ফ্ল্যাশব্যাক

পিয়ালী বসু ঘোষ

উত্তুরে আকাশ আজ মেঘের ভারে খানিক ঝুঁকে এসেছে। বর্ষা নামবে এবার তাড়াতাড়ি, কাল-ই খবরে দেখছিল সুবিমল। তবু ছুটছে ভোরের শান্তিনিকেতন এক্সপ্রেস ধরে বোলপুরের দিকে। এতদিনের অভ্যাস।আড়াল করতে পারেনা কর্তব্যবোধটাকে। স্টেশনে পৌঁছে দেখে তখনও ট্রেনের সময় হয়নি।
কিন্তু বয়েস বাড়ছে টের পায়। এটুকু তাড়াহুড়ো তেই আজকাল বেশ হাঁফ ধরে ওর। এখন মার্নিংওয়াক এও ক্লান্তি এসেছে, বেশির ভাগ সময়ে লেকের ধারে বসে থাকে। রোদ বাড়লে ফিরতি পথে ঘেমে নেয়ে ফিরে আসে বাড়ি।
নমী তখন রেওয়াজ করে , এখনও নিয়মিত। অদ্ভুত প্রশান্তি আসে ওর গানে। গান শুনতে শুনতেই স্নান সারে। দুজনের চা বানায় তারপর নমির ঘরের সামনে এসে দাঁড়ায়। নমী হাসি মুখে ওর হাত থেকে চা নিলে দুজনে একসঙ্গে বারান্দায় গিয়ে বসে। কথা হয়না দুজনের তেমন তা নয় তবু প্রৌঢ়ত্বে পৌঁছনোর আগেই এক তমসা ঘিরে ধরছে আজকাল। নমী হঠাৎই মনে করায় কাল মাসের শেষ শনিবার, ওর বোলপুর যাবার দিন।
সুবিমল একটু অপ্রস্তুত হয়ে যায়, চিরদিনই এ প্রসঙ্গে যেমন হয় ও নমীর কাছে। নমীর কাছে না বলে বরং বলা ভালো নমীর মহনুভবতার কাছে। এত গুলো বছর ওর সহযোগীতা না পেলে সুবিমল কি পারত স্নিতির ভালবাসা কে এমন দীর্ঘমেয়াদী সম্মান জানাতে !
কাল রাতেও স্নিতি কে মনে করে কেমন আনমনা হয়ে যাচ্ছিল সুবিমল। কোন ছোট্ট বেলায় কথা দিয়েছিল তাকে আজও পালন করে চলেছে !
ওর স্নিতির কাছে যাবার আনন্দটা ওর নিজের কাছেও শুধু কুটুমানন্দ নয়, অনুভূতি জাগায়, শিহরণ জাগায় তার হৃদয়ের অন্য জায়গায়। যেখানটায় পুষে রেখেছে সেই মায়াবী মোহময় সময়, যখন ওর আর স্নিতির পুতুলের বিয়ে পর্ব,তাদের সংসার ভাঙা পর্ব আর বিদায় খেলার পর্ব চলতো। ভাবনার এসব রঙীন সেল্ফি বোধহয় আজীবন তোলা থাকে গোপন মনকুঠুরির মেগাপিক্সেলে !
ট্রেন আসার শব্দে চমক ভাঙল। উঠে জানলার ধারে বসে আবার হারিয়ে গেলো ফ্লাশব্যাকে। বেশ বড়সড় একটা জীবন – যাপনের গন্ডি পেরিয়ে খেয়ালের খাদ টপকে খানিকটা খামখেয়ালী ভাবেই কাটিয়ে দিলো ও। স্বেচ্ছাচারী ঢং এ।
বাবার তীব্র আপত্তিতে স্নিতিকে জীবনসঙ্গী করা হয়ে ওঠেনি ওর কারন বাবা তার বন্ধুকে কোনও এক আবেগঘন মূহুর্তে কথা দিয়ে ছিলেন তার সুন্দরী শিক্ষিতা কন্যাটির জন্য ওর থেকে সুপাত্র আর কেউ হতেই পারেনা। তার সেই কথার দাম তিনটি মানুষ তাদের জীবন দিয়ে আজও দিয়ে চলেছে !
নমীর সঙ্গে প্রথম রাত্রি যাপন এর স্মৃতি নাড়লে এখনও মনে পড়ে সুবিমল তাকে স্পষ্ট জানিয়েছিল স্নিতি কে ছেড়ে থাকা তার পক্ষে সম্ভব নয় আবার তাকে বিয়ে করাও যেহেতু সম্ভব নয় তাই পরবর্তী জীবন বেছে নেবার সব অধিকার নমীর রয়েছে। সে নমীকে আটকেও রাখতে চায়নি আবার চলে যেতেও বলেনি। বরং বাবার অসুস্থতা দেখে নমীর থেকে যাওয়াটা ও বড্ড সম্মানের চোখে দেখেছে।

ছাতিমতলার বালক বয়েসের পাড়াগেঁয়ে প্রেম ছিল ওর, স্নিতিকে নিয়ে এদিক ওদিক দৌড়ে বেড়ানো দু’পেয়ে একটা সাইকেল ছিল। কোথাও সাইকেল থামিয়ে ভাড়ে করে চা, কখনো জিভে লেগে থাকা হিং-এর কচুরি আর শালপাতার ঠোঙ্গার নাম না জানা গন্ধ ছিল। ধুলো উড়াল দিত শাল বনে, কোপাইয়ের জলে ছায়া পড়ত দুজনের, আবার ছোট্ট ঢিল ফেলে ওই প্রতিবিম্ব ভেঙে দিত ওরাই।
এসব ভাবতে ভাবতেই মুঠোফোনের টুংটাং শব্দে ঘোর কাটল – ‘নমী’
” তোমার ওষুধ ফেলে চলে গেছ। টেবিলের ওপরেই রেখে বেরিয়েছিলাম। ফিরে দেখি যা ভেবেছি তাই , ঠিক ভুলে গেছ। যাই হোক ট্রেন থেকে নেমে ওষুধ কিনে নিও আগে। কাল রাত্রে শরীর কিন্তু ভালো ছিলোনা ”
হঠাৎ ই মনে পড়লো সুবিমল এর গত রাত্রে খুব ঘামছিল ও। কিছু জড়ানো কথাও বলছিলো মাঝরাতে। এখন মনে পড়ছে নমী কেমন ফ্যাকাশে মুখে দেখছিল ওকে। তরিঘড়ি করে চোখে মুখে জলের প্রলেপও দিয়েছিল। তারপরটা আর মনে নেই ওর। শুধু খুব ভোরে ঘুম থেকে তুলে দিয়েছিল নমী-ই। সাবধানে যত্নে ডেকে বলেছিল ,” বকুল ফোটে এ সময় খুব তোমার তো ও ফুলের গন্ধে অ্যালর্জি আছে , স্মেল টা অ্যাভয়েড করো”
সুবিমল নমীর এই দীর্ঘ দাম্পত্যে ও কোনোদিন আলাদা করে নমী কে নিয়ে ভাবেনি, নমী কে কখনো অসুস্থ হতে দেখেনি, কখনও রাগ করতে দেখেনি, কখনও উচ্ছ্বাস প্রকাশ করতেও দেখেনি কিছু নিয়ে, নমীকে কিন্ডারগার্টেন স্কুলের সামনে উদ্বিগ্ন অভিভাবক হবার সুযোগটুকুও দেয়নি ও।
তবু নমী সুবিমল এর সংসার আগলে রেখেছে এতগুলো বছর। কি করে পারল ও ? প্রথম রাতেই যে জেনেছিল তার খেলার পুতুলের দাবীদার আসলে অন্যকেউ। সুবিমল তার মাকে হারিয়েছে যখন, তখন সে বেশ ছোট। মা কে ভুলেই গিয়েছিল ও। আজ প্রৌঢ় বয়সে এসে হঠাৎ মাকে মনে পড়লো ওর খুব। নমী ওর মায়ের ভূমিকা নিয়েছিল কি তবে ? তাই কি ওর জীবনে নমীর উপস্থিতি ওর কখনো অস্বাভাবিক মনে হয়নি! জানতে ইচ্ছে হয়নি কখনো এই চাপিয়ে দেয়া জীবনে নমী এতগুলো বছর একা একা কেমন আছে ! কিন্তু সিঁথি চওড়া করে ওই যে রক্তিম চূর্ণ চর্চা করে রোজ তার গন্ডীর সীমারেখা যেন বলে মনখারাপের মেঘ ওর সিঁথি কে স্পর্শ করেনি কখনও ।কারন ওই গন্ডির মধ্যেই নমী আটকে রেখেছে সুবিমলের ইচ্ছের আর সম্মানের আয়ু।
সুবিমল ভাবে নমীর জায়গায় স্নিতি হলে এভাবে কি ছেড়ে দিত নিজের অধিকার ? হয়তো না ! হয়তো কেনো সত্যিই না ! অধিকার যে অস্তিত্বের আর এক নাম। সেটা সে কিছুতেই ছাড়তো না ! সেটা যদি পারতো তবে এই এতগুলো বছরে নমীর শূন্য করে দেওয়া করপুটের এই দান সে বিনা দ্বিধায় গ্রহন করল কি করে! কখনও স্নিতির চোখে নমীর জন্য আলাদা উৎসাহ দেখেনি সুবিমল। বরং স্নিতি চিরদিন অস্পষ্টভাবে বলেছে সুবিমলের স্ত্রী হবার দাবী রাখে সে- ই । হয়তো আইন তাদের গাঁটছড়া বাঁধতে দেয়নি কিন্তু মনে মনে সে নিজেকে সুবিমলের অংশই মনে করেছে। এতে অবশ্য সুবিমলের দায়ই অনেক খানি। সেই তো স্নিতির এই বোধটা তৈরী করে দিয়েছে।
তবু আজ যখন নমি কে নিয়ে ভাবতে বসেছে তখন অবচেতন মন বারবার গুটিয়ে রাখা সম্পর্কের সুতো টা টেনে ধরতে চাইছে।
তীব্র একটা ঝটকায় ট্রেন থেমে যেতেই সুবিমল খেয়াল করল চশমাটা ওর চোখ থেকে খুলে পড়ে গেছে। ট্রেন থামলো কেন দেখতে দরজার সামনে এসে দাঁড়াল। চশমাটা তে সামান্য স্ক্রাচ পড়েছে। তবু ওটাই চোখে পরে বাইরে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে দেখলো লাইনের ধারে অজস্র বকুল পড়ে আছে পাশের গাছ থেকে ঝরে। সুবিমল শিশুর মতো হাসল খানিকটা ! সেই ছোট থেকে সুবিমল যখনই স্নিতির কাছে গেছে এই বকুল ফোটা দিনে মুঠো ভরে বকুল নিয়ে গেছে। আজও কেমন ইচ্ছে হলো, কিন্তু
ফিরে এলো ও দরজার সামনে থেকে। হঠাৎই ফোন করলো স্নিতিকে, ভাবলো জানিয়ে দেয় কোনও অনির্দিষ্ট কারনে ট্রেন দাঁড়িয়ে আছে। হয়তো একটু দেরী হবে ! স্নিতি ধরল না ফোন !
অনুরণন তুলে তুলে ফোন টা যখন থেমে গেলো তখন হাতের মোবাইল স্ক্রিনে দেখল নমীর নাম ফুটে উঠেছে।
বড্ড এলোমেলো মন নিয়ে নমীর ফোন ধরল। বোকার মতো বলল – ফোন করে ফেলেছি, নমী হাসে, বলে – তাই তো দেখছি ! কি ব্যাপার মশাই ? আচমকাই নমীকে বলে এই এতগুলো বছরে বোলপুর আসার দিনে বেরোবার সময় কখনও তোমাকে দেখতে পাইনা কেন বলতে পারো ? নমী চুপ করে থাকে খানিক সময় । সুবিমল আবারও জানতে চায় ! নমী বলে – যাতে কোনও হীনমন্যতা তোমাকে ঘিরে না ধরে, তাই ওই দিন গুলোতে সক্কাল সক্কাল কালিঘাটের মাকে দর্শন করে আসি।এক কাজে দুই কাজ হয়। এই আর কি ! রাখো রাখো ফোন রাখো, যাও উনি অপেক্ষা করে থাকবেন !
একটু থেমে বলে – তুমি তোমার মত করেই না হয় থাকলে সুবিমল, সংসার টুকু শুধু আমার থাক !
পড়ন্ত বেলায় স্নিতির সামনে গিয়ে দাঁড়ালো সুবিমল। ট্রেন দেরী করেছিল বেশ। সুবিমলের অপেক্ষায় একটা ফলসা রঙের শাড়ি পড়েছিল ও। ঘরে পাতা প্রদীপ এর কালি দিয়ে কাজল এঁকেছিল চোখে, উচ্ছল চোখ দুটো এতক্ষণ ঘর বাহির করছিল। কিন্তু সুবিমলের চোখের দিকে তাকিয়ে অবাক স্নিতি চোখ নামিয়ে আনে। এ যে অন্য সুবিমল ! শুধুমাত্র দেহটাকে টেনে নিয়ে এসেছে মাত্র ! মনের হদিস নেই যেন। কিছু বুঝতে না দিয়ে সুবিমল কে বলল স্নানের জল দিচ্ছি, সেরে এসো ! তারপর মুড়ি আর বেগুনী খেতে খেতে দুজনে অনেক গল্প হবে।
কিন্তু সুবিমল থামিয়ে দেয় স্নিতিকে। দুহাতে ওর কাঁধে হাত রেখে ওর দিকে তাকায়। স্নিতির স্থির দৃষ্টি সুবিমলের আচ্ছন্নতা কে কাটিয়ে উঠতে সাহায্য করে, তবু সে কিছুই বলে উঠতে পারেনা। শুধু বলে – আচ্ছা স্নিতি এতগুলো বছর আমি কি নমীর সঙ্গে অন্যায় করলাম ? অন্যকে দুঃখ দিয়ে কি জীবনের প্রতি সুখী হবার পাজ়িটিভ দৃষ্টিভঙ্গি বজায় রাখা যায় ?
স্নিতি ধীরে ছাড়িয়ে নেয় সুবিমলের হাত থেকে নিজের কাঁধ। স্মিত হাসে ! তারপর সুবিমলের হাত দুটো ধরে বলে – তুমি আমার যথার্থ বন্ধু ! তোমার সঙ্গে আমার মনের সমতা আছে বলেই তোমার না বলা কথা গুলোও আমার কাছে খুব স্পষ্ট। আমি এও জানি তুমি আমাকে ভালোবেসে তোমার অল্পবয়সী জীবনে অনেক ঝুঁকি নিয়েছিলে সমাজের কথা না ভেবেই। আমার তো অযাচিতভাবেই অনেক পাওয়া। কিন্তু একথা তো সত্যি তোমার স্ত্রীর প্রতি তোমার দায়িত্ব আছে। সম্পর্কের নৈকট্যে সে দায়িত্ব আপনা থেকেই আজ তোমার তৈরী হয়েছে। হয়তো ভাবছ আমি কখনো কেনো তোমাকে সেই দায়িত্বের কথা বলিনি ! আসলে কি জানো তো সুবিমল দায়িত্ব কখনো চাপিয়ে দেওয়া যায়না , দায়িত্ব বর্তায়! আর তুমি দায়িত্বজ্ঞানহীন নও এ তো আমি এতগুলো বছরে দেখেছি।
বোকা হাসি হাসে সুবিমল ! বুঝতে পারেনা কি বলবে স্নিতিকে ! বিদ্যুৎ চমকের মতো চমকে দিয়ে ভেতরে চলে যায় স্নিতি। ওর ঘরের দরজা বন্ধ হবার শব্দ শুনে অনেক ক্ষন বসে থাকার পর একসময় উঠে দাঁড়ায় ও। ধীরে ধীরে দরজার বাইরে পা রাখে। একটা নিঃসীম শূন্যতা বিধুর অপস্রিয়মান স্মৃতির মত ওকে জরিয়ে ধরে। ও জানেনা এখনও যা ফেলে এলো তাকে কি হারানো বলে আর যা পাবার ইচ্ছেতে এগিয়ে চললো সামনের দিকে তাকেই প্রাপ্তি বলে কি ?
রাঙামাটির ধুলোর গন্ধে স্বয়ংসম্পূর্ণ এক পুরুষ তখন তার নিজের অস্তিত্ব কে খুঁজে পেতে ছুটে চলেছে কলকাতায় ফেরার শেষ ট্রেন টা ধরতে ! আজ যে ওকে ফিরতেই হবে !

ছবিঃ গুগল