জঙ্গলের গন্ধ শুঁকে দেখতেও জঙ্গলে যাওয়া যায়

জয়দীপ রায়

(কলকাতা থেকে): রাতে গাড়ির ড্যাশবোর্ডে বাইরের টেম্পারেচার রিডিং আট দেখে সন্তোষ বললো, আজ এক দো মেঁ আয়েগা। সন্তোষ, সন্তোষ যাদব। কানহা টাইগার রিজার্ভের কিসলি গেটের একজন জিপসি ড্রাইভার। কার কাছ থেকে নাম্বারটা পেয়েছিলাম মনে নেই। অনেকদিন আগে একবার কানহায় আসার চেষ্টা করেছিলাম। তখন কেউ নাম্বার দিয়েছিল। তারপরে একদিন ফেসবুক ফ্রেন্ডও হল। মাঝেমাঝে দেখি মোবাইলে বাঘের ছবি তুলে পোস্ট করে।

কাল রায়পুরে কাজ মিটে গেলে ফোন করলাম সন্তোষকে। যাব কাটনি। মধ্যপ্রদেশে। কানহার জঙ্গলের পাশ দিয়ে রাস্তা। সন্তোষ বললো সাফারি পাওয়া মুশকিল। জানুয়ারির শুরুতে প্রচন্ড ভীড়।সব আগে থেকে অনলাইনে বুক করে আসে। তবে আপনারা আসুন। দেখি কি করা যায়।
বিন্ধ্য পর্বত মধ্যপ্রদেশের পেট চিরে পূর্ব থেকে পশ্চিমে চলে গেছে। হাজার কিলোমিটার। আমরা ছত্তিশগড থেকে বিন্ধ্য পর্বতমালার পেটের ভিতর দিয়ে, ঘাটগুলো পেরোতে পেরোতে, ছোট ছোট পাহাড়গুলোকে টপকে টপকে ঢুকে গেলাম কানহা ন্যাশনাল পার্কের চৌহদ্দির মধ্যে। বড় রাস্তা ছেড়ে রাতের জঙ্গলের রাস্তায় ঢুকলাম। গোটা রাস্তায় জিজ্ঞেস করার মত কেউ নেই। তিনরাস্তার মোড়ে গিয়ে ভ্যাবাচাকা খেয়ে সন্তোষকে ফোন করি। সন্তোষ বলে জায়গার নাম কি? তা কে জানে। কোনও কিছু লেখা নেই। দেবদূতের মত আসা এক গাড়ির ড্রাইভার বললো কিসলি চলে যান। সাত আট কিলোমিটার জংলী কাঁচা রাস্তা পেরিয়ে, মোচা হয়ে। আমরাও ঘুমন্ত আদিবাসি গ্রামের উঠোন পেরিয়ে দ্বিধা করতে করতে জঙ্গলের কাঁচা রাস্তা ধরলাম।
একবার রাজস্হানের সারিষ্কার জঙ্গলের গায়ের মেইনরোডে লেপার্ডের সামনে গাড়ি পড়েছিল। রাত আটটা হবে। একটা গাড়ি দেখি জঙ্গলের মধ্যে ব্যাকে ঘোরাচ্ছে। আমরা পাশ কাটিয়ে বের হতে গিয়ে দেখি কালো পিচের উপর বসে আছেন। দূর থেকে দেখে প্রথমে কুকুরের মত মনে হয়েছিল। সামনে এসে বুঝলাম তিনি। গায়ে চাকা চাকা। খুব বিরক্ত হয়ে তিনি হেলেদুলে পাশের ঝোপ ডিঙিয়ে গিয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে আমাদের দেখতে লাগলেন। রক্ত থামিয়ে দেয় চলাচল।
এবার কানহা কিসলিতে রাতদুপুরে মাটির রাস্তায় জঙ্গলের মধ্যে ঘুরপাক খেতে খেতে খাটিয়ার ফরেস্ট গেটের সামনে গিয়ে গাড়ি থামালাম চারজন আজনবি বাঙালি। থাকার ব্যবস্হাটা ভালই রেখেছিল সন্তোষ।
যত রাত বাড়ে টেম্পারেচার কমে। সোয়েটার হুডি দুটো কম্বলে মুড়ি দিয়েও বাইরে ঠান্ডা পড়ার শব্দ শোনা যাচ্ছে। হুড়মুড় করে তাপমাত্রা কমছে। সন্তোষ বলে গেছিল ছ’টার মধ্যে রেডি হয়ে থাকতে। যদি ও এন্ট্রির ব্যবস্হা করতে পারে ফোন করে দেবে।
সন্তোষ ফোন করার আগেই আমরা রেডি হয়ে নিলাম। আমি সুজিত দেবুদা আর প্রশান্ত। গাডির কাছে পৌঁছে দেখি উইন্ডস্ক্রিনের পর এক লেয়ার বরফ। অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকতে দেখি ছাদের পরেও একটা মোটা লেয়ার বরফের। সাদা হয়ে রয়েছে। দেবুদা খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে তুললো খানিকটা। হিমালয় থেকে কত দূরে এই মধ্যভারতে চার পাঁচশো মিটার এলিভেশনেও এরকম হয়? আগেকার দিন হলে ডিজেল গাড়ি এই সকালে স্টার্ট করতে হলে খুব বেগ পেতে হতো। এখন টেকনোলজি পাল্টেছে। ডিজেল এজ্ঞিন এখন শত ঠান্ডাতেও সহজে কাবু হয় না।
এই ঠান্ডাতেও এই সকালে কানহার জঙ্গলে খাটিয়া গেটের সামনে সারসার জিপসি জঙ্গলে ঢোকার অপেক্ষায়। গেট উঠে গেলে নি:শব্দে পরপর জিপসিগুলো জঙ্গলের মধ্যে ঢুকে গেল। নৈ:শব্দের মধ্যে প্রবেশ করলো। এবার শুধু পাতার শব্দ, পাখির শব্দ বা শের খানকে দূর থেকে দেখে বার্কিং ডিয়ারের কলিংয়ের শব্দ। এখানে মানুষের তৈরী একটাই শব্দ আছে, জিপসির পেট্রোল ইজ্ঞিনের। মারুতি সুজুকির জিপসি বোধহয় সবচেয়ে সাইলেন্ট কিন্তু পাওয়ারফুল ফোর হুইল ড্রাইভ গাড়ি। ভারতের সব জঙ্গলের একমাত্র সাফারি ভেহিকল।

ঢুকে পড়লাম জাঙ্গল বুক এর মধ্যে। সকাল বেলার রোদ্দুরে ভেসে থাকা কুয়াশার মধ্যে। খোলা জিপসিতে অসম্ভব ঠান্ডা। হাত বাইরে বের করা যাচ্ছে না। জিপসিতে ওঠার আগে টেম্পারেচার দেখেছিলাম দুই। জঙ্গলের অভ্যন্তরে এখন নিশ্চিত শূণ্য হবে। সূর্য সবে উঠেছে। তিরিশ ডিগ্রি অ্যাঙ্গেলে রোদ্দুর পুরো স্পটলাইটের মতো পড়ছে। ছোটবেলায় বনশ্রী সিনেমা হলের প্রজেকটরের মত। আর সিনেমা তৈরী হচ্ছে। কত পাখি। প্যারাডাইস ফ্লাইক্যাচার, রোলার, পার্পল সানবার্ড কত রকমের পাখি। সুজিতের মাথা খারাপ। একটা পার্পল সানবার্ডের ছবির জন্যে সারাদিন লেবুবাগানে নির্জলা বসে থাকে। আর এখানে কোন পাখিটাকে ফোকাস করবে বুঝে উঠতে পারছে না। এত রকমের পাখি বসে রয়েছে বা ওড়াউড়ি করছে। ড্রাইভার সন্তোষ কিন্তু সুজিতকে বেশি সময় দিচ্ছে না। পাখি সারসে বেশি সময় দিলে দক্ষিণরায় পালিয়ে যাবেন আবার। টাটকা পাগমার্কগুলো দেখে সন্তোষ ফিসফিস করে বলে উঠলো, আভি আভি সামনে তরফ গ্যয়া।
সিনেমা কত রিলের জানিনা, তবে মাঝে মাঝে এসে দেখা দিয়ে যাচ্ছে এক এক ঝাঁক স্পটেড ডিয়ার। নায়িকার সঙ্গে যেরকম অনেকগুলো মেয়ে নাচে, কিন্তু চোখে পড়ে না, সেরকম। গ্রাসল্যান্ডের পাশে একটা গাছের গুড়ির পেছন থেকে উঁকি দিল ভীষণ মায়াবী চোখের একটা সম্বর। সন্তোষের তাড়ায় এবারও সুজিত ছবি পেল না। রোদ্দুর গাছের ফাঁক দিয়ে ঠি ক সম্বরটার মুখের ওপর পড়ছিলো। ফ্রেমটা এখনও চোখে লেগে রয়েছে।
-ইয়ে সব তো বাদ মে ভি মিলেগা। আভি টাইগার সাইটিং কোশিশ করতে হ্যায়। সন্তোষ উঁচু রাস্তায় জিপসি ওঠাতে ওঠাতে বললো।
-জানবার আগর মিলতা ভি হোগা তো অ্যায়সা লাইট কাঁহা মিলেগা? ক্যামেরা চোখ খেকে নামিয়ে কমকথার সুজিত বলে উঠলো। এরপরের চিত্রনাট্যে পরপর চৌশিঙ্গা বারাশিঙ্গা বার্কিং ডিয়ার নীলগাই সবকিছু পর্দাজুড়ে ঘর করে গেল।
মিষ্টি জঙ্গল কানহা। গাছ মূলত শাল। চিরহরিৎ বলে জঙ্গল সারাবছর সবুজ। গ্রাসল্যান্ড বা মিডোস অনেকটা জুড়ে। ঘাসের উপর দিয়ে দিগন্ত অব্দি দৃষ্টি চলে যায়। দু’ঘন্টা ঘোরাঘুরির পর গাড়ি এসে একটা ক্যান্টিনে দাঁড়ালো। মিড সাফারি ব্রেকফাস্টের ব্যবস্হা এই প্রথম কোনও জঙ্গলে দেখলাম। সাফারি এখানে চারঘন্টার। ক্যান্টিন চত্বরে পুরো কসমোপলিটান ওয়েদার। হিন্দি মারাঠি বাংলা ইংরিজি নানানরকম ভাষা ভেসে আসছে। কিন্তু আজ এখনও কোনও সাইটিং হয়নি। 
ব্রেড পকোড়া আর চা খেয়ে জিপসি আবার জঙ্গলে গড়ালো। উইঢিপি, গাছের গায়ের টেরিটোরিয়াল মার্ক, পাগমার্ক সবই দেখা গেল। শুধু তাঁদের কাউকে দেখা গেল না। রোদ্দুর বেশ উঠে গেছে। ভোরের মত সুন্দর নেই আলো আর। যদিও আকাশ খুব নীল। সুজিতের ক্যামেরার শাটারের শব্দ আসছে ঘন।
জীবনে একবারই বাঘ দেখেছি। টাইগ্রেস আর দুটো বাচ্চা। করবেটে। না দেখলেও ক্ষতি ছিল না। জঙ্গল দেখার জন্যেই জঙ্গলে যাওয়া যায়। জঙ্গলের গন্ধ শুঁকে দেখতেও জঙ্গলে যাওয়া যায়। বারাশিঙা এবার প্রথম দেখলাম। না দেখলেও আক্ষেপ থাকতো না। কোনও এক্সপেকটেশন ছাডা চোখ কান নাকসহ জঙ্গলে যাওয়াই ভাল। চারঘন্টা ধরে যে সবুজ যে আলো যে ঠান্ডা অক্সিজেন আমরা পেয়েছি, তাতেই আবার অনেকদিন কাটিয়ে দেওয়া যায়।

ছবি: লেখক