
আমাদের সেই পাড়ার মানুষদের মতো কুকুরগুলোও ছিলো সবার ঘনিষ্ঠ। কখনো মনে হতো বড় একটি পরিবারের সদস্য ওরাও। আমাদের ভালো সময়ে, আমাদের দুঃসময়ে কুকুরগুলোও জড়িয়ে থাকতো মানুষের সঙ্গে। বিভিন্ন বাড়ির কুকুরদের মধ্যে এক ধরণের বন্ধুত্বের বোঝাপড়াও ছিলো।

ছবিঃ গুগল