সকালটা লিখে দিতে হয় কফির নামে

স্মৃতি সাহা

এক কাপ ধোঁয়া ওঠা কফির সঙ্গে যখন দিনের শুরু হয় তখন অবধারিত ভাবেই সকালটা লিখে দিতে হয় কফির নামে। চক্রাকারে ওঠা ধোঁয়া যখন ডার্ক রোস্টেড কফি বীনের সুবাস ছড়ায় বাতাসে, তখন সকালটা চনমনে হতে বাধ্য। আজ আমি কফির গল্প শোনাবো। কফি নিয়ে আমেরিকানদের রোম্যান্টিসিজম এর গল্প যে অন্য পর্যায়ের তা প্রায় সকলের জানা। সেই গল্প শোনাবো। নিউইয়র্ক জুড়ে রয়েছে অসংখ্য কফিশপ, বলতে গেলে প্রতি দু’কদমে এখানে একটি করে কফিশপ। আর আছে কফির দু’টি বিখ্যাত চেইন স্টোর। একটি ডানকিন ডোনাট অন্যটি স্টারবাকস্। এই দুই চেইন স্টোর নিয়ে নিউইয়র্কবাসীদের মধ্যে যে আগ্রহ তা প্রায় উন্মাদনার পর্যায়ে পড়ে। এই স্টোরের অধিকাংশ শাখা দিবারাত্রি সব সময় খোলা থাকে। তাই নিউইয়র্কবাসীদের পদচারণায় স্টোরগুলো মুখরিত থাকে সব সময়। আর এই চেইন স্টোরে কত রকমের, কত ফ্লেভারের কফি আছে তা ভাবতে বসলে আমেরিকানদের কফি নিয়ে অবশেসনটা খুব ভাল বোঝা যায়। “ডানকিন ডোনাট” কফিশপে আছে বিভিন্ন রকমের কফির সমাহার। এর মধ্যে আমেরিকানো, লেট্টে, মাচিয়াতো, কাপুচিনো আরোও অসংখ্য রকমের কফি। আর এই কফিগুলোর সঙ্গে রয়েছে হরেক রকম ফ্লেভারের কম্বিনেশন। যদিও এই স্টোরে কফির পাশাপাশি স্ন্যাক র‍্যাপ, স্যান্ডুইচ, ব্যাগেল, ডোনাট, আইসক্রিম, চা-ও পাওয়া যায় তবুও নিউইয়র্কে “ডানকিন ডোনাট” নামটার সঙ্গে ডার্ক রোস্টেড ফ্লেভারের কফির অবধারিত যোগসুত্র এসেই পড়ে। সদাব্যস্ত এই নগরীর অধিকাংশ নাগরিক সকাল শুরু হয় “ডানকিন ডোনাট” এর চিজ ব্যাগেল আর সুবাসিত এক মগ কফি দিয়ে। এজন্য সকালগুলোতে এই স্টোরে ক্রেতাকে লম্বা লাইনে গিয়ে দাঁড়াতে হয়। আর এইজন্য মনে হয় স্টোরটির অ্যাডভারটাইজিং ক্যাম্পেনের ক্যাচ লাইন থাকে, “আমেরিকা রানস্ অন ডানকিন।” আমি এখানে একটি তথ্য খুব আনন্দের সঙ্গে যুক্ত করছি তা হলো “ডানকিন ডোনাট” স্টোরের অধিকাংশ শাখার মালিকানা কিন্তু বাংলাদেশ, ভারতীয় আর পাকিস্তানি নাগরিকদের হস্তগত। আর এর প্রায় প্রতিটি শাখায় নিজেদের সেবা দিয়ে যথেষ্ট সুনামে আছেন অজস্র বাংলাদেশি। তাই ম্যানহাটনের কোন স্টোরে “আপনি বাংলাদেশী?” বলে সহাস্যে যখন আপনার দিকে আন্তরিকতা মিশানো একটি কাপুচিনো এগিয়ে দিবে তখন অবাক হবেন না মোটেও!

এবার আসি নিউইয়র্ক তথা আমেরিকার আরেকটি বিখ্যাত কফিশপ স্টারবাকস্ এর গল্পে। স্টারবাকস্ও একটি চেইন কফি স্টোর যার অসংখ্য শাখা ছড়িয়ে রয়েছে নিউইয়র্ক জুড়ে। তবে ডানকিনের থেকে স্টারবাকস্-এর একটা সুক্ষ্ম পার্থক্য আছে। ডানকিনের মতো এত হন্তদন্ত নয় এই স্টোরের পরিবেশ। বেশ নিরিবিলি আর প্রশস্ত স্টারবাকস্ এর স্টোরগুলো। আর এই চেইন স্টোর টি আক্ষরিক অর্থেই কফিশপ। ভিন্ন রকম, ভিন্ন ফ্লেভারের কফি দিয়েই সাজানো স্টোরটি। গুটিকয় স্ন্যাকসের আয়োজন থাকলেও তা খুব সীমিত পরিমাণে। প্রশস্ত আর নিরিবিলি হওয়াতে এই স্টোরে কফি হাতে নিয়ে ল্যাপটপে ঘন্টার পর ঘন্টা কাটিয়ে দিতে দেখা যায় ক্রেতাদের। ব্লন্ডে রোস্ট, ক্যাফে মিস্টো, ডার্ক রোস্ট, ক্লোভার ব্রিউয়েড,ডিকেফ পাইক প্লেজ, পাইক প্লেজ রোস্ট,বিভিন্ন ফ্লেভারের ফ্রেপুচিনোসহ আরোও অনেক রকমের হট আর কোল্ড ড্রিংক আছে এখানে। এর সঙ্গে যুক্ত হয় ঋতুভিত্তিক কিছু ফ্লেভার। ফল সিজনে থাকে পামকিন ( মিষ্টি কুমড়া) এর ফ্লেভার, অন্যদিকে সামারে থাকে বিভিন্ন কোল্ড রিফ্রেশমেন্ট। তবে সত্যিকার অর্থে যারা কফি সৌখিন তাদের জন্য স্টারবাকস্ সব সময় একট্রা ট্রিট। এখানে এসে কফি প্রেমীদের নিরাশ হবার সম্ভাবনা খুব কম। ভিন্ন দেশ, ভিন্ন পরিবেশ আমাদেরকে ভিন্ন জীবনবোধের গল্প শুনিয়ে যায়। ভিন্ন পরিবেশে খাপ খাইয়ে নেবার অন্যতম উপায় হচ্ছে চারপাশের পরিবেশ, মানুষ আর তাদের জীবনযাপন গভীরভাবে অবলোকন করা। আমরা শিখি, আমরা গ্রহন করি। তবে সেটুকুই যেন গ্রহন করি যা আমাদের সংস্কৃতি আর ঐতিহ্যবিরোধী নয়, বরং আমাদের শিকড়ের স্পর্শে শুদ্ধ হয়ে জীবনের জয়গান করে।

ছবিঃ লেখক